স্মৃতির আয়নায় জিয়াউর রহমান : প্রথম পর্ব

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। উই রিভোল্ট। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরিত বক্তব্য। ১৯৭১-এর কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষনা।

১. "... আমাদের ওখানে থাকতে হলে অর্থাৎ আগরতলা এরিয়ায় থাকতে হলে রেজিষ্ট্রেশন করতে হবে। তখন এইচ টি ইমাম ছিলেন  আগরতলার এডমিনিস্ট্রেটিভ দায়িত্বে। একদিন আমরা বাসে করে আগরতলা গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করলাম। আমরা হেঁটে হেঁটে যখন বাসে ওঠার জন্য আসছি, তখন খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। তখন একটা কলে পানি খেয়ে সামনে যেতেই দেখি একটা বাটার দোকান। আকতার ভাই একজনকে দেখিয়ে আমাদের বললেন, 'ঐ যে বাটার দোকানে একজন জুতা কিনছেন, তিনি মেজর জিয়া।' তার সম্পর্কে একটা কৌতুহল ছিল তখন। আকতার ভাই মেজর জিয়াকে গিয়ে বললেন, 'স্যার ওরা দুজন বাংলাদেশ থেকে এসেছে। বেগম সুফিয়া কামালের মেয়ে। ওরা মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে কাজ করতে চায়। ওরা কলকাতা যাবে না। এখানে এখন খালেদ স্যার নেই। আপনার সঙ্গে কথা বললে ভালো হতো।' তখন তিনি বললেন, 'আমি তো আর্টস এ্যান্ড ক্র্যাফটস হোস্টেলে উঠেছি। তোমরা যাও, আমি আসছি।' তারপর তার সঙ্গে কথাবার্তা হলো। তিনি আমাদের বললেন, 'আপনারা কী করে যুদ্ধ করবেন?' তখন অবশ্য আমি অনেক রোগা ছিলাম। তিনি বললেন, 'আপনি রোগা মানুষ, আপনি বন্দুক চালাতে পারবেন? কখনো বন্দুক ধরেছেন?' আমি বললাম, 'আমি কখনো বন্দুক পিস্তল দেখিনি। তবে শিকারের গাদা বন্দুক দেখেছি।' মেজর জিয়া আমাদের বললেন, 'ঠিক আছে, আমি অবশ্যই আপনাদের সুযোগ দেব। আগ্রহ করে এসেছেন। আপনারা যদি পাঁচজন মেয়ে জোগাড় করতে পারেন, আমি আপনাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে দিব।' আলোচনা শেষে আমরা সোনামুড়া ফিরে এলাম॥"

উৎস : সুলতানা কামাল চক্রবর্তী / ছিলাম কোথায় যেন নীলিমার নীচে ॥ [ জাগৃতি প্রকাশনী - ফেব্রুয়ারি, ২০০৯। পৃ: ৫৮-৫৯ ]

২. "... অতীতের অনেক কথাই মনে পড়ছে। আপনার (জিয়া) সাথে আমার অনেক স্মৃতি আছে, অনেক মিল আছে। আপনি যুদ্ধের সময় যে ঘড়িটা ব্যবহার করতেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়েও সে ঘড়িটা হাতে আছে। আমি আমার বাবার দেয়া বাড়িতেই আছি, বাবার কেনা আসবাবপত্রই ব্যবহার করছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনিও এক কাপড়ে ছিলেন, আমিও এক কাপড়েই ছিলাম। তখন যুদ্ধ করা, হানাদারদের আঘাত করা, দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা ছাড়া অন্য কোন ব্যাপার আমাদের মাথায় ছিল না। সে সময় ভাবীদের কি অবস্থা হবে, তারা কোথায় থাকবে, ভারতে চলে আসবে কিনা - এসব ব্যাপার নিয়ে যখন কথা বলছিলেন তখন আমি আপনার সামনে ছিলাম। আপনি তাদেরকে বলেছিলেন - 'তারা কোথায় থাকবে, কি করবে সে বিষয়ে ভাববার অবকাশ নেই। তাদেরকে তাদের মত করে সেভ থাকতে বলো।'

... মনে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের কথা। War Time Friend এর কথা। পরে আমি শুনেছি সে সময় জেনারেল জিয়ার মিলিটারী সেক্রেটারী ছিলেন কর্নেল অলি। চট্টগ্রামে আমি আক্রান্ত হয়েছি (বিরোধীদলের মিছিলে) এবং আমার অবস্থা সংটাপন্ন - এ খবর শুনে জেনারেল জিয়া বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি কর্নেল অলিকে নির্দেশ দেন সরাসরি মেডিকেল থেকে খবরাখবর নেয়ার জন্য এবং যতক্ষণ পর্যন্ত অপারেশন Successful হওয়ার খবর পান নি ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি জেগে ছিলেন।

... বেশ কিছুদিন পর জিয়াউর রহমান নিহত হলেন। জেনারেল জিয়া মারা গেলেন শুক্রবার রাতে। বৃহস্পতিবার রাতে আমরা চট্টগ্রাম ক্লাবে বসে তাস খেলছিলাম্। দেখি কর্নেল (যে জিয়াউর রহমানকে গুলি করে, তার নাম ঠিক মনে করতে পারছিনা) আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন - 'মোশাররফ ভাই, আজ তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছি, সুখবর আছে আপনাকে পরে জানাব।' আমি মনে করলাম তার হয়ত প্রমোশন হবে, ভালো কোন জায়গায় পোস্টিং হবে হয়ত। আমি উৎসাহিত হয়ে আর কোন প্রশ্ন করলাম না।

