রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : প্রথম পর্ব

১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির ডাকে এবং সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সমর্থনে এদিন ঢাকা শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। খাজা নাজিমুদ্দীন কর্তৃক উর্দুকে একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিবাদ।

ক. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আমাদের জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং বাঙালী জাতিকে স্বাধিকার অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পরই শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে ১৯৭১ সালে অর্জিত হয় বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। ফেব্রুয়ারি মাস ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত মাস। আমাদের বর্ণমালার অধিকার প্রতিষ্ঠার মাস। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময় আমরা অর্জন করি আমাদের বর্ণমালা ও ভাষার অধিকার। বায়ান্নর এই রক্তাক্ত অধ্যায় একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এ আন্দোলনের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়ে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানী সংবিধানে তথ্য সাপেক্ষে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবার ফলে এ আন্দোলনের বিজয় সূচিত হয়।

পাকিস্তান সৃষ্টির বহু পূর্ব হতেই লেখক, চিন্তাবিদ ও সুধীমহলে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি আলোচিত হতে থাকে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে এই ভাষা সৃষ্টির পর থেকে অনেকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। লেখক ও চিন্তাবিদরা সংবাদপত্র, পুস্তক, পুস্তিকা ও আলোচনার মাধ্যমে একটি প্রতিকূল পরিবেশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার তত্ত্বগত বিষয়টি তুলে ধরেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার স্বপক্ষে লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের এই প্রচেষ্টা রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল যা আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। ভাষা-আন্দোলনের প্রস্তুতিস্বরূপ লেখকদের এই প্রয়াস ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্যযুগের মাতৃভাষাপ্রেমী কবি আব্দুল হাকিম প্রথম বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এবং আন্দোলনের পক্ষে প্রথম কবিতা রচনা করেন। আবদুল হাকিমের সুবিখ্যাত ‘নুরনামা’ কাব্যগ্রন্থের ‘বঙ্গবাণি’ শীর্ষক কবিতাটি হলো : “যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণি, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয়ণ ন জানি”। ‘বাংলা ভাষা বাঙালী মুসলমানদের মাতৃভাষা। এ ভাষা আমাদের জাতীয় ভাষা’। এ কথা সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর পূর্বে কোন অভিজাত মুসলমান এমন দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেননি। প্রকৃতপক্ষে, তিনিই উপমহাদেশের বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম প্রস্তাবক (ভাষা আন্দোলনের ডায়েরী / মোস্তফা কামাল, শতদল প্রকাশনী লিঃ, ১৯৮৯, পৃ: ১৫)। ১৯২১ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য লিখিত প্রস্তাব পেশ করেন নওয়াব আলী চৌধুরী। এ প্রস্তাব করতে গিয়ে তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারকে বলেছিলেন, “ভারতের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক, বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে হবে বাংলা ভাষাকে”। (বাংলা রাষ্ট্রভাষার প্রথম প্রস্তাবক নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী / আবু মোহাম্মদ মোতাহহার, দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮)

উপমহাদেশে বৃহত্তর ক্ষেত্রে ভাষাতাত্ত্বিকের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা ভাষা ব্যবহারের দাবি উত্থাপন করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে মত প্রকাশ করেন। এর তীব্র প্রতিবাদ করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি ১৯৪৭ সালের ২৯ জুলাই দৈনিক আজাদে “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা” নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। উক্ত প্রবন্ধে বাংলা ভাষার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার দাবি সবচেয়ে বেশি এবং গ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণ করা হয়েছে। বাংলা ভাষা সম্পর্কে তিনি বলেন “এই বাংলাই হইবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাষ্ট্র ভাষা”। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর সম্পাদিত দৈনিক আজাদ পত্রিকা বাংলার মুসলমান-হিন্দুকে সজাগ করে দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে দীর্ঘ সম্পাদকীয় লেখে। ১৯৩৭ সালের ২৩ এপ্রিল ‘ভারতের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, “সাহিত্যের মধ্যে বাংলা সমস্ত প্রাদেশিক ভাষার মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বাংলা ভাষায় বিবিধ ভাব প্রকাশোপযোগী শব্দের সংখ্যাও বেশি। অতএব, বাংলা সবদিক দিয়েই ভারতের রাষ্ট্রভাষা হবার দাবি করতে পারে।” আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত ১৯৪৭ সালের ২৭ জুন তারিখে প্রকাশিত দৈনিক মিল্লাত পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে “মাতৃভাষার পরিবর্তে অন্য কোনো ভাষা রাষ্ট্রভাষা রূপে বরণ করার চাইতে বড় দাসত্ব আর কিছুই থাকতে পারে না॥

