স্মৃতির আয়নায় জিয়াউর রহমান : দ্বীতিয় পর্ব

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। উই রিভোল্ট। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরিত বক্তব্য। ১৯৭১-এর কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষনা।

[ স্মৃতির আয়নায় জিয়াউর রহমান : প্রথম পর্ব১১. "... সবাই বলল, আজকের রাতটি ভালো নয়। খাওয়াদাওয়া সেরে দশটায় চলে গেলাম খামারের একটি বিজনবাড়িতে, যেখানে চিটাগাং থেকে দীর্ঘপথ হেঁটে এসে পৌঁছুছেন বিয়াইন গুলশান আরা ও তার স্বামী আফতাব। ভালোই হল। ওরা বেজায় ক্লান্ত। তবু ছাড়লাম না। ছোট ব্যবসা ফেঁদেছে, বন্দরেই থাকত ওরা। জিজ্ঞেস করলাম, মেজর জিয়াকে দেখেছেন?

আফতাব বললেন, দেখিনি বলা যায় না কারণ তিনি আমাদের কাছে খুবই মূর্তিমান। ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমি সিগারেট ধরাই। আর বলতে লাগল, পঁচিশে মার্চ ও তার পরবর্তী কয়টি দিনের কাহিনী। সে কাহিনী একদিকে যেমন নৃশংস ও ভয়ংকর অন্যদিকে তেমনি রোমাঞ্চকর ও গৌরবমন্ডিত। ব্যারিকেডে ব্যারিকেডে বাঙময়, থমথমে বীর প্রসবীণী চট্টগ্রাম। গত কয়দিনের ঘটনাধারা অনেকের মনেই প্রশ্ন তুলেছে, কোনো একটা মীমাংসা কি হবে না? সত্যই সংঘর্ষ, সংগ্রাম? বৈঠকের ফলাফল জানবার জন্য সবাই উদগ্রীব, তবু সন্দেহ যায় না। আওয়াজ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ থাকে অব্যাহত। এমনিভাবে ধীরে ধীরে নেমে এল সেই কলঙ্কময় রাত, পূর্ব ভূখন্ডে যে রচনা করবে বর্বরতার এক নতুন ইতিহাস। নিরীহ, নিষ্পাপ - শুধু বেঁচে থাকার অধিকার সচেতন মানবসন্তানদের কি অতীতের জঘণ্যতম ঘাতকেরাও এমনি নির্বিচারে হত্যা করেছে? প্রায় ক্রুদ্ধ আফতাব। ধকধক করে জ্বলছে তার চোখজোড়া। সওয়াল করলেন, কিন্তু কেন এত রক্ত, এত খুন? তার মানে আমরা তৈরি ছিলাম না? কেন তৈরি ছিলাম না? তার অর্থ কি আত্মপ্রসাদ না সমঝোতার মনোভাব? একদিকে আমরা ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ো বলছি কিন্তু অন্যদিকে সেনাবাহিনীর বাঙালি অংশের উপরেও বিশ্বাস স্থাপন করতে পারিনি। তার মানে কি নেতৃত্ব হারানোর ভয়? বললাম, এর জবাব সোজা নয়। এখন - পঁচিশের রাতে, তারপর কী ঘটল শুনতে চাই।