... আমি ঘরে ফিরে এসে চুপচাপ বসে থাকলাম অনেকক্ষণ। জিয়া বিএনপি করে, আমি আওয়ামী লীগের কর্মী সেটা বড় কথা নয়। জেনারেল জিয়া আমার যুদ্ধকালীন বন্ধু। আমরা জীবনবাজি রেখে একদিন যুদ্ধ করেছি। তার মৃত্যুর খবর আমাকে বিশাল এক  শুণ্যতার সাগরে ঠেলে দিল॥"

উৎস : ইঞ্জি: মোশাররফ হোসেন / ফেলে আসা দিনগুলি ॥ [ তৃপ্তি প্রকাশ কুঠি - জুন, ২০১১ । পৃ: ১৪৯ - ১৭২ ]

৩. "... চট্টগ্রাম ও নোয়াখালি অঞ্চলের সমর পরিচালনার ভার পড়েছে মেজর জিয়াউর  রহমানের ওপর। নৌ, স্থল ও বিমান বাহিনীর আক্রমণের মুখে চট্টগ্রাম শহরে যে প্রতিরোধব্যুহ গড়ে উঠেছে এবং আমাদের মুক্তিবাহিনী ও বীর চট্টলার ভাই-বোনেরা যে সাহসিকতার সাথে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই প্রতিরোধ স্ট্যালিনগ্রাদের পাশে স্থান পাবে। এই সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিরোধের জন্য চট্টগ্রাম আজও শত্রুর কবলমুক্ত রয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের কিছু অংশ ছাড়া চট্টগ্রাম ও সম্পূর্ন নোয়াখালি জেলাকে "মুক্ত এলাকা" বলে  ঘোষণা করা হয়েছে॥"

উৎস : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে এপ্রিল ১১, ১৯৭১ তারিখে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের ভাষণ।

৪. "... ১৪ই সেপ্টেম্বর। বেলা এগারটা। ঘড়ির কাঁটার সাথে মিল রেখে একজন  ক্যাপ্টেনকে নিয়ে কর্ণেল জিয়াউর রহমান আমাদের ক্যাম্পে এলেন। জিয়াউর রহমানকে স্বাগত জানানোর জন্য আবদুল হাকিম, লোকমান হোসেন, মনিরুল ইসলাম, হুমায়ুন, বেনু ও অন্যান্য কোম্পানী কমান্ডার সহ আরো প্রায় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আমরা দু'সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। গাড়ী থেকে নামতেই জিয়াকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানালাম। সারির মাঝখান দিয়ে হেঁটে কর্ণেল জিয়া অভিবাদন মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন। দু'হাজার মুক্তিযোদ্ধা তাকে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানাল। এরপর আমি জিয়াউর রহমানকে সম্বর্ধিত করে স্বাগত ভাষণ দিলাম। কর্ণেল জিয়া জবাবে টাংগাইলের মুক্তিযোদ্ধাদের উচ্ছসিত প্রশংসা করলেন এবং তাদের নেতা হিসাবে বারবার আমার আন্তরিক প্রশংসা করতে লাগলেন। মুক্তিযোদ্ধারা খুবই আগ্রহের সাথে জিয়ার দীর্ঘ বক্তৃতা শুনল। জিয়ার বক্তৃতায় আমার প্রতি তার অকৃত্রিম বন্ধুত্বের পরিচয় পেয়ে সহযোদ্ধাগণ বেশ অনুপ্রাণিত হল। শেষে লেফটেন্যান্ট কর্ণেল জিয়াউর রহমান প্রায় ঘন্টা খানেক ধরে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নানা ধরণের আলাপ আলোচনা, মেলামেশা করে প্রায় তিন চারশ মুক্তিযোদ্ধার সাথে খাবার খেলেন। খাওয়া শেষে তাকে বিদায় জানালাম। ছয়-সাত দিন আগে কর্ণেল জিয়াও তার ক্যাম্পে আমাকে এমনি সম্বর্ধণা দিয়েছিলেন॥"

উৎস : বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরোত্তম / স্বাধীনতা '৭১ ॥ [বঙ্গবন্ধু প্রকাশনী - জানুয়ারী, ১৯৮৫ । পৃ: ৪১৪]

৫. "... ১৭ই সেপ্টেম্বর। ভারতের মাটিতে শেষবারের মত তেলঢালা ক্যাম্পে আমরা  মিলিত হলাম। অনেক আলাপ আলোচনা হলো। ভারতে অবস্থানের সময় কর্ণেল জিয়ার সাথে গড়ে উঠা সুন্দর সম্পর্ক ও মধুর স্মৃতি গুলোর পুন: পুন: উল্লেখ করলাম। বিশেষ করে আমার সহযোদ্ধাদের প্রতি তার আন্তরিক ভালবাসা ও সহযোগিতা করার জন্য জিয়া সাহেবকে পরম কৃতজ্ঞতা ও অসংখ্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলাম। কথাবার্তা শেষে উঠতে যাবো, এমনি সময় কর্ণেল জিয়াকে বললাম,

- জিয়া ভাই, আমি যতবার আপনার এই অফিসার মেসে এসেছি ততবারই ঐকোণে দাড়িয়ে থাকা তিন ইঞ্চি চাইনিজ মর্টারটি দেখতে পাচ্ছি। এটা কেন? এটা কি তাঁবুর শোভা বর্ধনের জন্য? না হাতিয়ারটি বিকল হয়ে গেছে?

