মহান স্বাধীনতার ঘোষক, আধুনিক বাংলাদেশের রুপকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান। জিয়া প্রশাসন : সবুজ বিপ্লবের এক অধ্যায়। রাষ্ট্রপতির আদেশ সত্ত্বেও, আমি জানি, সংস্থাপন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি ছাড়া এ আদেশ জারি করা যাবে না।
"... আমি ১৯৮১ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়ে এসেছি। অত্যন্ত মেধাবী, উন্নয়ন প্রশাসনে অভিজ্ঞ ও লক্ষ্য অর্জনে দুর্বার ও দৃঢ়চিত্ত আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান আমার সচিব। প্রশাসন পরিচালনায় তার স্টাইল ছিল তার পছন্দের ও আস্থার ব্যক্তিদের বিভিন্ন পদে সমাসীন করে তাদের হাতে প্রশাসনের খুঁটিনাটি ছেড়ে দিয়ে নীতিনির্ধারণী বিষয়ে মনোনিবেশ করা। কিছুদিন গেলে দেখি যে অন্য অনেক সচিবের মতো অধিকাংশ নথি তিনি পরে দেখবেন বলে ধরে রাখতেন না। ফাইল খুলে দ্রুত স্বাক্ষর করে নথি নিষ্পত্তি করে দিতেন। তার বুদ্ধিমত্তা এত প্রখর ছিল যে কোন বিষয়গুলো তাকে ভালোভাবে দেখতে হবে, তা তিনি জানতেন এবং সেই নথিগুলো তিনি রেখে যেতে বলতেন।
একদিন একটা নথি আমার হাতে দিয়ে সচিব বললেন, যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় আদেশ ও বিজ্ঞপ্তিগুলো জারি করো। আমার অফিসকক্ষে ফিরে নথি খুলে বিস্ফারিত চোখে দেখি, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের আধুনিকায়নের জন্য তাদের লোকবল সংখ্যা বহুগুণ বাড়িয়ে একটা বিরাট অর্গানোগ্রাম তৈরি করা হয়েছে, যেখানে শুধু পদসংখ্যাই বাড়ানো হয়েছে, তাই-ই নয়, অনেক নতুন নতুন পদও সৃষ্টি করা হয়েছে এবং বিদ্যমান পদের মান উন্নীত করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগে মহাপরিচালকের একটি পদ সৃষ্টি করে তাকে সচিবের বেতন স্কেল প্রদান করা হয়েছে, যা তখন শুধু বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা পরিষদের নির্বাহী ভাইস-চেয়ারম্যান ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের আর কোনো বিভাগীয় প্রধানের জন্য প্রযোজ্য ছিল না। মোট ৩২ হাজার পদসংবলিত এই অর্গানোগ্রামের শেষ পাতায় তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সবুজ কালিতে লেখা এরকম একটি অনুমোদন ছিল : "নথিতে রক্ষিত প্রস্তাবসমূহ অনুমোদন করা হল। সংস্থাপন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির কোন প্রয়োজন নাই।" কৃষি সম্প্রসারণের সঙ্গে জড়িত পাঁচটি স্বতন্ত্র বিভাগকে একক নিয়ন্ত্রণে আনার জন্যই এই উদ্যোগ। এ ধরণের একীভূতকরণের জন্য ইতিমধ্যে অনেক সমীক্ষা হয়েছে এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্বব্যংকও এ কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করার তাগিদ দিয়ে আসছিল। প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা এবং যথার্থতা নিয়ে কোনো সন্দেহ কিংবা বিতর্কের অবকাশ নেই। সমস্যা হচ্ছে এর প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি নিয়ে। সরকারের রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী যেকোনো প্রশাসনিক সংস্কার প্রস্তাব কিংবা অর্গানোগ্রামের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন কিংবা বিয়োজন প্রথমে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ব্যাপক পরীক্ষা-নিরোক্ষার পর তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির জন্য পাঠানো হয়। এদের পরীক্ষা শেষ হলেই কেবল নথি রাষ্ট্রপতির কাছে তার চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। তবে এই দুটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কে আমলাতান্ত্রিক মহলের ধারণা যে, এরা অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং বর্তমান যুগের চাহিদা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য দৃষ্টিভঙ্গির যে প্রসারতা ও কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য যে সাহস দরকার, তা তাদের নেই। এরা দুইকে বাড়িয়ে বড়জোর চার করতে পারে; কিন্তু চারশ করার মতো সাহস এদের নেই। এসব শুনেই হয়তো রাষ্ট্রপতি ওই দুই মন্ত্রণালয়কে বাদ দিয়েই তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।
রাষ্ট্রপতির আদেশ সত্ত্বেও, আমি জানি, সংস্থাপন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি ছাড়া এ আদেশ জারি করা যাবে না। তা করলে মহাহিসাব রক্ষক এদের বেতন-ভাতা দেবেন না। আমি যুগ্ম সচিব পর্যায় পর্যন্ত চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আমার সচিবের কাছে ফিরে গিয়ে বললাম, স্যার, সংস্থাপন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি ছাড়া এ বিজ্ঞপ্তি জারি করা যাবে না। নিচের পর্যায়ে কথা বলে ব্যর্থ হয়েছি। আপনি অর্থসচিবের সঙ্গে কথা বলুন। ওবায়দুল্লাহ খান অর্থসচিব গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে কথা বললে তিনি সব কাগজপত্র নিয়ে পরের দিন তার দপ্তরে আমাকে হাজির হতে বললেন।
![]() |
| শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান॥ |
রাষ্ট্রপতির আদেশ সত্ত্বেও, আমি জানি, সংস্থাপন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি ছাড়া এ আদেশ জারি করা যাবে না। তা করলে মহাহিসাব রক্ষক এদের বেতন-ভাতা দেবেন না। আমি যুগ্ম সচিব পর্যায় পর্যন্ত চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আমার সচিবের কাছে ফিরে গিয়ে বললাম, স্যার, সংস্থাপন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি ছাড়া এ বিজ্ঞপ্তি জারি করা যাবে না। নিচের পর্যায়ে কথা বলে ব্যর্থ হয়েছি। আপনি অর্থসচিবের সঙ্গে কথা বলুন। ওবায়দুল্লাহ খান অর্থসচিব গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে কথা বললে তিনি সব কাগজপত্র নিয়ে পরের দিন তার দপ্তরে আমাকে হাজির হতে বললেন।
পাকিস্তান অডিট এন্ড একাউন্ট সার্ভিসের অন্যতম সদস্য গোলাম কিবরিয়া তার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও জটিল বিষয় দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমলাতান্ত্রিক মহলে বহুল আলোচিত ছিলেন। তিনি খুব দ্রুত বিষয়টি অনুধাবন করতে পারলেন এবং তার সরাসরি হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনকৃত অর্গানোগ্রামটি ঠিক যেভাবে তিনি অনুমোদন করেছিলেন, সেভাবেই বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হই। দেশের স্বাধীনতাকালে প্রায় ৯০ লাখ হেক্টর জমিতে বাংলাদেশ ৭০ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করেছিল। কৃষিযোগ্য সেই জমির পরিমাণ বর্তমানে অনেক হ্রাস পেলেও এখন বাংলাদেশ ৩ কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করছে। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ১৯৮১ সালের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের আধুনিকায়ন কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে॥"
উৎস : এ টি এম শামসুল হুদা (সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার) / ফিরে দেখা জীবন ॥ [ প্রথমা প্রকাশন - ফেব্রুয়ারী, ২০১৪ । পৃ: ১৪৬-১৪৭ ] [ কৃতজ্ঞতা : কাইকাউস ভাই ]

COMMENTS