রাত তখন সাড়ে এগারোটার মতো, একটা ট্রাক ছুটে চলেছে ষোলোশহরের ছাউনি থেকে বন্দরের দিকে। ট্রাকের উপরে, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রসজ্জিত কিছু নৌসেনা ও বাঙালি সৈন্য; এবং সামনে একজন পাঞ্জাবি অফিসারের সঙ্গে একজন বাঙালি মেজর। স্তব্ধ মুখ, তিনি চিন্তামগ্ন। আগ্রাবাদ, সুমুখে ব্যারিকেড। ট্রাক থেমে গেল। এখানে বাধা সবচেয়ে বড় বলে শ্রম ও সময় দুই-ই বেশি লাগছিল। পশ্চিমা সামরিক অফিসার, সামনে বসে আছেন তেমনি। কিন্তু বাঙালি মেজর নামলেন। তাঁর হাতঘড়ির কাঁটা অবিরাম চলছে, টিকটিক টিকটিক। সেই তালে টিকটিক করছে বুঝিবা তার হৃৎপিন্ডও। তিনি পায়চারি করতে থাকেন। মনের ভিতরে তার হাজারো প্রশ্নের ভিড়। এমনিভাবে, পথ সাফ করতে করতে ঘড়ির কাঁটা কখন বারোটার ঘর পেরিয়ে গেছে, তাদের খেয়াল ছিল না। পূর্ব প্ল্যান অনুযায়ী, বারোটা একমিনিটে, ঢাকার মতো চট্টগ্রামে সামরিক আক্রমণ শুরু হল। কিছু গোলাগুলির শব্দ এদিকেও আসছিল, কিন্তু ঠিক কী ঘটেছে এরা জানত না। সন্দেহ সংশয় অনিশ্চয়। এমনি সময়ে একটি ভক্স গাড়ি ছুটে এসে সশব্দে ব্রেক কষল তাদের কাছে। দরজা খুলে লাফিয়ে নামলেন একজন বাঙালি ক্যাপ্টেন। উত্তেজিত কন্ঠে বললেন, পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের আক্রমণ করেছে। তারা রাস্তায় নেমে পড়েছে এবং গোলাগুলি ছুড়ছে। বহু লোক হতাহত হয়েছে। আমরা কি করব - নির্দেশ দিন। নীরবতা, আধামিনিট। মাত্র আধামিনিট ভাবলেন মেজর জিয়াউর রহমান।

তারপর স্পষ্ট অথচ সুদৃঢ়স্বরে বললেন, "উই রিভোল্ট"। সংক্ষিপ্ত দুটি শব্দ। এই দুটি শব্দ থেকেই সূচিত হল এক নতুন ইতিহাস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। এক রীতিসম্মত সামরিক সংগ্রাম একটি তির্যক অগ্নিশিখার মতো জেগে উঠল। ষোলোশহর সামরিক ছাউনিতে ফিরে এলেন জিয়া। সঙ্গী পশ্চিমা অফিসার ও নৌসেনাদের অস্ত্রসমর্পণে বাধ্য করে এবং সেই ট্রাক নিয়ে, একাই ছুটে গেলেন অফিসার কমান্ডিং জানজুয়ার বাড়ি। তাকে গ্রেফতার করলেন। তারপর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের একত্র করে ডাক দিলেন তাদের প্রতি বিদ্রোহে অংশগ্রহণের জন্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করলেন। তারাও হাত তুলে, সমস্বরে সমর্থন জানালেন বিদ্রোহের প্রতি, সামরিক নেতৃত্বের প্রতি। তারা শপথ নিল, বাংলার স্বাধীনতা। কিন্তু এরই মধ্যে ঈস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের রিক্রুট সেন্টারে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় বাংলার বীর সন্তানকে হত্যাও করে ফেলল নরপিশাচের দল॥

... মুজিবের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটেছে সন্দেহ নেই; কিন্তু তার সাতই মার্চের ডাকে সশস্ত্র সংগ্রামের ছায়া থাকলেও কোনো পরিকল্পনার সংকেত ছিল না। এই ডাক আবেগপ্রসূত, কতকটা চরমপত্রের মতো। যে "যদি"র উপরে তা ভর করে ছিল, সেখানেই তার দূর্বলতা। এবং তার সঙ্গে জিয়ার "আমরা বিদ্রোহ করছি"-এর মৌলিক পার্থক্য রযেছে। এই দুই ঘোষণারই উৎস অবশ্য তাৎক্ষণিক বাস্তবতা - তবু প্রথমটার মধ্যে যেন সমঝোতার ক্ষীণ আশা বর্তমান আছে; কিন্তু দ্বিতীয়টির একমাত্র অর্থ আক্রমণের জবাবে আক্রমণ, হাতিয়ারের বদলে হাতিয়ার। প্রথমটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কৌশল, দ্বিতীয়টি সামরিক পদক্ষেপ॥" [ মে ১৬, ১৯৭১ ]