- না ভাই এটা শোভা বর্ধনের জন্য এখানে  রাখা হয় নাই। বিকলও হয় নাই। সত্য কথা কি জানেন? আমার কাছে এই মর্টারের যত  গোলা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। মর্টারটির গোলা এখান পাওয়াও যাচ্ছে না। তাই বলতে গেলে দেড়মাস যাবত এটা অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

- এই মর্টারের অসংখ্য গোলা আমাদের কাছে আছে। মর্টারটি বেশ হাল্কা। অভ্যন্তরে বহন করার জন্য খুবই উপযোগী। স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে না হয় এটা আমাকে দিন।

- কাদের ভাই, আমি আপনাকে সব দিতে পারি কিন্তু জানেননই তো সামরিক নিয়ম কানুন। অস্ত্র হস্তান্তরের এক্তিয়ার আমার নেই।

- তাহলে ওটা হারিয়ে গেছে এমন একট রিপোর্ট দিয়ে দিন।

- সে উপায়ও নেই। একমাস আগে এই মর্টার সম্পর্কে জেনারেল হেডকোয়ার্টার মানে সি.ইন.সি এম.এ.জি ওসমানীর কাছে রিপোর্ট করা হয়েছে। এখন হারিয়ে গেছে বলার সুযোগ নেই। তবে সত্যি যদি মর্টারটি আপনার কাজে আসে, তাহলে জোর করে নিয়ে যেতে পারেন। আমি আপনাকে স্বেচ্ছায় অথবা হাতে তুলে দিতে পারি না।

- জোর করে নিতেই বা আমার আপত্তি কোথায়? 

- তাহলে নিয়ে যান। তবে আপনাকেই মর্টারটি গাড়িতে উঠাতে হবে, জেনারেল হেডকোয়ার্টারে রিপোর্ট করে দেব, আপনি জোর করে ওটি নিয়ে গেছেন। সেক্ষেত্রে কিন্তু আমাকে ভুল বুঝতে পারবেন না। জেনারেল হেডকোয়ার্টার থেকে যদি কৈফিয়ত তলব করা হয় যে, জোর করে নিয়ে গেল অথচ তোমরা বাঁধা দিলে না কেন? তখন অবশ্যই  লিখব, 'কাদের সিদ্দিকীর মত সম্মানিত একজন যোদ্ধা নিজের হাতে উঠিয়ে কোন জিনিস নিয়ে গেলে তা বল প্রয়োগ করে রেখে দেয়া ভদ্রোচিত আচরণ হতো না বলে বাঁধা দেয়া হয়নি।' এরপর আর কোন কথা থাকে না। উঠবার সময় মর্টারের  ব্যারেলটি সামসুর হাতে তুলে নিজে বাইপার্ট এবং বেস প্লেট নিয়ে গাড়ির দিকে এগুলাম। কর্ণেল জিয়া, মেজর আবু তাহের, ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ, ক্যাপ্টেন খালেক ও আরো দু'তিনজন অফিসার জীপ পর্যন্ত এসে বিদায় জানালেন। কর্ণেল জিয়া এরপরও দুই-তিন বার বললেন, 'কাদের ভাই মর্টারটি নেবেন না, রেখে যান। আমার  অসুবিধা হবে।' আমি হাসতে হাসতে বললাম, 'অসুবিধা হলে জোর করে রেখে দিন। ইচ্ছা করে আমি রেখে যেতে পারিনা।' কর্ণেল জিয়াও হাল্কা সুরে বললেন, 'না  ভাই, আপনার হাত থেকে এটি জোর করে রাখতে পারব না। তবে ওটা রেখে গেলে ভালো  হতো।' কথার ফাঁকেই মর্টারের দুটো অংশ গাড়ীতে সযত্নে রেখে কর্ণেল জিয়া সহ সবাইর সাথে শেষবারের মত কোলাকুলি করে টয়োটা জীপে উঠে বসলাম॥"

উৎস : কাদের সিদ্দিকী, বীরোত্তম / স্বাধীনতা '৭১ ॥ [বঙ্গবন্ধু প্রকাশনী - জানুয়ারী, ১৯৮৫ । পৃ: ৪৩১]

৬. 'ওয়েলকাম ব্যাক, কেমন আছো? কেমন কাটালে কলকাতায়?' মুখ তুলে বললেন।
 - 'ফাইন, ধন্যবাদ। কি লিখছেন স্যার?' প্রশ্ন রাখলাম।
 - একটা চিঠি লিখছি।
 - 'চিঠি? কাকে?' কৌতুহলী হলাম।
 - 'পাকিস্তানী মেজর জেনারেল জামশেদকে। সে ঢাকায় এসেছে একটি ডিভিশনের কমান্ডার হয়ে। বছর কয়েক আগে পাঞ্জাব রেজিমেন্টে চাকরি করার সময় ব্যাটা (অপছন্দের ব্যক্তিকে ব্যাটা বলা তার মুদ্রাদোষ) আমার কমান্ডিং অফিসার ছিল, সেই সুবাদেই লিখছি। পড়ে দেখো।' বলে চিঠি ধরিয়ে দিলেন আমাকে।
চিঠিতে লিখেছেন, Dear General Jamshed, My wife Khaleda is under your custody. If you do not treat her with respect, I would kill you someday. - Major Zia জিয়া বরাবরই অল্প কথার মানুষ। জামশেদের হাতে সেই চিঠি পৌঁছেছিল।" 
উৎস : মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম / রক্তেভেজা একাত্তর ॥ [ সাহিত্য প্রকাশ - ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭ । পৃ: ৯১-৯২ ]