উৎস : এম.আর.মাহবুব / জনকণ্ঠ : চতুরঙ্গ॥ (রোববার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : ৫ই ফাল্গুন ১৪১৯)

দুই. পূর্ব পাকিস্তানবাসীকে এই ঘৃণ্য দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধিতে যদি কেই বাসনা করে, তাহা হইলে তাহার সে উদ্ভট বাসনা বাঙালীর প্রবল জনমতে ঝড়ের তোড়ে তৃণমন্ত্রের মত ভাসিয়ে যাইবে।” পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও চিন্তাবিদরা তাদের লেখায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন। স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব-পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তার জাতীয় ভাষা বা রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ সম্পর্কে তারা সুস্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেন সংবাদপত্রের পাতায় এবং নানা আলোচনায়। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ‘আল এসলামে’ লেখেন, ‘মাতৃভাষাকে জাতীয় ভাষার স্থলে বরণ ব্যতীত কোন জাতি কখনও উন্নতির সোপানে আরোহণ করিতে পারে না।’ ১৯৪২ সালে প্রকাশিত ‘পাকিস্তান’ শীর্ষক গ্রন্থে প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মুজিবর রহমান খাঁ বলেন, ‘সকল দিক দিয়া বিবেচনা করিয়া পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে বাংলাকে গ্রহণ করাই যুক্তিসঙ্গত।’ সাহিত্যিক, সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ ১৩৫০ বঙ্গাব্দ (১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ) সালের কার্তিক সংখ্যা মাসিক ‘মোহাম্মদী’তে প্রকাশিত ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনাব’ শীর্ষক প্রবন্ধে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন।

১৯৪৭ সালের মধ্যভাগে আবদুর হক তাঁর ‘ভাষা আন্দোলনের আদিপূর্ব’ গ্রন্থে চারটি প্রবন্ধ লিখেন। আব্দুল হক রচিত ‘বাংলা বিষয়ক প্রস্তাব’ শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধটি দু’কিস্তিতে দৈনিক ইত্তেহাদ এর (কলকাতা) রবিবাসরীয় বিভাগে ১৯৪৭ সালের ২২ ও ২৯ জুন প্রকাশিত হয়েছিল। বশীর আল হেলালের মতে, এটাই রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে প্রথম প্রবন্ধ। (ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস / বশীর আলহেলাল, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃ: ১৮৯)।

