রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, ১৯৫২ সালের ইতিহাস, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, একুশের ইতিহাস।
সাত. এদিন সন্ধ্যায় পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে নির্মিত শহীদমিনারটি সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে দেয়। এ সময় পুলিশ ৭০ ছাত্রকে গ্রেফতার করে। ভাষা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য ড. পিসি চক্রবর্তী, চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, প্রক্টর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক অজিত গুহ, জগন্নাথ কলেজ, যতীন সেন, এমএল প্রমুখ শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তারিখে গ্রেফতার করা হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ কর্তৃক ধর্মঘট স্থগিত ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আবার শুরু হয়। এদিন ঢাকা শহরে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল মিছিলহীন ঢাকা শহরে মহিলাদের বিক্ষোভ সভা। ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার প্রয়াস পায়। এদিন থেকে ঢাকা শহরের অফিস-আদালতে স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু হয় এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এদিন চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নূর আহমদ একুশের রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিষয়টি বিবেচনার জন্য গণপরিষদের স্পীকার বরাবর একটি নোটিস জমা দেন। এ ব্যাপারে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত খবরটি ছিল এ রকম: ‘পাকিস্তান গণপরিষদের চট্টগ্রামের সদস্য মি. নূর আহমদ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে গণ্য করার জন্য এক প্রস্তাবের নোটিস দিয়েছেন বলে জানা গেছে। আগামী ২০ মার্চ পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে বসলে এ প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, এদিন জননিরাপত্তা আইনের আওতায় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্য এবং কয়েক ছাত্র যুব নেতার বিরুদ্ধে ঢাকা গেজেটের বিশেষ ঘোষণার মাধ্যমে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তাদের মধ্যে শামসুল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নওয়াজ, অলি আহাদ, আবদুল মতিন, সৈয়দ নূরুল আলম, মোহাম্মদ তোয়াহা অন্যতম। এদিন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে, বরিশালের ঢাকাস্থ কিছু সংখ্যক ছাত্র, ঢাকা প্রবাসী মতলব থানার ছাত্রবৃন্দ এবং ঢাকাস্থ মাদ্রাসা আলিয়ার ত্রিপুরা জেলার আরবী ছাত্রদের পক্ষ থেকে তাদের স্ব স্ব জেলার এমএলএ-দের পদত্যাগ দাবি করেন।
২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ নারায়ণগঞ্জের মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী মমতাজ বেগমকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী। এ ঘটনায় সেখানকার জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। এদিন পুলিশ আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিস, ‘ইনসাফ’ পত্রিকার অফিস এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল তল্লাশি করে এবং ১০ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে।
১ মার্চ ১৯৫২ মুন্সীগঞ্জে অনুষ্ঠিত ঢাকা জেলা শিক্ষক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একুশের ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি করেন। ১ মার্চ ১৯৫২ তারিখে কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘মতামত’ এ প্রকাশিত হয় কমিউনিস্ট পার্টির পশ্চিমবঙ্গ কমিটির একটি বিবৃতি। উক্ত বিবৃতিতে বীর ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান হয়। ২ মার্চ রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে জড়িত ৯ জন নেতার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। এরা হলেন কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নওয়াজ, শামসুল হক, অলি আহাদ, মুহাম্মদ তোয়াহা, আব্দুল মতিন, নূরুল আলম, আজিজ আহমদ ও আবদুল আউয়াল। ইতোপূর্বে জননিরাপত্তা আইনে তাদের বিরুদ্ধে আটকাদেশ জারি হয়েছিল। ৩ মার্চ নূরুল আমীন ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কিত তার দ্বিতীয় বক্তৃতা প্রদান করেন। তিনি তাঁর ভাষণে একুশের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন এবং আন্দোলনের জন্য কমিউনিস্টদের দোষারোপ করেন।
৬ মার্চ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ এক সভায় মিলিত হয়ে সারাদেশ থেকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ৭ মার্চ শুক্রবার ৭টায় ৮২ নং শান্তিনগরস্থ ডাক্তার আবদুল মোতালেবের বাসায় রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের কিছু নেতাকর্মী বৈঠক করার সময় পুলিশ সেখানে হানা দিয়ে ৮ জনকে গ্রেফতার করে। তাদের মধ্যে মুহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আবদুল মতিন, সাদেক খান, আবদুল লতিফ, হেদায়েত হোসেন চৌধুরী ও মজিবুল হক। কাজী গোলাম মাহবুব বাশের খাঁচার ওপর লুকিয়ে থাকার কারণে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। ৯ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ভাষা-আন্দোলনে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের মুক্তিদানের ব্যাপারে সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়। ১০ মার্চ ১৯৫২ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৫ জনকে ভাষা-আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ১১ মার্চ ১৯৫২ তারিখে ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী ছাত্রবৃন্দ। যাদেরকে ২১ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করা হয়েছিল, তাদের মধ্য থেকে ৭৮ ছাত্রকে সতর্ক করে ছেড়ে দেয়া হয়। ১২ মার্চ নিখিল চীন ছাত্রফেডারেশন একটি তারবার্তায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশনের কাছে জানান, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে চীনের ছাত্রসমাজ পূর্ণ সমর্থন করেছে। ১৪ মার্চ ১৯৫২, শুক্রবার চকবাজারস্থ বড়কাটরায় আতাউর রহমান খানের বাসভবনে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে নেতৃবৃন্দ সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন এবং একই সঙ্গে আন্দোলনকে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে পুনর্গঠন করেন। পুনর্গঠিত কমিটিতে আতাউর রহমান খান আহ্বায়ক এবং সৈয়দ আবদুর রহিম ও কামরুদ্দীন আহমদ যুগ্ম-আহ্বায়ক নির্বাচিত হন।