৭. " ... আমাদের প্রায় ১১০০ সৈনিকের বহর যাত্রা শুরু করলো সিলেটের উদ্দেশ্যে। সামরিক কায়দায় এগিয়ে চলেছি, বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন কম্পানি ও ব্যাটেলিয়ন হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। মিত্রবাহিনীর ব্যাটারি কমান্ডার মেজর রাও সঙ্গে আছেন। তার বেতার সেটের মাধ্যমে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছি আমরা। গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য আমরা সারারাত হাঁটি, দিনে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকি। পাঁকে ভরতি হাওরের মধ্যে আমাদের চলার গতি শ্লথ, পরিশ্রমে সবাই ক্লান্ত। জোঁক রক্ত খেয়ে এক সময় আপনা আপনি ঝরে পড়ে, কারো সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। শত্রুর পশ্চাদপসরণের কারণে আমাদের মনোবল এখন তুঙ্গে। শেষ রাতের দিকে বিশ্রাম নেই আমরা। কমান্ডার জিয়াউর রহমানের সঙ্গে পলিথিনের কভার দেয়া বিশাল ম্যাপ রয়েছে (৮ ফুট বাই ৬ ফুট)। হাবিলদার রউফ দিনে বহন করে, রাতে সেটি বিছিয়ে জিয়া, ক্যাপ্টেন অলি এবং আমি শুয়ে থাকি। ৮ ডিসেম্বর। চন্দ্রালোকিত রাত। হাওরের একপ্রান্তে ম্যাপ কেস বিছিয়ে আমরা তিনজন গাছের নিচে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছি। ভোর হতে আর বেশি বাকি নেই। থেমে থেমে মিডিয়াম কামানের গোলার শব্দ ভেসে আসছে। সম্ভবত: দরবশত এলাকায় সংঘর্ষ চলছে। শুয়ে নিচু স্বরে নানা বিষয়ে আলাপ করছিলাম আমরা। ঘুরেফিরে সবার মনে একই প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে চূড়ান্ত বিজয়ের যে স্বপ্ন দেখে আসছি, শেষ পর্যন্ত আমরা বেঁচে থাকবো তো কাঙ্খিত বিজয় সেলিব্রেট করার জন্য? স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন হবে? কেমন থাকবে দেশবাসী? পাকিস্তানের জায়গায় ভারতীয়রা আবার জেঁকে বসবে নাতো?”

উৎস : মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম / রক্তেভেজা একাত্তর ॥ [ সাহিত্য প্রকাশ - ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭ । পৃ: ১১৩]

৮. "... ঐ দিন ছিল ৩রা এপ্রিল। পরের দিন আমিও পরশুরাম বিলোনীয়া বর্ডারে গেলাম। ওখান থেকে ফেনী ফিরে এসে মেজর (তৎকালীন) জিয়াউর রহমানের সাক্ষাৎ পেলাম। তখন তার মুখমন্ডলে দু'তিন ইঞ্চি দাঁড়ি গজিয়েছে। আমি খাজা আহমদকে  জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি এই ভদ্রলোককে চিনেন কিনা। বললেন, হ্যাঁ, মেজর জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের সাথে আরো একজন ছিলেন। তাদেরকে অভুক্ত মনে হল। বললাম, আগে কিছু খেয়ে নিন। তারপর কথা হবে। কাছেই একটি রেস্ট হাউজ  ছিল। ওখানে নিয়ে তাদেরকে আমরা খাওয়ালাম। খাওয়ানোর পর আমি জিয়াউর রহমানের সাথে আলাপ করলাম। তিনি ইংরেজীতেই কথাবার্তা বললেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম :  Mr. Ziaur Rahman , what have you decided to do? Will you go with us? তখন জিয়াউর রহমান একটি স্বস্তির নি:শ্বাস ফেললেন। পাল্টা আমাকে প্রশ্ন করলেন: Will you go with us? কাছেই ছিলেন ক্যাপ্টেন সেন। আমরা তার কাছে গেলাম এবং বললাম : আপনি মেজর জিয়া এবং তার দলকে ভারতে প্রবেশের ব্যবস্থা করে দিন।  ক্যাপ্টেন সেন তাই করেছিলেন। জিয়ার সৈন্যবাহিনী তখন রামগড় অবস্থান নিয়েছিল। ওখান থেকে তাদেরকে ত্রিপুরা রাজ্যে নেয়ার ব্যবস্থা করা হল॥" - একান্ত সাক্ষাৎকার / কাজী জহিরুল কাইউম (বা:আ:লী ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য। বিশিষ্ট শিল্পপতি। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং মুজিবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সাবেক এম.এল.এ)

উৎস : শামসুল হুদা চৌধুরী (স্বাধীন বাংলা বেতার  কেন্দ্রের পরিচালক) / একাত্তরের বিজয় ॥ [ আহমদ পাবলিশিং হাউস - ডিসেম্বর,  ১৯৯২ । পৃ: ৫৩-৫৪ ]