১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই তারিখের দৈনিক ইত্তেহাদ এ প্রকাশিত ‘রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ শীর্ষক প্রবন্ধে মাহবুব জামাল জাহেদী বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বাংলা রাষ্ট্রভাষা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য উর্দু রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করা হলেই সুবিচার হবে’। ১৯৪৭ সালের ২১ জুলাই দৈনিক আজাদে আবদুল মতীনের ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ নামক প্রবন্ধে প্রবন্ধকার পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলা ভাষার কথা বলেছেন। ১৯৪৭ সালের ২৭ জুলাই এ.কে নূরুল হক বি.এ এর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ প্রবন্ধটি দৈনিক আজাদে প্রকাশিত হয়। উক্ত প্রবন্ধে তিনি বাংলার ভাষাগত উপযোগিতা বিবেচনা করে দেখিয়েছেন যে, ‘একমাত্র বাংলা ভিন্ন রাষ্ট্রভাষা হবার যোগ্যতা ও দাবি কোন ভাষারই নেই।’ এভাবেই লেখালেখির মাধ্যমে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য বিভিন্ন সময়ে কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পূর্বে লেখালেখির মাধ্যমে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিষয়টি সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদরা তুলে ধরেন। দেশ বিভাগের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি বাস্তবের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় এবং আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্নটিও জড়িত হয়ে যায়।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে দেশের জনগণের ওপর এক ষড়যন্ত্রমূলক হটকারী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন। পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদী মুসলিম শাসক ও রাজনীতিবীদরা বাংলা ভাষা তথা বাঙালী জাতিসত্তা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অপপ্রয়াস চালান। সেই থেকে শুরু। বাঙালী জাতি ও বাংলা ভাষার এই সঙ্কটকালে ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মহলের একটি অংশ রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

Related image

১৯৪৭ সালের জুন মাসে ‘গণআজাদী লীগ’ নামে একটি সংগঠন জন্মলাভ করে। তারা ‘আশু দাবি কর্মসূচি আদর্শ’ নামে একটি ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে। এই ম্যানিফেস্টোতে বলা হয় ‘বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষাকে দেশের যথোপযোগী করিবার জন্য সর্বপ্রকার ব্যবস্থা করিতে হইবে। বাংলা হইবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।” ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘গণতান্ত্রিক যুব লীগ’ গঠিত হয়। এ দু’টি সংগঠন সর্বপ্রথম সাংগঠনিকভাবে বাংলাকে পাকিস্তানের আইন আদালতের ভাষা ও রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম ভাষা-আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে ‘তমদ্দুন মজলিস’ নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেমের উদ্যোগ ও নেতৃত্বে এই সংগঠনটি জন্মলাভ করে। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তাদের উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ভাষা-আন্দোলনের প্রথম পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’। ১৮ পৃষ্ঠার উক্ত পুস্তিকার ৩টি প্রবন্ধে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। ‘আমাদের প্রস্তাব’ প্রবন্ধটি লেখেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। ‘রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধটি লেখেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন এবং ‘বাংলা ভাষাই হইবে আমাদের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি লেখেন আবুল মনসুর আহমদ। ‘আমাদের প্রস্তাব’ প্রবন্ধে অধ্যাপক আবুল কাসেম সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন : ১) বাংলা ভাষাই হবে, ক) পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন, খ) পূর্ব পাকিস্তানের আদালতের ভাষা, গ) পূর্ব পাকিস্তানের অফিসাদির ভাষা। ২) পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা হবে দুটি উর্দু ও বাংলা। উক্ত পুস্তিকা সম্বলিত ঘোষণাপত্র প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠা সূচিত হয়।

১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ঢাকা কলেজ ছাত্রাবাস ‘নূপুর ভিলা’য় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র সভাপতিত্বে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও উর্দু করা হোক’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে এটিই প্রথম সেমিনার।

১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রথম ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিপি ফরিদ আহমদ, অধ্যাপক একেএম আহসান, ছাত্রনেতা আবদুর রহমান চৌধুরী, কল্যাণ দাসগুপ্ত এবং এস. আহমদ।

১৯৪৭ সালের ১২ ডিসেম্বর একদল সন্ত্রাসী কর্তৃক উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য বাস ও ট্রাক মিছিল এবং পলাশী ব্যারাক, মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে হামলা চালায়। ১৯৪৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষের সন্ত্রাসী কর্তৃক মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে হামলার প্রতিবাদে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সরকারী অফিসে এদিন ধর্মঘট পালিত হয়। মূলত এটাই ছিল পাকিস্তান-উত্তর সরকারী অফিসে প্রথম ধর্মঘট। ঐ দিন থেকে ১৫ দিনের জন্য ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয় (প্রবন্ধ মঞ্জুষা, পূর্বোক্ত, পৃ: ৯০)।

