কোনটা ‘শ্লীল’ কোনটা ‘অশ্লীল’? শ্লীল-অশ্লীল বিতর্ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অশ্লীল চিত্র। জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
কোনটা ‘শ্লীল’ কোনটা ‘অশ্লীল’?
সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন না, বিতর্ক করতে পারবেন। এটা একটা চিরন্তন বিতর্ক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিতর্ক ভিন্নতা পায়। একটা সমাজে আজ যা ‘শ্লীল’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য, এক সময় তা ছিল ‘অশ্লীল’। নারী-পুরুষ সম্পর্ক, যৌনতা নিয়ে এক সময় কথা বলা ছিল চূড়ান্ত অশ্লীলতা হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীতে পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করে যৌনশিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সন্তান জন্ম, সন্তান ছেলে-মেয়ে হয় কি করে, ইত্যাদি বিষয় আমাদের শিক্ষাক্রমেও বহু বছর ধরে আছে। নতুন নতুন রোগ-সংকট থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে কনডম নিয়ে আলোচনা এখন অশ্লীল হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন না, বিতর্ক করতে পারবেন। এটা একটা চিরন্তন বিতর্ক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিতর্ক ভিন্নতা পায়। একটা সমাজে আজ যা ‘শ্লীল’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য, এক সময় তা ছিল ‘অশ্লীল’। নারী-পুরুষ সম্পর্ক, যৌনতা নিয়ে এক সময় কথা বলা ছিল চূড়ান্ত অশ্লীলতা হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীতে পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করে যৌনশিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সন্তান জন্ম, সন্তান ছেলে-মেয়ে হয় কি করে, ইত্যাদি বিষয় আমাদের শিক্ষাক্রমেও বহু বছর ধরে আছে। নতুন নতুন রোগ-সংকট থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে কনডম নিয়ে আলোচনা এখন অশ্লীল হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
‘আমি কি করে এলাম’- শিশুর এই প্রশ্নে এক সময় ‘আকাশ থেকে’... ইত্যাদি কথা বলে উত্তর দেওয়া হতো। অসত্য নয়, সত্যটাই শিশুকে জানাতে হবে, বোঝাতে হবে- এই মত এখন পৃথিবীতে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত।
পৃথিবীতে ‘ন্যুড চিত্রকর্মে’র ইতিহাস তো বহু বহু বছরের। ন্যুড ফটোগ্রাফিও বহু পুরনো বিষয়। এসব নিয়ে শ্লীল-অশ্লীল তর্ক বা বিতর্ক তখনও ছিল, এখনও আছে। ধারণা করা হয় আগামীর পৃথিবীতেও তা থাকবে।
বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রায় কোনো কিছুই আর গোপন থাকছে না। তবে গোপন রাখার প্রবণতা থেকে মানুষ পুরোপুরি বের হয়ে আসেনি বা আসতে পারেনি। কতটা বলব কতটা বলব না, শ্লীল-অশ্লীল নিয়ে নতুন একটি বিতর্কের সূচনা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অশ্লীল চিত্র প্রদর্শনের অভিযোগ এনে, তাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার প্রেক্ষিতে কিছু কথা।
১. অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রিয়াজুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তিনি শ্রেণিকক্ষে ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শন করেছেন। ‘জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ দুই বছরের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্স। ব্যাংক, সামরিক বাহিনী, এনজিও... বিভিন্ন ক্ষেত্রের পেশাজীবীরা মূলত এই কোর্সের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সব শিক্ষার্থীই প্রাপ্ত বয়স্ক। আর এই কোর্সে দশ পনেরো বছর ধরে চাকরি করছেন, এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক। বিষয়টি জেন্ডার নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই পড়ানোর সময় নারী-পুরুষ সম্পর্ক, যৌনতা, সমকামিতা, ধর্ষণ, প্রোসটিটিউশন ইত্যাদি প্রসঙ্গগুলো আসে।
২০১১ সাল থেকে এই কোর্সটি পড়াচ্ছেন অধ্যাপক ড. রিয়াজুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিইউপিতেও তিনি বিষয়টি পড়াচ্ছেন। আধুনিক পদ্ধতিতে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে পড়িয়ে থাকেন। তার প্রেজেন্টেশনে তথ্য, ছবি সবই থাকে। যৌনতা বা সমকামিতা বা প্রোসটিটিউশন নিয়ে পড়াতে গেলে যে তথ্য বা ছবি থাকা প্রাসঙ্গিক, তাই থাকে।