৯. "... ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়েছে। সকালে অনুষ্ঠানের শুরুতে কুমিল্লার  ৪৪ ব্রিগেডের অধিনায়ক কর্নেল জিয়াউর রহমান সুদূর কুমিল্লা থেকে এসে তার বসার স্থান পঞ্চম সারিতে খুঁজে পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। মুক্তিযুদ্ধের ফোর্স কমান্ডার পঞ্চম সারিতে বসবেন এবং তাও আবার অনেক পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগীদের পেছনে, বিষয়টি হজম করা কষ্টসাধ্য ছিলো যে কোন বিচারে। সেখানে উপস্থিত সেনাবাহিনীর অনেকেই ঘটনাটিকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি এবং ব্যাবস্থাপনায় যারা নিয়োজিত ছিলেন, তাদের সঙ্গে এ নিয়ে এক পর্যায়ে বিবাদ চরমে ওঠে। শেষমেষ জিয়াউর রহমান বিষয়টিকে হালকা করেন এবং সেনাবাহিনীর সাধারণ  সৈনিকদের জন্যে নির্দিষ্ট করা স্থানের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তিনি বললেন, 'আমি আমার লোকদের সঙ্গে বসেই অনুষ্ঠান উপভোগ করবো।' এ ঘটনার আপাত: পরিসমাপ্তি এখানেই থেমে থাকলো। তবে তার রেশ বোধকরি রয়ে গেলো আরও বৃহত  ভবিষ্যত ঘটনাপ্রবাহের জন্যে॥"

উৎস : মেজর নাসির উদ্দিন / গণতন্ত্রের বিপন্ন ধারায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ॥ [ আগামী প্রকাশনী - নভেম্বর, ১৯৯৭ । পৃ: ৩৫]


 "... '৭৩ সালে বিজয় দিবসের প্যারেডে তখনকার ডেপুটি চীফ অফ স্টাফ জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গাড়িতেই বসেছিলেন। কারণ মন্ত্রী এমপিদের পেছনের সারিতে তাঁর আসন নির্দিষ্ট থাকায় তিনি সেখানে বসতে রাজি হননি॥"

উৎস : মিজানুর রহমান চৌধুরী (রাজনীতিবিদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী) / রাজনীতির  তিনকাল ॥ [ হাফেজা মাহমুদা ফাউন্ডেশন - ফেব্রুয়ারি, ২০০১ । পৃ: ১৪৭ ]


১০. "... ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট অভ্যুত্থানের নায়ক ফারুক, রশীদ ও অন্যান্যরা ভেবেছিল তাদের বিদেশে অবস্থান হবে স্বল্প কালের জন্য। কিন্তু ডিসেম্বরের  শেষের দিকে তারা বুঝতে পারল যে, তাদের দেশে ফেরা জেনারেল জিয়ার কাম্য নয়। দেশে ফিরার জন্য তাদের সকল আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়। এমনকি তাদের পরিবারবর্গকে বেতন ও ভাতা দেয়া থেকে পর্যন্ত সরকার বিরত থাকে। রশীদ ও  ফারুককে এ সময় সেনাবাহিনী থেকে অবসর প্রদান করা হয়। এ সমস্ত কারণে ফারুক ও রশীদ জিয়ার প্রতি রাগান্বিত হন। রশীদ শেষ পর্যন্ত জেনারেল জিয়াকে দুই পাতা  বিশিষ্ট একটি চিঠি লেখেন এবং ঢাকা যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। রশীদ এই পত্রে আরও উল্লেখ করেন যে, জেনারেল জিয়াকে অবশ্যই তাদের ফেরত যাবার খরচ বাবদ ১৫০০০ ডলার পাঠাতে হবে। যদি ফেরত যেতে না দেওয়া হয় তাহলে তার যথার্থ কারণ ৩ সপ্তাহের মধ্যে জানাতে হবে। তা না হলে তারা নিজ খরচে ঢাকা ফিরে আসতে  বাধ্য হবেন।

জেনারেল জিয়া ২৩শে ফেব্রুয়ারী সেনাবাহিনীর এডজুডেন্ট জেনারেল ব্রিগেডিয়ার নুরুল ইসলাম শিশুকে বেনগাজী পাঠান। শিশু তাদের সাথে আলাপ করেন এবং বিদেশী দূতাবাসে চাকুরী প্রদানের নিশ্চয়তা দেন। ফারুক ও রশীদ চাকুরী গ্রহণে অস্বীকার করলে শিশু তাদের দেশে ফিরে যাবার বিষয়ে সচেষ্ট  হওয়ার নিশ্চয়তা দেন এবং বলেন যে, এটা করতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। রশীদ দলের পক্ষ থেকে জিয়াকে হাতে লেখা আর একটি পত্র দেন। এই পত্রে রশীদ জিয়ার প্রতি  আনুগত্য প্রকাশ করে দেশ সেবার প্রস্তাব পেশ করেন এবং জিয়ার উত্তরের জন্য ২ সপ্তাহ অপেক্ষা করবেন বলে জানান।

রশীদ ও ফারুক বেনগাজীতে বসে জিয়ার  বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। ফারুক ২৪শে মার্চ ফ্রাংকফুটে। এ সময় রশীদ বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে বার্তা পান যে, শুধুমাত্র তাকে বাংলাদেশে স্বল্প সময়ের জন্য ফিরে যেতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই বার্তায় ফারুক ও  অন্যান্যদেরকে ফিরে না আসার জন্য সতর্ক করে দেওয়া হয়। রশীদ অবিলম্বে  ফ্রাংকফুটে ফারুকের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করেন। ফারুক তখন লন্ডনে চার্চিল  হোটেলে এবং এম.জি তোয়াব সে সময় পোর্টম্যান হোটেলে অবস্থান করছিলেন। ফারুক  তিনবার তোয়াবের সাথে বৈঠকে মিলিত হন এবং জানতে পারেন যে ১৪টি ট্যাংক ঢাকার অদূরে সাভার সেনানিবাসে মোতায়েন আছে। জেনারেল জিয়া বেঙ্গল  ল্যান্সারকে বিভক্ত করে অপর একটি রেজিমেন্ট ১৪টি ট্যাংক এবং ৫০০ সৈনিক  সমন্বয়ে গঠন করেন। বেঙ্গল ল্যান্সারকে বগুড়া সেনানিবাসে এবং প্রথম বেঙ্গল ক্যাভালরীকে সাভার সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়। তোয়াব ফারুককে জানান রাত ৯ টা পর্যন্ত ট্যাংক বহরকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় প্রশিক্ষণের জন্য।