১৯৪৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্নিকটে রশিদ বিল্ডিং-এ (বর্তমানে এই ভবনটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের জরুরী বিভাগের পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত এবং জনতা ব্যাংকের শাখা) তমদ্দুন মজলিসের অফিসে অনুষ্ঠিত এক সভায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক নিযুক্ত হন তমদ্দুন মজলিসের ড. নূরুল হক ভূঁইয়া।

১৯৪৮ সালে ভাষা-আন্দোলন বিশেষ গতি লাভ করে এবং বিকশিত হতে থাকে। এ সময় ভাষা-আন্দোলনে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের ফলে আন্দোলন তীব্রতর আকার ধারণ করে এবং গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ২০ জানুয়ারি ১৯৪৮ তারিখে রশিদ বিল্ডিং-এ অবস্থিত ভাষা-আন্দোলন ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ অফিস আক্রান্ত হয়। পুরনো ঢাকার উর্দুভাষীরা অফিসের জিনিসপত্র ভাংচুর করে এবং নেতৃবৃন্দকে লাঞ্ছিত করে। পরে রশিদ বিল্ডিংস্থ উক্ত অফিসটি তালা বন্ধ করে দেয় (সাপ্তাহিক সৈনিক, ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩)। পর পর কয়েকদফা ভাষা-আন্দোলন বিরোধীদের হামলার শিকার হবার কারণে অফিস স্থানান্তরিত হয়॥

উৎস : এম.আর.মাহবুব / জনকণ্ঠ : চতুরঙ্গ॥ (সোমবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : ৬ই ফাল্গুন ১৪১৯)

তিন. ২৫ জানুয়ারি ১৯৪৮ তারিখে তমদ্দুন মজলিসের অফিস আবার ১৯ নং আজিমপুরস্থ অধ্যাপক আবুল কাসেমের বাসভবন এবং মোহাম্মদ তোয়াহার প্রস্তাবক্রমে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ও ভাষা-আন্দোলনের অফিস ফজলুল হক হলে স্থানান্তরিত হয়। এতদসঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনের গতি আরো বেগবান হয় (বাংলা একাডেমী সম্পাদিত ‘একুশের সংকলন’ ৮০ : মোহাম্মদ তোয়াহার স্মৃতিচারণ, পৃ: ৮১-৮৮ এবং সাপ্তাহিক সৈনিক, ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩)।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে শুরু হয় পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন। উক্ত অধিবেশনে পূর্ববাংলার অন্যতম প্রতিনিধি ও পরিষদ সদস্য ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি অধিবেশনের তৃতীয় দিন ২৫ ফেব্রুয়ারি উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলা পরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির দাবি তোলেন। উক্ত অধিবেশনে মুসলিম লীগ দলীয় বাঙালী সদস্যরা বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। গণপরিষদের বাংলা ভাষাবিরোধী সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সমগ্র ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়।

১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তমদ্দুন মজলিসের সাবকমিটি ও পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম ছাত্র লীগের যৌথ সভায় ১১ মার্চ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। (দৈনিক আজাদ, ২ মার্চ ১৯৪৮)। ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ তারিখে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মঘট পালিত হয়। এ সময় পুলিশের দমননীতি ও লাটিচার্জে কয়েকজন আহত ও গ্রেফতার হয় (একুশের সংকলন ৮০, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮০, পৃ: ৩৭)।

১৯৪৮ সালের ১ মার্চ এক বিবৃতির মাধ্যমে ১১ মার্চের ধর্মঘট সফল করার জন্য বিবৃতি প্রদান করা হয়। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন তমদ্দুন মজলিসের সম্পাদক অধ্যাপক আবুল কাসেম, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কাউন্সিল সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দীন আহমদ এবং এস এম হলের ভিপি আবদুর রহমান চৌধুরী। (দৈনিক আজাদ, ২ মার্চ ১৯৪৮)।