অধ্যাপক ড. রিয়াজুল হক ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন ১৯৯১ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। এমফিলও করেছেন এই বিভাগ থেকে। ফিলিন্ডার্স ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া থেকে পিএইচডি করেছেন ওমেনস স্টাডিজে। থিসিসের বিষয় ছিল, ‘Voice from the Edge: Justice, Agency and the plight of Floating sex workers in Dhaka.’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন ২০০৩ সালে। তিনি এই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। অস্ট্রেলিয়ার ফিলিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স থিসিসের এবং ভারতের আইআইটি’র পিএইচডি থিসিসের এক্সটার্নাল এগজামিনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশ-বিদেশের বহু জার্নালে নিয়মিত লিখে থাকেন। ‘জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ কোর্সটি রিয়াজুল হক পড়াচ্ছেন ২০১১ সাল থেকে। এযাবৎকালে কখনো কোনো অভিযোগ আসেনি তার বিরুদ্ধে। তার চেয়ে অনেক বেশি বয়সী শিক্ষার্থীদেরও অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষক রিয়াজুল হক। যে কোর্সে কথিত ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শন করেছেন বলে অভিযোগ এনে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে, সেই কোর্সটি গত দুই বছর ধরে পড়ানো হয়েছে। পরীক্ষা হয়েছে। রেজাল্টও হয়ে গেছে। অর্থাৎ কোর্স সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যাওয়ার পরে তার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আনা হয়েছে। শুধু অভিযোগ আনা হয়নি, সাময়িকভাবে বহিষ্কারও করা হয়েছে।
২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি বা ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শনের অভিযোগ আসলে, নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নিতে হবে। তার কিছু প্রক্রিয়া আছে। ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শনের অভিযোগ আনা অধ্যাপক ড. রিয়াজুল হকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা, তার কতটা করা হয়েছে।
ক. দু’একজন শিক্ষক সূত্রে জানা যায় কোর্স চলাকালীন দু’তিনজন শিক্ষার্থী ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শনের অভিযোগ করেছিল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে।
খ. অভিযোগের ভিত্তিতে অধ্যাপক ড. রিয়াজুল হককে ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে কোনো কিছু জানানো হয়নি। কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি।
গ. শিক্ষার্থীরা অভিযোগ আনলে প্রথমে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। সিন্ডিকেটে যাওয়ার কথা শেষ পর্যায়ে।
ঘ. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেছেন, তাকে কয়েকবার মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। তিনি তা গুরুত্ব দেননি।
৩. সিন্ডিকেট মিটিং করে ড. রিয়াজুলকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিল। এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে গিয়ে প্রো-ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলছেন, তাকে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। সতর্ক কেন মৌখিকভাবে করা হলো? লিখিতভাবে নয় কেন? কোর্স থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষ তখনই কেন নিলেন না?
তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই, তিনি ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শন করে পাঠদান করেছেন। সতর্ক করলেও না শুনে তার পদ্ধতিতে পাঠদান অব্যাহত রেখেছেন। অভিযোগ কেন কোর্স শেষে ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর আনা হলো? কেন তাকে এতদিন কথিত ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শনের মাধ্যমে ক্লাস নিতে দেওয়া হলো? রিয়াজুলকে বহিষ্কারের পক্ষে দাঁড় করানো যুক্তিগুলো অত্যন্ত দুর্বল।