উৎস : আলাউদ্দিন আল আজাদ / ফেরারী ডায়েরী ॥ [ কাকলী প্রকাশনী - মার্চ, ১৯৭৭ । পৃ: ১২৩-১২৫ ]

১২. "... প্রেসিডেন্ট জিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৮০ সালের ১৭ই জুনের ব্যর্থ অভুত্থানের দায়ে অভিযুক্ত কাজী মুনীর ট্রাইব্যুনালে ১লা এপ্রিল বলেন : লে: ক: দিদারুল আলম তাকে বলেছেন যে, সেনাবাহিনীতে একটা কিছু করার জন্য জাসদ প্রস্তাব করেছিল। এবং জাসদের আবরণে সেনাবাহিনীতে একটি বিপ্লবী পরিষদ গঠন করার জন্যও কর্ণেল আলম তাকে বলেছিলেন। মুনীর তার সাক্ষ্যে আরও বলেন, তার সাথে আলোচনা করার সময়ে মেজর ডালিম দেশে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

সেই অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের মাঝামাঝি কোন এক রোববার সাম্যবাদী দলের নেতা খন্দকার আলী আব্বাস এবং দিলীপ বড়ুয়ার সঙ্গে মেজর ডালিমের বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। নির্ধারিত দিনে সকাল ৯টা হতে ১০টার মধ্যে মেজর ডালিম, পাশা এবং দিদারকে নিয়ে একটা টয়োটা কারযোগে আবুজর গিফারী কলেজের কর্ণার হতে সাম্যবাদী দলের নেতা খন্দকার আলী আব্বাস এবং দিলীপ বড়ুয়াকে তুলে নেন। মেজর ডালিম নিজেই ছিলেন চালক। মুনীর একটি মোটর সাইকেলে তাদের অনুসরণ করেছিলেন। তারা নির্মানাধীন নতুন বিমান বন্দরে পৌঁছে সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলাপ আলোচনা করেন।

আলোচনার সময় খন্দকার আলী আব্বাস জানান যে, সাম্যবাদী দল দু'ভাগে বিভক্ত এবং অধিকাংশ কর্মী মি: নগেন সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনি বলেন, তোয়াহা সাহেবের নেতৃত্বাধীন অংশ সরকারের সাথে আঁতাত করেছে। তারা বামপন্থী দলগুলোর ঐক্যের উপর গুরুত্বারোপ করেন। আলোচনার এক পর্যায়ে দিদার ছোট ছোট দলগুলোর আজে বাজে ভূমিকার কথা বলেন। দিদার বলেন যে, তবুও তিনি ঐ দলগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।

মুনীর সাক্ষ্যদানকালে জানান, আলোচনাকালে ডালিম আলী আব্বাস ও দিলীপ বড়ুয়াকে বলেন, আপনারা ছোট ছোট দলগুলো যদি পৃথক পৃথক অস্তিত্ব রক্ষা করে চলেন, তাহলে আপনারা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। ডালিম আরও বলেন, সমাজতন্ত্রের পূর্বশর্ত হলো দেশে জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। আলোচনাকালে পাশা বলেন, ছোট দলগুলো একত্রিত হলেই একটা কিছু করা হবে। বামপন্থী দলগুলো একত্রিত করার ডালিমের প্রস্তাব আলী আব্বাস পুরোপুরি সমর্থন করেননি। তবে তিনি বলেন একত্রিত করতে বেশ সময় লাগবে।

উত্তরে ডালিম বলেন, প্রথমে আপনারা নিজেদের মধ্যে একতাবদ্ধ হোন। তারপর আমরা সেনাবাহিনীতে একটা কিছু করতে যাবো। তিনি বলেন, 'রাজনৈতিক সমর্থন না থাকার কারণেই '৭৫ এর ১৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানের পর আমরা ক্ষমতা ধরে রাখতে পারিনি। ডালিম আরও বলেন, তারা এবার '৭৫ এর ভুলের পুনরাবৃত্তি করবেন না। মুনীর বলেন, তারা তখন সেখানে একটি জীপ দেখে সেখান হতে ডালিমের বাসায় চলে যান॥"