১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত তমদ্দুন মজলিস ও মুসলিম ছাত্র লীগের এক যৌথ সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ৪ মার্চ ১৯৪৮ তারিখে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা এবং ১১ মার্চের হরতালকে সফল করার জন্য পরিষদের আহ্বায়ক শামসুল আলমের সভাপতিত্বে এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। ৬ মার্চ, পত্রিকায় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। ১১ মার্চের কর্মসূচি সফল করার জন্য ১০ মার্চ, ১৯৪৮ তারিখে অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়াও ৮, ৯ এবং ১০ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সকল শাখা পৃথকভাবে দেশের সর্বত্র বৈঠক ও গণসংযোগ করেছেন। (আনন্দবাজার পত্রিকা, ৮ মার্চ, ১৯৪৮)॥

উৎস : এম.আর.মাহবুব / জনকণ্ঠ : চতুরঙ্গ॥ (মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : ৭ই ফাল্গুন ১৪১৯)

চার. ১১ মার্চ ১৯৪৮ তারিখটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঐদিন পূর্ব পাকিস্তানে সফল হরতাল পালিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এটাই ছিল প্রথম হরতাল কর্মসূচি। ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র ছাত্র ধর্মঘট, বিক্ষোভ, মিছিল ও পিকেটিং হয়। সচিবালয়ের প্রবেশ গেটে শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ এবং দ্বিতীয় গেটের সামনে কাজী গোলাম মাহবুব, শওকত আলী, খালেক নওয়াজ প্রমুখ নেতা পিকেটিং করেন। পিকেটিং করার অপরাধে গ্রেফতার হন কাজী গোলাম মাহবুব, শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী, অলি আহাদ, রণেশ দাশগুপ্ত, শওকত আলীসহ অসংখ্য নেতাকর্মী।

১১ মার্চের হরতালে সরকারি জুলুম ও নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১২, ১৩ এবং ১৪ তারিখ পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। ১২, মার্চ ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট চলাকালে জগন্নাথ কলেজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এক সভায় সন্ত্রাসীরা আবারো আক্রমণ করে। এদিন নারায়ণগঞ্জে হরতাল পালন করা হয়। ১৩ মার্চ কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা ১১ মার্চের হামলা ও নির্যাতনের প্রতিবাদে ‘ঢাকাই ইস্তেহার’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। ১৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে ৫ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে এস.এম. হলের তৎকালীন ভিপি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়াও সারাদেশে হরতাল, সভাসমাবেশ ও বিবৃতির মাধ্যমে আন্দোলন ও প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে। (দৈনিক আজাদ, ১৩ মার্চ, ১৯৪৮, আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ১৩, ১৫ মার্চ, ১৯৪৮)। ১১ মার্চের আন্দোলনের তীব্রতার কারণে প্রাদেশিক সরকার আপোসমুখী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন আলোচনায় প্রস্তাব রাখেন।

১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে তদানীন্তন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে ৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৫ মার্চ, ১৯৪৮ তারিখে রাষ্ট্রভাষা চুক্তির অনুমোদন নেয়ার জন্য ১১ মার্চ গ্রেফতারকৃত নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অধ্যাপক আবুল কাসেম ও কামরুদ্দীন আহমদ কারাগারে আটকা নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কারাবন্দী নেতৃবৃন্দের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শামসুল হক, কাজী গোলাম মাহবুব প্রমুখ চুক্তির শর্তাবলী পরীক্ষা করে অনুমোদন করেন। (ভাষা-আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিল-২য় খ-, বদরুদ্দীন উমর, বাংলা একাডেমী, ১৯৮৫, জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫ অলি আহাদ, পৃ: ৫৭)। ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় চুক্তি সংশোধনের দাবিতে শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ১৭ মার্চ ঢাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয় এবং ঐদিন বিকালে পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহবায়ক নঈমুদ্দীনের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, আবদুর রহমান চৌধুরী।