১৫ মার্চ ১৯৫২ তারিখে ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি টিএইচ এলিসকে সভাপতি করে এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। ২৩ মার্চ ১৯৫২ তারিখ সাপ্তাহিক সৈনিকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এলিস কমিশনের বিচার্য বিষয় প্রত্যাখ্যান করে। ২৬ মার্চ ১৯৫২ তারিখে পাকিস্তান গণপরিষদের আলোচনার জন্য ৩টি বেসরকারি প্রস্তাব পেশ করা হয়। প্রস্তাব তিনটিতে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়।
২৯ মার্চ ১৯৫২ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এলিস কমিশনকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। ২৭ এপ্রিল ১৯৫২ তারিখে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে বার লাইব্রেরি হলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের জেলা ও মহকুমা প্রতিনিধিদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়। ১৫ মে ১৯৫২ বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির গৃহীত এক প্রস্তাবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য ‘স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান’ শুরু হয়। ২০ নভেম্বর ১৯৫২ ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে আওয়ামী লীগের বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় জনাব সোহরাওয়ার্দীর বক্তৃতায় বাংলা রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে তার আগেকার মত সংশোধন করে পাকিস্তানে বাংলা ও উর্দু রাষ্ট্রভাষা দাবি জানান।
৫ ডিসেম্বর ১৯৫২ বন্দীমুক্তি দিবস পালন করা হয়। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ এদিন পূর্ব পাকিস্তানে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে ‘বন্দীমুক্তি দিবস’ পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ এদিন আরমানিটোলা ময়দানে বিরাট জনসভা করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিষদের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান। আওয়ামী লীগ এ সময় সারা প্রদেশে ব্যাপকভাবে বন্দীমুক্তি আন্দোলন করছিল এবং যথাযথভাবে দিবসটি পালন করে।
১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে রক্তদানের পরও বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হতে আরও সময় লেগেছিল। ভাষা প্রশ্নে সরকারের দমননীতি এবং রাষ্ট্রভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যাপারে টালবাহানা চলতে থাকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস উদ্যাপন এবং অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিকে সচল রাখা হয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক বিজয় সূচিত হয় পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলার স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র গৃহীত হলে পাাকিস্তান গণপরিষদে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু ও বাংলা’ ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম শহীদ দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে ঢাকার কার্জন হল ও মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে ছাত্ররা ‘শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ’ নির্মাণ করে। ঢাকা কলেজের ছাত্ররা ও ইডেন কলেজের ছাত্রীরা কর্তৃপক্ষের বাধার কারণে একটি অসম্পূর্ণ শহীদমিনার নির্মাণ করেন।
একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ একুশের প্রথম বার্ষিকীতে বিভিন্ন স্তরের এবং বিভিন্ন শ্রেণীর নারী-পুরুষ ভোরে নগ্নপদে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রভাতফেরিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শহীদমিনার এবং আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদের কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। এটাই ছিল একুশের প্রথম প্রভাতফেরি।
একুশের ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টায় আরমানিটোলা ময়দানে জনাব আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তৃতা করেন, আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি শেখ মুজিবুর রহমান, রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের কাজী গোলাম মাহবুব, গণতন্ত্রদলের জনাব মাহমুদ আলী, মোসাম্মৎ হালিমা খাতুন, তোরায়ে আরাবিয়ার সম্পাদক শহীদুল হক, রিক্সালীগের জনাব সেলিম, সিভিল লির্বাটি লীগের সৈয়দ আবদুর রহিম, নিখিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের আখতার উদ্দিন, ইসলামী ভ্রাতৃসংঘের জনাব ইব্রাহিম তাহা, ছাত্রলীগের ওয়াদুদ, খেলাফতে রববানী পার্টির সোলায়মান, যুবলীগের জনাব ইমাদুল্লাহ, শামসুল হক, আবদুস সালাম, হেদায়েতুল ইসলাম, গাজীউল হক, মতিয়ুর রহমান, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, সদর আলী প্রমুখ বক্তৃতা করেন।
একুশের প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সম্পাদনা করেন হাসান হাফিজুর রহমান এবং প্রকাশক ছিলেন মোহাম্মদ সুলতান। ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে ‘পুথিপত্র’ প্রকাশনা সংস্থা থেকে এটি প্রকাশিত হয়। সংকলনটির তাৎপর্যময় প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম, রেখা অঙ্কন করেন মুর্তজা বশীর ও বিজন চৌধুরী। নিজহাতে সঙ্কলনটির উৎসর্গপত্র লিখেন ড. আনিসুজ্জামান। ১৮৩ পৃষ্ঠার প্রথম সঙ্কলনটির মূল্য ছিল দু’ টাকা আট আনা। একুশের প্রথম সংকলনটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