উৎস : অধ্যাপক কাজী নজরুল ইসলাম / মুজিব জিয়া বাংলাদেশ ॥ [ এশিয়া পাবলিকেশন্স - ডিসেম্বর, ১৯৯৪ । পৃ: ৫১-৫২ ]

১৩. "... মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহেবের ওপর আপনি যে শোক প্রস্তাব এনেছেন, তার প্রতি আমি আমার ব্যক্তিগত এবং দলের তরফ থেকে একাত্মতা ঘোষণা করছি। মরহুম জিয়াউর রহমানের মৃত্যু আকস্মিক এবং মর্মান্তিক। কিন্তু এই যে বর্তমান পরিস্থিতি, এটা বোধ হয় আমাদের কারও আশঙ্কার বাইরে ছিল না। গত কিছুদিন ধরেই দেশে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সে সম্পর্কে আমরা আশঙ্কা ব্যক্ত করেছি। এমনকি স্বয়ং রাষ্ট্রপতিও তার বক্তব্যে এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সম্পর্কে তার মতামত ব্যক্ত করেছিলেন। কেবল মতামতই তিনি ব্যক্ত করেননি, এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য কার্যক্রম গ্রহণের কথাও তিনি ঘোষণা করেছিলেন। যখন গোটা দেশ এবং জাতি, বিরোধী দল তাদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা অনুসারে এবং স্বয়ং রাষ্ট্রপতি তার চিন্তা অনুসারে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করার চিন্তা করেছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে এই ঘটনা ঘটে গেল।

সবশেষে আমি একটি কথা বলতে চাই, আমাদের দেশের এসব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন আমরা করতে পারিনি। আর করতে পারিনি বলে বারবার ষড়যন্ত্র ঘুরে-ফিরে আসছে। আজকেও বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানকে আমরা হারিয়েছি। দেশে গত কিছুদিনের ক্যু, কাউন্টার ক্যু—এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ দেশের মুক্তিযোদ্ধারা এবং এই মুক্তিযোদ্ধাদের ইলিমিনেট করার প্রসেস আমরা খুব গভীরভাবে লক্ষ করেছি।

আজকে আমরা জানতে চাই, এই ষড়যন্ত্র কোথায় কোন জায়গায় নিহিত রয়েছে, কোন সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত আজকে আমার দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিনষ্ট করার জন্য, মুক্তিযোদ্ধাদের ধ্বংস করার জন্য, মুক্তিযোদ্ধারা বীর উত্তম জিয়াউর এবং তার সাথী মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার জন্য কোন ষড়যন্ত্র এর মধ্যে কাজ করছে?

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয়। তাকে সেভাবেই আমি দেখেছি, তাকে সেভাবেই আমি সম্মান করেছি। তার সঙ্গে তার যে কীর্তি, সেই কীর্তি অমর এবং অক্ষুণ্ন থাকুক—এটা কামনা করি॥"

উৎস : বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আন্দোলন দলীয় সংসদ সদস্য এ এস এম রাশেদ খান মেনন (বাকেরগঞ্জ-৯) সংসদে আনীত শোক প্রস্তাবে তার দল ও নিজের পক্ষ থেকে / ৩ জুন, ১৯৮১।