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ বিকেলে পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ রেসকোর্সে ময়দানে (আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল নাগরিক সংবর্ধনা সভায় জিন্নাহ তাঁর ভাষণে বলেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা- অন্য কোনো ভাষা নয়।” ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভাষণ প্রদান করেন। তিনি পুনরায় তাঁর ভাষণে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়া উচিত বলে ঘোষণা করেন। (দৈনিক আজাদ, ২৪ মার্চ ১৯৪৮ এবং আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ২৫ মার্চ ১৯৪৮)। রেসকোর্স ময়দানে এবং কার্জন হলের ভাষণের সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ করেন।

রাষ্ট্রভাষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর চুক্তি বাস্তবায়নের তথাকথিত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারি ঘোষণায় ভাষা-আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। ১৯৪৯ সালের শুরু থেকে ১৯৫১ সালের শেষ পর্যন্ত ভাষা-আন্দোলন তেমন গতি পায়নি। ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয় এবং আন্দোলন আবারও চাঙ্গা হয়।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন নতুনভাবে সংগঠিত হয় এবং সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকার পল্টন ময়দানের এক জনসভায় ঘোষণা করেন : “উর্দুই এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।” নাজিমুদ্দীনের বক্তব্যের পর সারাদেশে শুরু হয় প্রতিবাদ সভা, বিক্ষোভ আর মিছিল। গড়ে ওঠে ব্যাপক গণআন্দোলন। ২৭ জানুয়ারি ১৯৫২ তারিখে পল্টন ময়দানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একমাত্র উর্দু এবং উর্দু হরফে বাংলা লিখনে প্রচেষ্টা সাফল্যমন্ডিত হচ্ছে বলে যে উক্তি করেছেন, তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়। ২৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ জানুয়ারি ছাত্ররা প্রতীক ধর্মঘট পালন করে এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।

২৯ জানুয়ারি ১৯৫২ ইং তারিখে খাজা নাজিমুদ্দীন কর্তৃক উর্দুকে একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিবাদে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের একটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ জানুয়ারি ১৯৫২ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘট, সভা ও মিছিল পালনের কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়। এছাড়া ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ হরতাল, সভা ও বিক্ষোভ মিছিলের সিদ্ধান্ত হয়।

৩১ জানুয়ারি ১৯৫২, ঢাকা বার লাইব্রেরীতে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে এক সভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। উক্ত পরিষদে আহ্বায়ক নির্বাচিত হন আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা কাজী গোলাম মাহবুব। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘট, সভা ও মিছিলের যে কর্মসূচী ঘোষণা করেছিল, বার লাইব্রেরীর এই সভায় উক্ত কর্মসূচীর প্রতি সমর্থন জানানো হয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, সভা ও বিক্ষোভ মিছিলের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, ১০ দিনব্যাপী পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে সফর শেষে ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে গবর্নমেন্ট হাউসে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তৃতাকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও অখ-তার স্বার্থে একটিমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়ে বলেন, আমি সুষ্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হতে চলেছে, অন্য কোন ভাষা নহে। তবে এটা যথাসময়ে হবে। তিনি বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নাকচ করে দেন।

৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির ডাকে এবং সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সমর্থনে এদিন ঢাকা শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ঢাকায় প্রায় দশ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর মিছিল বের হয়। মিছিলটি প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীনের বাসভবন হয়ে নবাবপুর রোড, পাটুয়াটুলী, আরমানীটোলা, নাজিমুদ্দীন রোড অতিক্রম করে। ছাত্রছাত্রীরা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এবং ‘আরবী হরফে বাংলা লেখা চলবে না’ বলে স্লোগান দেয়।