ফারুক বেনগাজী ফিরে এলেন এবং রশীদের সাথে বসে পরিকল্পনা তৈরী করলেন। স্থির করা হোল ফারুক মোসলেমউদ্দিন এবং হাসেমকে নিয়ে সিঙ্গাপুরে যাবেন। তারা সিঙ্গাপুরে ঢাকা থেকে রশিদের বার্তার অপেক্ষা করবেন। রশীদ ঢাকা অবস্থান  কালে আভ্যূত্থানের জন্য দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারী, বেঙ্গল ল্যান্সার ও প্রথম বেঙ্গল ক্যাভালরীর সৈন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন একই সংগে ফারুক ও অন্যান্যদের দেশে ফেরার বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করবেন। পরিকল্পনাটি ছিল নিম্নরুপ : প্রথম দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারী ও ট্যাংক বাহিনী ফারুকের সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিমান ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ মাত্র ঢাকা বিমান বন্দর দখল করে নেবে। ফারুক তখন এই সব সৈন্যদেরকে নিয়ে জেনারেল জিয়া এবং অন্যান্য উর্দ্ধতন সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ক্ষমতা দখল করবে। দ্বিতীয় বিকল্প পরিকল্পনা ছিল ফারুক ঢাকা বিমান বন্দর অবতরণ করা মাত্র কেউ জানার আগেই তাকে সাভারে নিয়ে যাওয়া হবে এবং ফারুক ট্যাংক বাহিনীসহ ঢাকা প্রবেশ করবে। উল্লেখ্য যে এসব নাটকীয় পরিকল্পনা কোনটাই কার্যকরী হয়নি।

রশীদ  শিশুকে ফোন করেন এবং মেজর ডালিমকে সংগে নিয়ে আসার অনুমতি চান। রশীদ ব্যাংকক থেকে ২০শে এপ্রিল ঢাকা বিমান বন্দরে পৌঁছান। বিমান বন্দরে আত্মীয়স্বজন ছাড়াও সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। সে দিনই রাতে ব্রিগেডিয়ার শিশু রশিদকে নিয়ে জেনারেল জিয়ার কাছে যান। এ বৈঠক  ছিল দীর্ঘ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ। রাতের খাবারের পর জিয়া রশীদকে জিজ্ঞেস করলেন - 'ফারুক কোথায়'? উত্তরে ফারুক বেনগাজীতে আছে জানালে জিয়া বলেন যে, একটি বিশ্বস্ত সূত্রে তাকে জানিয়েছে যে, ফারুক সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছে।

পরিকল্পনা মোতাবেক ফারুক দেশে ফিরে আসেন এবং সাভার সেনানিবাসে প্রায় দুই  হাজার সৈন্য তাকে অভ্যর্থনা জানায় এবং "ফারুক জিন্দাবাদ" শ্লোগান দিতে  থাকে।

২৫ শে এপ্রিল একই বিমানে তোয়াব এবং ডালিম ঢাকা আসেন। এই ঘটনায়  তোয়াবের প্রতি জিয়ার সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীকালে তোয়াবকে বিমান  বাহিনীর পদ থেকে অপসারণ করা হয়।

২৭ শে এপ্রিল বগুড়া সেনানিবাস থেকে বেংগল ল্যান্সারের সৈনিকেরা এই মর্মে বার্তা পাঠায় যে অবিলম্বে ফারুককে বগুড়া পাঠাতে হবে। তা না হলে তারা ট্যাংকসহ ঢাকা চলে আসবে। এই খবরে জিয়া আতংকিত (?) হয়ে উঠে এবং এক ব্যাটেলিয়ন সৈন্য আরিচা ঘাটে মোতায়েন করে। একই সংগে জিয়া ফারুককে বগুড়া যেতে অনুমতি দেন এবং ফারুক কালো আর্মার্ড ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় বগুড়া সেনানিবাসে প্রবেশ করেন।

২৭ শে এপ্রিল বিকেলে রশীদকে গৃহবন্দি করা হয়। পরদিন সকালে ৪ জন অফিসার তাকে জেনারেল জিয়ার কাছে অফিসে নিয়ে যান। পাশের একটি ঘরে ৬ ঘন্টা বসিয়ে রাখার পর জিয়া সাক্ষাত প্রদান করেন। জিয়া রশীদকে বলেন যে, রশীদ, ফারুক, ডালিম এবং অন্যান্যদেরকে অবশ্যই কিছু দিনের জন্য বাইরে থাকতে হবে।জিয়া তাদের সবাইকে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে চাকুরী প্রদানের নিশ্চয়তা দেন। রশীদকে সামরিক প্রহরায় বিমান বন্দর নিয়ে যাওয়া হয় এবং রশীদ ও ডালিমকে থাই এয়ার ওয়েজের একটি বিমানে ব্যাংকক পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বগুড়া সেনানিবাসে ৬ ইষ্ট বেংগল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে: কর্ণেল হান্নান শাহ বেংগল ল্যান্সারের সৈনিকদেরকে  ঘিরে ফেলে। ঢাকায় জেনারেল জিয়ার সুদৃঢ় অবস্থানের কথা ভেবে এবং রশিদ ও ডালিমের দেশ ত্যাগের কথা জানতে পেরে ফারুক নিরাশ হয়ে পড়ে। জেনারেল জিয়া  ফারুকের পিতা ও বোনকে একটি হেলিকপ্টারে বগুড়া পাঠান এবং ফারুকের  আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তাব দেন। ফারুক কোন উপায়ন্তর না দেখে আত্মসমর্পন  করেন এবং পরে তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