১৪. "... ৩০ মে থেকে ৩রা জুন যে লাখ লাখ জনতা শুধু ঢাকা নগরীতেই নয়, গোটা বাংলাদেশে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেছে, তার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, আমাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি (জিয়াউর রহমান) বাংলাদেশের মানুষের কত কাছাকাছি এবং প্রাণপ্রিয় ছিলেন। এটা বলতে যদি কেউ কুণ্ঠাবোধ করেন, এটা তার মানসিক দৈন্য এবং তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাব বলে আমি মনে করি। এই যে লাখ লাখ জনতার স্রোত কেন এসেছিল, এই লাশটির পাশে, কেন এসেছিল জানাজায় ও গায়েবি জানাজায়? এসেছিল একটি মাত্র কারণে—সাবেক রাষ্ট্রপতির সততার প্রতি অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা জানাতে। ওই যে কোটি কোটি মানুষের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে আমরা যে গণতন্ত্রের কথা বলে এসেছিলাম এবং যে কথা বলে আমরা বিশ্ববিবেকের সমর্থন পেয়েছিলাম এবং তাকেই আমরা সংবিধানে গৃহীত করেছি।

যেখানে আমরা বলেছিলাম, মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা এবং সেই কথাই এই সংবিধানে আমরা রেখেছি। তারই সেই বক্তব্য—সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি মুক্তিযুদ্ধের যে প্রতিশ্রুতি ৩০ লাখ শহীদের রক্তে লেখা যে অঙ্গীকার—আজকে মরহুম জিয়াউর রহমান পালন করে যাননি যদি কেউ বলেন, তাহলে সত্যের অপলাপ হবে। আমি কীভাবে এ পার্লামেন্টে এলাম, কীভাবে আমি এখানে কথা বলছি? এটা সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং বাংলাদেশে সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এভাবে চলছে।  রাষ্ট্রপতিকে কখন হত্যা করা হলো? ১৯৮০-তে নয়, ১৯৮১ সালের মে মাসে যখন রাষ্ট্রপতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন, যখন রাষ্ট্রপতি দৃঢ় প্রত্যয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করলেন, যখন শোষণহীন সমাজব্যবস্থার কথা বলতে চাইলেন, দক্ষিণ এশিয়া, পৃথিবীর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে গেলেন, সিরিয়ায় গেলেন, যখন আর সেই মুহূর্তে তার ওপর আঘাত এলো।

সুতরাং আজকে নতুনভাবে আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে, এই আক্রমণ কিসের আক্রমণ। কারা এই আক্রমণ করেছে? তাদের উদ্দেশ্য কী? তাদের উদ্দেশ্য যাই হোক, দেশের কোনো মঙ্গল কামনা নয়, মানুষের মঙ্গল কামনা নয়, একটা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই এই হত্যা। হত্যা করা হয়েছিল একটা স্টাবলিশমেন্টকে নষ্ট করার জন্য, স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করার জন্য। স্থিতিশীলতা নষ্ট করে কারা লাভবান হয় — লাভবান হয় প্রতিক্রিয়াশীল চক্র, লাভবান হয় সাম্প্রদায়িক শক্তি, লাভবান হয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলার জনগণ, দুঃখী মানুষরা, দেশের আপামর জনগণ। যে গণতন্ত্রকে মূল্যায়নের জন্য মরুহম রাষ্ট্রপতির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, লাখ লাখ মানুষের আশা-ভরসা, তা আপনার (স্পিকারের) শোক প্রস্তাবে প্রতিফলিত হয়েছে॥"

উৎস : গণতন্ত্রী পার্টির সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (সিলেট-২) সংসদে আনীত শোক প্রস্তাবে তার দল ও নিজের পক্ষ থেকে / ৩ জুন ১৯৮১।

১৫. "... On an occasion at my residence, we had been discussing the liberation war that he fought. Discussions started round the very beginning; his decision to go to India. In Pakistan, army tradition required that on the day of the passing out parade, the cadet-officers to touch the Holy Koran and swear in the name of Allah and the Holy Book, to defend the unity and integrity of the country. This is an inviolable apotheosis of faith staying far above all mortal or mundane considerations. No matter what, immutability is the very core of such oath.

- "When you went to India to fight against Pakistan, did you recollect the oath you took on the day of your commission"?

- "Well, that was the country's call, and I had to respond. After all, it is the duty of every person to render service to the country's cause". Zia said zealously.