১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয় ‘গত ২৭ জানুয়ারি পাক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন পল্টনে কয়েক হাজার লোকের এক জনসভায় এক লিখিত নসিহতে নাদান বনী আদমকে অনেক ওয়াজই করেছেন’। ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদের জরুরী অধিবেশনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আপোসহীন সংগ্রাম পরিচালনার কথা ঘোষণা দেয়া হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে তার মোগলটুলিস্থ বাসভবনে পূর্ববঙ্গ কর্মশিবির অফিসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক সভায় ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত এবং ১১ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে ৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও বিক্ষোভের মর্মস্পর্শী বিবরণ দেয়া হয়। এতে বলা হয় ‘৪ ফেব্রুয়ারি। হরতাল। সাধারণ হরতাল। সাধারণ ছাত্র হরতাল। সর্বত্র প্রস্তুতি। রাস্তায়, অলিতে-গলিতে-বস্তিতে পোস্টার আর প্রচার কোথাও বাধা নেই। এখানে সেখানে সহানুভূতি, সমর্থন সক্রিয় কর্মপ্রচেষ্টা।

১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখার কারণে ‘দ্য পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকাটি এদিন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। উল্লেখ্য, পত্রিকাটির ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তারিখের সংখ্যায় প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীন সম্পর্কে এক সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিল “ইসলামের তৃতীয় খলিফা অত্যন্ত ধার্মিক ও সৎ লোক ছিলেন। কিন্তু তিনি নির্লজ্জ আত্মীয়তোষণের অপরাধে অপরাধী ছিলেন না। তার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধ-বান্ধব যাদের দাবি আদৌ বিবেচনার যোগ্য ছিল না, তিনি তাদেরকেই নানারূপ ক্ষমতার অধিকারী করেছিলেন॥

উৎস : এম.আর.মাহবুব / জনকণ্ঠ : চতুরঙ্গ। বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : ৮ই ফাল্গুন ১৪১৯॥  [ কৃতজ্ঞতাঃ কাই কাউস]

আরো দেখুনঃ

১. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : ২য় পর্ব 

২. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : ৩য় পর্ব 

      COMMENTS

      BLOGGER
      Name

      আন্তর্জাতিক,2,ইতিহাস,4,ইসলাম ধর্ম,1,ইসলামের ইতিহাস,4,কোরআন ও বিজ্ঞান,2,নবী ও রাসুল,1,নাস্তিক্যবাদ,2,পাকিস্তান অধ্যায়,3,প্রতিবেশী ভূ-রাজনীতি,1,বাংলা সাহিত্য,1,বাংলাদেশ অধ্যায়,2,বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব,1,ভাষা আন্দোলন,6,ভাষা ও সংস্কৃতি,1,মতামত,3,মুক্তিযুদ্ধ,5,মুসলিম বিজ্ঞানী,1,মুসলিম শাসনকাল,5,রাজনীতি,9,রাজনীতিবিদ,8,রাষ্ট্র ও প্রসাশন,2,লেখক ও সাহিত্যিক,1,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,2,শিক্ষা ব্যবস্থা,4,সাম্প্রদায়িকতা,1,সাহাবীদের জীবনী,2,সাহিত্য ও সংস্কৃতি,3,
      ltr
      item
      iTech: রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : প্রথম পর্ব
      রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : প্রথম পর্ব
      ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির ডাকে এবং সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সমর্থনে এদিন ঢাকা শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। খাজা নাজিমুদ্দীন কর্তৃক উর্দুকে একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিবাদ।
      https://www.dainikdonet.com/wp-content/uploads/2017/12/600x4001487374402_6b0c4b829c92ac43e1158c32f7fa0907-24.jpg
      iTech
      https://qtechmedia.blogspot.com/2017/04/blog-post_71.html
      https://qtechmedia.blogspot.com/
      https://qtechmedia.blogspot.com/
      https://qtechmedia.blogspot.com/2017/04/blog-post_71.html
      true
      5233664077611017960
      UTF-8
      Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy Table of Content