অধ্যাপক ড. রিয়াজুল পরিষ্কার করে বলছেন, তার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ আনা হয়েছে তিনি জানেন না। কেউ কখনো মৌখিক বা লিখিতভাবে তাকে কিছু জানাননি। সতর্কও করেননি। ড. রিয়াজুল বলেছেন, ‘আমি নির্বিঘ্নে ক্লাস, পরীক্ষা নিয়েছি। রেজাল্ট দিয়েছি। এখন পত্রিকা থেকে জানছি যে, আমাকে ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শনের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে। আমি যারপর নাই বিস্মিত হয়েছি। কি অভিযোগ তা আমাকে জানানো হলো না। বহিষ্কার কেন করা হলো, তারও কোনো কাগজ আমি পাইনি। অথচ আমার বিরুদ্ধে এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া হলো? লিখিত কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়া, সিন্ডিকেট সভায় বহিষ্কার?’ রিয়াজুলের এই অভিযোগের জবাব কী? এত গুরুত্বপূর্ণ অফিসিয়াল অভিযোগ, মৌখিকভাবে জানানো যায়? মৌখিকভাবে জানানোর কোনো প্রমাণ থাকে না। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের হাতে কোনো প্রমাণ নেই। কোনো প্রমাণ ছাড়া একজন শিক্ষককে বহিষ্কার, নজিরবিহীন ঘটনা না বলে উপায় নেই।
৪. ‘কার্পেটের নিচে ময়লা রেখে আমরা পরিচ্ছন্নতার ভান করি’ কথাটি বলতেন প্রখ্যাত সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত চৌধুরী। আমাদের সমাজের সর্বত্রই এই চিত্র দৃশ্যমান। টানবাজার থেকে যৌনকর্মীদের উচ্ছেদ করে, আমরা ছোয়াব কামানোর ভান করা সমাজে বসবাস করছি। এক জায়গায় পর্দার অন্তরালে থাকা যৌনকর্মীদের যে সারা শহরে ছড়িয়ে দিয়েছি, তা বিবেচনা করিনি। এক জায়গায় থাকার চেয়ে, সর্বত্র ছড়িয়ে দিলে সমস্যা বাড়ে না কমে, তাও বিবেচনা করে দেখিনি।
বিষয়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতার কারণে একজন শিক্ষক দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে বিষয়টি পড়াচ্ছেন, ছবি দেখাচ্ছেন। সমাজে বিদ্যমান থাকলে সমস্যা হচ্ছে না, পড়ালে বা ছবি দেখালে সমস্যা হচ্ছে!
এদেশে যখন প্রথম ফটো সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন শাহাদাত চৌধুরী, অশ্লীলতার বিতর্ক তখনও এসেছিল। বিচিত্রা যখন ঈদ ফ্যাশনে মডেলদের পোশাক পরিয়ে ছবি ছাপার ধারা চালু করেছিল, যার ওপর ভিত্তি করে আমাদের আজকের দেশীয় বুটিক শিল্প গড়ে উঠেছে, তখন এদেশে মডেল পাওয়া যেত না। নিজের এবং বন্ধু, আত্মীয়-পরিজনের সন্তানদের মডেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। আমাদের আজকের যে অভিনয় শিল্পী, মডেল সব কিছুর পেছনে শাহাদাত চৌধুরীর সেই ভূমিকা নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। তখন সমালোচনায় পিছিয়ে গেলে, আমাদের মার্কেট হয়তো বিদেশি মডেলদের দখলে থাকত।
৫. এযাবৎকালে এই সমালোচনাগুলো করেছে ধর্মকে পুঁজি করে যারা ব্যবসা করেন তারা। এটা ছিল তাদের সম্পদ, সাঈদীকে যারা চাঁদে দেখার আজগুবি তত্ত্ব প্রচার করে। সময় এবং রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপটও পরিবর্তন হয়ে গেছে। প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিতরা এখন শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করছেন, তারপর ধর্ম ব্যবসায়ীদের দিয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মিছিল করাচ্ছেন। এটা একটা ভয়ঙ্কর প্রবণতা। মৌলবাদী ধর্ম ব্যবসায়ী চক্র নেপথ্যে থেকে প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিতদের দিয়ে অধ্যাপক রিয়াজুলকে বহিষ্কার করিয়েছেন। ধর্ম ব্যবসায়ীরা একই সঙ্গে রিয়াজুলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, আবার তারাই সমালোচনা করছেন প্রগতিশীলদের-আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের।
ধর্ম ব্যবসায়ীদের চেনা যায়। প্রগতিশীল হিসেবে দাবিদার কিন্তু ধর্ম ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকদের চেনা কঠিন। রিয়াজুল স্বাস্থ্য-যৌনতা, সমকামিতা, ধর্ষণ তথা সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেন। তার পড়ানোর বিষয়ই তাই। নিজেও পৃথিবীর অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়েছেন এ বিষয়ে। ধর্ম ব্যবসায়ী ও তাদের অনুসারীদের চোখে রিয়াজুলরা সব সময়ই শত্রু হিসেবে বিবেচিত। দেশের গণমাধ্যমের দিকে তাকালে দেখা যায়, ধর্ম ব্যবসায়ী দু’তিনটি পত্রিকা ইতোমধ্যে বিষয়টি ইস্যু করে ফেলেছে। তাদের এই ইস্যু তৈরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক প্রো-ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। তিনি আওয়ামী সমর্থিত শিক্ষকদের বড় নেতা। ড. রিয়াজুল ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শন করেছেন, তা অশ্লীল নয় পর্নোগ্রাফির পর্যায়ে পড়ে, সবচেয়ে বড়ভাবে তিনিই প্রচার করছেন। রিয়াজুল যা পড়াচ্ছেন, যে ছবি দেখাচ্ছেন তার সব কিছুরই সফট কপি আছে। বারবার দেখেও তার মধ্যে অশ্লীলতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। যে ছবি তিনি দেখিয়েছেন তার সবই প্রথম আলোসহ জাতীয় পত্র-পত্রিকা থেকে নেওয়া। রিয়াজুল যেসব ছবি দেখান, দেখিয়েছেন তা একজন ধর্ম ব্যবসায়ীর কাছে হয়তো ‘অশ্লীল চিত্র’ মনে হতে পারে। কারণ তারা মানসিকভাবে অন্তরে অশ্লীলতা ধারণ করেন, বাহ্যিক চিত্রে ভিন্নতা থাকলেও। প্রশ্ন আসে অধ্যাপক আখতারুজ্জামানরা প্রগতিশীলতার কোন মানসিকতা ধারণ করে আছেন? তারা ধর্ম ব্যবসায়ীদের হাতে ইস্যু তুলে দিচ্ছেন! ড. রিয়াজুল ছবি প্রদর্শন করেছেন (তা অশ্লীল নয়) শ্রেণিকক্ষে, প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের সামনে তাদের পড়ানোর অংশ হিসেবে। তিনি প্রকাশ্যে জনসমাবেশে কোনো ছবি প্রদর্শন করেননি, বক্তব্য রাখনেনি। শ্রেণিকক্ষের বিষয়কে সবার সামনে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার করার দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ধরনের বিষয় সব সময়ই ধর্ম ব্যবসায়ীরা ইস্যু হিসেবে বেছে নেয়। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় তিনি বিপদে পড়ে যান। সাম্প্রতিক সময়ে যা ‘চাপাতি হত্যাকাণ্ডে’র পর্যায়ে চলে গেছে। প্রো-ভিসি আখতারুজ্জামান ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শনের ছবি প্রদর্শনের অভিযোগ এনে, প্রচার করে ড. রিয়াজুল হকের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্বনামধন্য তরুণ শিক্ষককে ধর্ম ব্যবসায়ীদের টার্গেটে ফেলে দিয়েছেন, প্রো-ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তার বক্তব্যে মনে হচ্ছে, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে ইসলামিক স্টাডিজ পড়ানো হবে! ‘ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ বিভাগে তো ইসলামি স্টাডিজ পড়ানোর সুযোগ নেই! সেখানে নারী-পুরুষ সম্পর্ক, সমাজ-বাস্তবতা, যৌনতা, যৌনকর্মীর সমস্যা, ধর্ষণ... বিষয়গুলোই পড়ানো হবে।
৬. আমরা চাইলেই সমাজ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারি না। চোখ বন্ধ করে থাকার ভান করতে পারি, তা কোনো উপকারে আসে না। সব কিছু দেখে-জেনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারার নামই আধুনিকতা। পৃথিবী সেভাবেই এগুচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষকরা আজ ড. রিয়াজুলকে অপদস্থ করার জন্যে হীন উদ্দেশ্যে চক্রান্ত করছেন, তারা মূলত সমাজকেই পিছিয়ে দিচ্ছেন। তাদের আপাত টার্গেট একজন রিয়াজুল হলেও, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো দেশ। যারা প্রচার করছেন ড. রিয়াজুল ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শন করছেন তার চেয়ে খোলামেলা ছবি নিজের বাড়ির টেলিভিশনে প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে। পরকীয়া প্রেমের জটিল-কুটিল সমীকরণের সিরিয়াল তাদের বাড়ির স্ত্রী-সন্তানরা একসঙ্গে বসেই দেখছেন। আর বাইরে এসে তথাকথিত পবিত্রতার ভান করছেন।
৭. যে সমাজ ‘সত্য’ লুকিয়ে ‘ভান’ প্রবণ হয়ে যায়, সেই সমাজ আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক প্রগতিশীল ড. রিয়াজুলদের ধারণ করতে চায় না। যেহেতু রিয়াজুলদের সঙ্গে তর্কে যুক্তিতে মেধায় পেরে ওঠা যায় না, সেহেতু ভিন্ন পথ নিতে হয়। সমাজে সবসময়ই রিয়াজুলদের সংখ্যা কম থাকে। স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার কেটে তাদের টিকে থাকতে হয়, কঠিন মূল্য দিতে হয়।
প্রগতিশীল এবং ধর্ম ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়ে সম্মিলিতভাবে যখন ড. রিয়াজুলদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। বর্তমান বাংলাদেশে আমরা তেমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছি।
অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, রিয়াজুল কখনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একজন প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে পরিচিত। রিয়াজুলের বিরুদ্ধে সরাসরি যারা কাজ করছেন, ষড়যন্ত্রের কলকাঠি নাড়ছেন, তারা কলেজ জীবনে শিবিরের রাজনীতি করতেন। (আনিস রায়হানের রিপোর্টে তাদের বক্তব্য দেখেন কেমন গোঁজামিলে ভরা,স্ববিরোধী) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হয়ে তারা এখন আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষক হিসেবে পরিচিত এবং পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত। স্কুল পাঠ্যবই থেকে আমরা প্রগতিশীল অংশগুলো ছেঁটে ফেলে দিচ্ছি। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই নীতির বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি। কাজটি করতে গিয়ে ধর্ম ব্যবসায়ীদের ব্যবহার এতটা বেড়ে গেছে যে, বিচারালয়ের সামনে ‘ন্যায় বিচারের প্রতীক’ রাখাটাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। পহেলা বৈশাখ বা মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরুদ্ধে আগামীতে হয়তো তীব্র আন্দোলন দৃশ্যমান হবে। এগুলোর কোনোটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একটির সঙ্গে আরেকটি গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
৮. নিজের অযোগ্যতা আড়াল করে অসততাকে জায়েজ করার জন্যে ধর্ম ব্যবসায়ীদের কাছে আত্মসমর্পণ, আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছু নয়। এই আত্মহত্যা ব্যক্তিগত নয়, সমাজগত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। ভেতরে যে ঘুণপোকার আক্রমণ হয়েছে, আত্মহত্যার প্রবণতা তারই প্রমাণ। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি-নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা এবং সক্ষমতার মান কোন স্তরে নেমে এসেছে তার একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে লেখা শেষ করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ফেসবুক পাতা আছে। সম্প্রতি সেখানে একটি লেখায় স্বনামধন্য শিক্ষার্থীদের নাম লিখতে গিয়ে ড. ইউনূসের নাম লেখা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগে। বিতর্কের সূচনা হয়েছে এটা নিয়েই। তারপর লেখাটি সম্পাদনা করে বঙ্গবন্ধুর নাম ড. ইউনূসের আগে লেখা হয়েছে। এবার বঙ্গবন্ধুর নামের আগে ‘জাতির জনক’ লেখা হয়েছে।
তার কিছুক্ষণ পর লেখাটি আবার সম্পাদনা করা হয়েছে এবং ড. ইউনূসের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ প্রথম লেখাতেই যথাযোগ্য শ্রদ্ধার সঙ্গে এভাবে নাম লেখা প্রত্যাশিত ছিল। যাকে কেন্দ্র করে একটি স্বাধীন দেশ, অবশ্যই তিনিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার্থী। যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বুঝতেই পারেননি। তৃতীয়বারের সম্পাদনায় ড. ইউনূসের নাম বাদ দেওয়াটাও নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক।
ফেসবুক পাতার এই লেজেগোবরে অবস্থার দায় নিতে চাইছেন না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ফেসবুক পাতা নেই। যদিও ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর এই ফেসবুক পাতার উদ্বোধন করে কেক কেটেছিলেন উপাচার্য। ২০১৫ সালে ভেরিফাইড পেজের মর্যাদা পাওয়ার পরের কেক কাটা অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন উপাচার্য।
গত ৪৫ বছরের বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার জন্যে অধিকাংশ সময়ে যোগ্যদের বিবেচনা করা হয়নি। দলীয় পরিচয়ের অযোগ্যদের বিবেচনা করা হয়েছে। অযোগ্যদের হাতে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কমে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। যদিও সেখানে এখনও অনেক মেধাবী শিক্ষক আছেন, শিক্ষার্থী আছেন। এত কম সক্ষমতার বিশ্ববিদ্যালয় ড. রিয়াজুলদের মতো আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক প্রগতিশীল আদর্শবান শিক্ষকদের ধারণ করতে পারে না। একজন রিয়াজুল একটি বিভাগের চেয়ারম্যান হবেন, তা অযোগ্য প্রগতিশীল এবং পরিচয় গোপনকারী ধর্মব্যবসায়ী, কেউই চায় না। তারা রিয়াজুলদের তাড়িয়ে পদ দখল করে থাকতে চায়॥ লিখেছেন : গোলাম মোর্তোজা॥ (কলামিস্ট)

COMMENTS