বগুড়া সেনানিবাসে ৬ ইষ্ট বেংগল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে: কর্ণেল হান্নান শাহ বেংগল ল্যান্সারের সৈনিকদেরকে ঘিরে ফেলে। ঢাকায় জেনারেল জিয়ার সুদৃঢ় অবস্থানের কথা ভেবে এবং রশিদ ও ডালিমের দেশ ত্যাগের কথা জানতে পেরে ফারুক নিরাশ হয়ে পড়ে। জেনারেল জিয়া ফারুকের পিতা ও বোনকে একটি হেলিকপ্টারে বগুড়া পাঠান এবং ফারুকের আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তাব দেন। ফারুক কোন উপায়ন্তর না  দেখে আত্মসমর্পন করেন এবং পরে তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় দুইমাস পরে ১৫ ই জুলাই ১৯৭৬ জেনারেল জিয়া বেংগল ল্যান্সারকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। ফারুক ও রশীদ বিদেশী দূতাবাসে চাকুরী গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। বাকী ১১ জনকে বিদেশী দূতাবাস সমূহে পদস্থ করা হয়।

১৯৭৭ সালের মে মাসের ১ম সপ্তাহে আংকারায় বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রথম সেক্রেটারী হিসাবে কর্মরত লে: কর্ণেল (অব:) আবদুল আজিজ পাশা ছুটিতে দেশে ফেরার পথে ইসলামাবাদে যাত্রা বিরতি করেন। সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত মেজর বজলুল হুদা এবং পিকিং থেকে আগত লে: কর্ণেল শরিফুল হক ডালিমের সংগে বৈঠকে মিলিত হন। ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ সরকারকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উৎখাত করার বিষয়টিও আলোচিত হয়। পাশা, ডালিম ও হুদা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা ও সেনাবাহিনীর সৈনিকদের সংগে গোপনে যোগাযোগ করে একটি সশস্ত্র সংগঠন তৈরির পরিকল্পনা করেন। ডালিম এর আগে তেহরানে মেজর নুরের সংগেও এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সাপ্তাহিক হলিডেতে প্রকাশিত পাশার স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায় সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বামপন্থী সরকার গঠন করা এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল।

ডালিম ও পাশা সমমনা সামরিক অফিসার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংগে যোগাযোগ করবেন, সেনাবাহিনীর সৈনিকদের নিয়ে একটি গোপন সংগঠন করার দায়িত্ব পড়লো লে: কর্ণেল দিদারুল আলম ও লে: কর্ণেল নুরুন্নবী খানের ওপর। মোশাররফ হোসেন ও কাজী মনির হোসনকে বাম পন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সংগে যোগাযোগ করার দায়িত্ব দেয়া হয়। মনির জগন্নাথ কলেজের বামপন্থী ছাত্র নেতা ছিলেন এবং মোশাররফ ছিলেন কৃষি ব্যাংকের অফিসার যার সাথে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের যোগাযোগ ছিল। মাও পন্থী সর্বহারা দলের নেতা লে: কর্ণেল জিয়াউদ্দিনের সমর্থনের জন্য ডালিম বেশ কয়েকবার জিয়াউদ্দিনের সংগে যোগাযোগ করেন। কিন্তু জিয়াউদ্দিন এ ধরণের অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি  জানান। ডালিম ও পাশা লিফলেট ছাপানোর জন্য একটি প্রিন্টিং প্রেস ক্রয়ের অর্থ দিদারুল আলমকে দেওয়ার নিশ্চয়তা দেন। অনুরুপভাবে অর্থ সংগ্রহের জন্য একটি আন্ত:নগর বাস কিনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

২৬ থেকে ২৯ শে ডিসেম্বর আংকারায় অপর একটি বৈঠকে পাশা, বজলুল হুদা, রশিদ ও নুর মিলিত হয়। ডালিম ও শাহরিয়ারের ও যোগদানের কথা ছিল। কিন্তু শেষ মূহুর্তে ছুটি না পাওয়ায় উপস্থিত হতে পারেননি। ফারুক তখন বাংলাদেশে ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হয়ে কারাগারে দিন কাটাচ্ছিলেন। আংকারার এই বৈঠকের কথা বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মামুন ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অবহিত করেন। এতে পাশা ক্ষিপ্ত হয়ে মামুনের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন।