১১ মার্চ ১৯৫৩ তারিখে রাষ্ট্রভাষা দিবস উদ্যাপন করা হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ এদিন ঢাকায় বার এ্যাসোসিয়েশন হলে আলোচনা সভার আয়োজন করে। আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আবুল কাশেম, আবদুল মতিন, শেখ মুজিবুর রহমান, জমিরুদ্দিন, আবদুল অদুদসহ আরো অনেকে। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের চেতনায় যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয় ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর। এ দিন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এক যুক্ত বিবৃতির মাধ্যমে যুক্তফ্রন্ট গঠনের ঘোষণা দেন (সাপ্তাহিক সৈনিক, ৭ ডিসেম্বর ১৯৫৩)।
৮-১২ মার্চ ১৯৫৪ এ সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট কর্তৃক মুসলিম লীগকে পরাজিত করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ২৫ জানুয়ারি ১৯৫৫ তারিখে প্রকাশিত এক সরকারি প্রেসনোটে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কায় শহীদ দিবস পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। (সাপ্তাহিক সৈনিক, ২৭ জানুয়ারি ১৯৫৪)। ১২ আগস্ট, ১৯৫৫ তারিখে মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলায় বক্তৃতা করেন। পাকিস্তান গণপরিষদে এটাই ছিল প্রথম বাংলায় বক্তৃতা (সাপ্তাহিক সৈনিক, ২৩ মার্চ ১৯৫৬)। ৩ ডিসেম্বর ১৯৫৫ তারিখ পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার বর্ধমান হাউজে বাংলা একাডেমীর উদ্বোধন করেন। (বাংলা একাডেমী- পত্রিকা, ১ম সংখ্যা, জানুয়ারি, ১৯৫৭)
১২ জানুয়ারি ১৯৫৬ দৈনিক আজাদে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রবীণ রাজনীতিবিদ আবুল হাশিম পাকিস্তানের খসড়া শাসনতন্ত্রে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে সরকারী ভাষার স্থলে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। তাছাড়া যুক্তফ্রন্টের ও অনুরূপ দাবি জানান। ১৩ জানুয়ারি সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদনে শাসনতন্ত্রে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান হয় (দৈনিক আজাদ, ১২ ও ১৩ জানুয়ারি ১৯৫৬)। ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ তারিখে একুশে ফেব্রুয়ারিকে সরকারী ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে পূর্ব পাক প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার এক বিবৃতি প্রদান করেন (দৈনিক আজাদ, ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬)।
১৭ জানুয়ারি ১৯৫৬ তারিখে অনুষ্ঠিত আইন পরিষদের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংসদের দৈনন্দিন কার্যসূচি বাংলা ভাষায় মুদ্রণ করার দাবি জানান। সে সময় এ কার্যসূচি শুধু ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় মুদ্রিত হতো। ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ তারিখের অধিবেশনেও তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান (ভালবাসি মাতৃভাষা-ভাষা-আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি স্মারকগ্রন্থ-বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, মার্চ, ২০০২, পৃ: ১৮২-১৯১)। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ পূর্ববঙ্গ সরকারের এক ইশতেহারে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ এবং শহীদ পরিবারকে সাহায্য প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে জানানো হয় (দৈনিক আজাদ, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬)। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে প্রথম সরকারি ছুটি ঘোষণা কার্যকর করেন তৎকালীন আবু হোসেন সরকার ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে।
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ পূর্বপাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার মওলানা ভাসানী এবং শহীদ বরকতের মা হাসিনা খাতুন সমবেতভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে শহীদমিনারের ভিত্তি স্থাপন করেন (সাপ্তাহিক সৈনিক, ২ মার্চ ১৯৫৬)। একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ তারিখে আবু হোসেন সরকারের আমলে প্রথমবারের মতো তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় (সাপ্তাহিক সৈনিক, ২ মার্চ ১৯৫৬)। বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায় ২৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৬। এইদিন পাকিস্তান গণপরিষদে পাকিস্তান ইসলামী রিপাবলিকের প্রথম সংবিধান গৃহীত হয়। এই সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা-সংক্রান্ত ২১৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়- (১) পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু ও বাংলা।
বাংলা ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনের সার্থকতা প্রসঙ্গে গাজীউল হক বলেন, “১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান গৃহীত হলো। সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হলো। ‘আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতির প্রথম বিজয়লাভ। রক্তের স্বাক্ষরে প্রতিষ্ঠিত হলো বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রথম সিঁড়ি॥”
উৎস : এম.আর.মাহবুব / জনকণ্ঠ : চতুরঙ্গ॥ (শনিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : ১১ই ফাল্গুন ১৪১৯)
আরো দেখুনঃ
১. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : প্রথম পর্ব
২. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : দ্বীতিয় পর্ব
আরো দেখুনঃ
১. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : প্রথম পর্ব
২. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : দ্বীতিয় পর্ব
COMMENTS