- "Does it by any chance mean that you placed the caused of the country over your faith, violating the Holy Koranic oath"? Gapingly, I ventured.

- "Well, had I not gone to India and instead remained with Pak army, I would have required to kill my fellow-Bengolees ! I myself could have died"? Zia said scuttingly.

- "Yes, but some people attributed you as a turn-coat, unfaithful to your religion. However, what prompted you to make the famous declaration of Independence through Chittagong radio? You were an army officer, it seems, you nourished a political overtone even in those disquiet days, and declared yourself as the Head of the Provisional Government, knowing Sheikh Mujib was in charge of the political situations". I said glumly.

- "Yes, but every human being is a political being. And, you know better than me as to what kind of people those Awamis were". Zia's lips moved with impregnable cool."

উৎস : Iqbal Ansari Khan / The Third Eye : Glimpses of the Politicos॥ [ UPL - September, 1991 । P. 189-190 ]


১৬. "... এবার স্বাধীনতা ঘোষণার কথায় আসি। আমি আগে উল্লেখ করেছি যে, ২৬ মার্চ দুপুরের দিকে ট্রানজিস্টারে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বক্তব্য শুনেছিলাম। জনাব মঈদুল ইসলাম, জেনারেল শফিউল্লাহ এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বেলাল মোহাম্মদের লেখা থেকে জানতে পারা যায় যে, ২৬ মার্চ দুপুরে বেতারের পাঁচ মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত অধিবেশনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা হয়েছিল। এই ঘোষণাটি নিয়ে মতবিরোধ চলছে।

বেলাল মোহাম্মদ সাহেবের মত অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরিত বক্তব্যটি শুরু হয় 'অদ্য রাত বারোটায় বর্বর পাকবাহিনী ঢাকার পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে অতর্কিত হামলা চালায়। লক্ষ লক্ষ বাঙালি শহীদ হয়েছে। যুদ্ধ চলছে। আমি এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি - জয়বাংলা।' উপরোক্ত ঘোষণায় 'অদ্য বারোটা' ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ ঘোষণাটি রাত বারোটার পরেই লেখা হয়েছিল। লক্ষ লক্ষ বাঙালি শহিদের কথা বলা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ শহিদের কথা তিনি পেলেন কোথায়? তার টেলিফোন তো বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। '৭১-এ ২৫-এর রাত নিয়ে অনেক লেখালাখি হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব নিজেই সকলকে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার জন্য তার বাসস্থান পরিত্যাগ করতে বলেন। মঈদুল ইসলাম সাহেবের ভাষায় 'চট্টগ্রাম বেতারে এসব ঘোষণার পেছনে না ছিল এ ধরণের রাজনৈতিক অনুমোদন, না ছিল কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি।

'৭১-এ এপ্রিলের শেষ দিকে তাজউদ্দিনের সঙ্গে আমি মেজর জলিলের নয় নম্বর সেক্টর পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। যাত্রী আমরা দুজনই ছিলাম। এই বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৫ খন্ডের কোন এক খন্ডে লেখা হয়েছে। তাজউদ্দিন সাহেব আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'আপনি একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর হয়ে কেমন করে কখন মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করলেন?' জবাবে আমি জিয়াউর রহমানের ঘোষণার কথা বলি। জিয়া কর্তৃক নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলে পরিচয় দেওয়ার কথা উল্লেখ করি। আমার জবাবে তিনি নিরুত্তর ছিলেন এবং অন্য প্রসঙ্গে চলে যান।

এপ্রিলের ১০ তারিখে তেলিয়াপাড়া চা বাগানে মেজর রফিকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। ২২/২৩ মার্চ থেকে তিনি যুদ্ধের জন্য যেসব উদ্যোগ ও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তার বর্ণনা শুনে আমি মুগ্ধ হই। জিয়াউর রহমানকে তিনি কিভাবে তার দলে টেনে আনেন তা বিস্তারিত ভাবে বলেছিলেন। এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, জিয়াউর রহমান বিদ্রোহীদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র অফিসার হওয়ার কারণে রফিক জিয়াকে বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দেবার প্রস্তাব দেন। তবে এই ঘোষণা কবে, কখন এবং কী ভাষায় দেওয়া হয়েছিল তা তিনি উল্লেখ করেন নি। এটি আমাদের আলোচনার বিষয়ও ছিল না। ভবিষ্যৎ সংগ্রামের কথাই আমরা আলোচনা করছিলাম।