এই ঘটনার ৫  মাস পরে ডালিম, শাহারিয়ার ও হুদা আংকারায় যান এবং ২৭ শে মে তারিখে পাশার সাথে বৈঠকে মিলিত হন। নুর ছুটি না পাওয়ার জন্য উপস্থিত হতে পারেননি। রশিদের  পরিবর্তে সদ্য মুক্তি প্রাপ্ত এবং লিবিয়ায় নির্বাসিত জীবন যাপনকারী ফারুকুর রহমান আসেন। দিদারুল আলম জুন মাসেই অভ্যূত্থান ঘটাতে চান কারণ বেশী দেরী করলে গোপনীয়তা রক্ষা করা যাবে না। দিদারুল আলম জাসদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে সৈনিকেরা ৭ই নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লবের মত একটি বিপ্লব ঘটাতে অধিকতর আগ্রহী হয়ে পড়েন। দিদারুল আলম ঢাকায় কুমিল্লা ও সাভার সেনানিবাসের সংগে যোগাযোগ রক্ষা করেন। এভাবেই ১৯৮০ সালের ১৭ই জুন আরেকটি ব্যর্থ অভ্যূত্থান ঘটানে হয়। জিয়া এই সময়ে বিদেশ ভ্রমণে ছিলেন। অভ্যূত্থানকারীরা সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এরশাদকে হত্যা ও অন্যান্য অফিসারদের বন্দি অথবা হত্যা করে ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করেন। সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় অত:পর একটি বিপ্লবী পরিষদ গঠন করে দেশ শাসন করা হবে এবং ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সিপাহী বিদ্রোহের দাবীসমূহ বাস্তবায়ন করা হবে।

সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ এ ঘটনার কথা জেনে ফেলে এবং একটি লিফলেট উদ্ধার করে। ফলে ১৭ই জুন তারিখের অভ্যূত্থান সংঘটিত হওয়ার আগেই ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয়। গোয়েন্দা বিভাগের অফিসারগণ অনেক সৈনিককে গ্রেফতার করেন এবং বাকী সৈন্যরা  পালিয়ে যায়। দিদারুল আলম ভারতে পালিয়ে যায় এবং পরে বাংলাদেশে ফিরে আসলে ১৯৮০ সালের ১১ই নভেম্বর কুষ্টিয়া শহরে একটি হোটেল থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আব্দুল আজিজ পাশাকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য  দেশে ফিরে আসতে বলেন। ১৮ই নভেম্বর পাশা দেশে ফিরলে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত ও সশস্ত্র বাহিনীর সৈনিকদের বিপথগামী করার অভিযোগে ১০ই মার্চ ১৯৮১ সালে ঢাকা সেনানিবাসে এক সামরিক আদালতে এদের বিচার করা হয়। আবদুল আজিজ পাশা ও কাজী মনির হোসেন অপরাধ স্বীকার করেন এবং  রাজস্বাক্ষী হিসাবে সাক্ষ প্রদান করেন। ২০ শে মে তারিখ আদালত দিদারুল আলমকে ১০ বৎসরের কারাদন্ড, মোশাররফ হোসেন ও লে: কর্ণেল নুরুন্নবীকে যথাক্রমে ২ বৎসর ও ১ বৎসরের কারাদন্ডে দন্ডিত করে। কাজী মুনির হোসেনকে ক্ষমা করা হয় এবং সেই সাথে আবদুল আজিজ পাশা ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে আংকারাস্থ বাংলাদেশী দূতাবাসে নিজ কর্মস্থলে ফিরে যান। উল্লেখযোগ্য, ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীতে প্রায় ২১টি ছোট বড় অভ্যূত্থান অথবা বিদ্রোহ সংঘটিত হয়॥"

উৎস : মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি / স্বাধীনতার বাইশ বছর ॥ [ কাকলী প্রকাশনী - ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৪ । পৃ: ৮০-৮৭ ]

COMMENTS

BLOGGER
Name

আন্তর্জাতিক,2,ইতিহাস,4,ইসলাম ধর্ম,1,ইসলামের ইতিহাস,4,কোরআন ও বিজ্ঞান,2,নবী ও রাসুল,1,নাস্তিক্যবাদ,2,পাকিস্তান অধ্যায়,3,প্রতিবেশী ভূ-রাজনীতি,1,বাংলা সাহিত্য,1,বাংলাদেশ অধ্যায়,2,বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব,1,ভাষা আন্দোলন,6,ভাষা ও সংস্কৃতি,1,মতামত,3,মুক্তিযুদ্ধ,5,মুসলিম বিজ্ঞানী,1,মুসলিম শাসনকাল,5,রাজনীতি,9,রাজনীতিবিদ,8,রাষ্ট্র ও প্রসাশন,2,লেখক ও সাহিত্যিক,1,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,2,শিক্ষা ব্যবস্থা,4,সাম্প্রদায়িকতা,1,সাহাবীদের জীবনী,2,সাহিত্য ও সংস্কৃতি,3,
ltr
item
iTech: স্মৃতির আয়নায় জিয়াউর রহমান : প্রথম পর্ব
স্মৃতির আয়নায় জিয়াউর রহমান : প্রথম পর্ব
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। উই রিভোল্ট। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরিত বক্তব্য। ১৯৭১-এর কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষনা।
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgjS0bJHjpwtqsplAuyZJmfkQhk98ZMJfOxOuqrifVRWqjfZAyIX57ofsgCf7sSsO95FLx5yoIe4-Kz9hGm2LVzLDUPwrkWsRnPh1OEEP8dsQ5tUEUpy99JA-11lb2LDIAspfZOEsEEVtzN/s320/Ziaur+Rahman+Art.jpg
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgjS0bJHjpwtqsplAuyZJmfkQhk98ZMJfOxOuqrifVRWqjfZAyIX57ofsgCf7sSsO95FLx5yoIe4-Kz9hGm2LVzLDUPwrkWsRnPh1OEEP8dsQ5tUEUpy99JA-11lb2LDIAspfZOEsEEVtzN/s72-c/Ziaur+Rahman+Art.jpg
iTech
https://qtechmedia.blogspot.com/2017/04/blog-post_29.html
https://qtechmedia.blogspot.com/
https://qtechmedia.blogspot.com/
https://qtechmedia.blogspot.com/2017/04/blog-post_29.html
true
5233664077611017960
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy Table of Content