২৭ মার্চ ১৯৭১-এর কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচার শুরু হওয়ার প্রারম্ভে বেতারের বেলাল মোহাম্মদ জিয়াউর রহমানকে কিছু বলবার জন্য অনুরোধ করেন এবং এটি লিখে ফেলতে বলেন। জিয়া প্রথমে লিখেছিলেন, 'I Major Zia-Ur-Rahaman do hereby declare Independence of Bangladesh...' এটি পরে পরিশোধন করা হয় এবং 'অন বিহ্যাফ অব শেখ মুজিব' লেখা হয়। আমি মনে করি ২৬ মার্চ দুপুর ১২টায় জিয়া নিজস্ব বক্তব্য রেখেছিলেন। এই ঘোষণা, তবে ভাষা নয়, দেওয়ার বন্দোবস্ত বোধহয় মেজর রফিক করে দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা জনাব হান্নান সাহেবের প্রচারিত বক্তব্য অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের কোনো ঘোষণা দেওযা হয়নি বলে আমি মনে করি।

'৭১-এর এপ্রিলের মাঝামাঝি কোনো একসময় আওয়ামী লীগের জনাব জহুর আহমদ ও আমি একই কামরায় কয়েক রাত কাটিয়েছিলাম। স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত প্রশ্ন করায় তিনি বলেছিলেন, 'আপনি যা শুনেছেন আমিও তাই শুনেছি।' এ নিয়ে আমরা আর ঘাঁটাঘাঁটি করিনি। কারণ ঘোষণা বিষয়টি তখন ছিল গৌণ এবং ভবিষ্যৎ সংগ্রামই ছিল মূখ্য। ধরা যাক জিয়াউর রহমানই ছিলেন স্বাধীনতার প্রথম ঘোষক। এতে কী আসে যায়? এই ঘোষণা কি আওয়ামী লীগ বা শেখ মুজিবুর রহমানকে খাটো করেছে? আদৌ না। জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনেই আমি ও আমার মতো হাজার হাজার সেনা, ইপিআর, পুলিশ, আনসার বাহিনীর সদস্য প্রেরণা পেয়েছিল। জিয়া ছিলেন ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার। তার প্রেসিডেন্ট পদের দাবি করা আমাদের মনে প্রভাব ফেলেনি। তবে তার স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ডাক আমাদের সকলকে অনুপ্রাণিত করেছিল॥"

উৎস : কর্নেল (অব:) কাজী-নুর-উজ্জামান / একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ : একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা ॥ [ অবসর প্রকাশনা সংস্থা - ফেব্রুয়ারী, ২০০৯ । পৃ: ১৩-১৫]
১৭. "... এখনো আমি এ কথা বিশ্বাস করি যে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর যাঁরা দেশ-শাসনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাদের ভেতর মরহুম জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যে সম্মান পেয়েছেন আজ তার থেকে তাঁরা বহু দূরে। ওই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কপালের রক্ত মুছে তিনি ছাত্রদের দিকে এগিয়ে গেছেন। এ সাহস সত্যিকার সৈনিকের॥"

উৎস : ড. নীলিমা ইব্রাহিম / বিন্দু-বিসর্গ ॥ [ ইতি খান - ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১ । পৃ: ২০৬ ]

১৮. "... উনিশশো পঁচাত্তর সালের ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সময় জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়। এরপর ৭ই নভেম্বর প্রধানত: কর্নেল তাহেরের উৎসাহে (নেতৃত্বেও কি?) সাধারণ সৈনিকরা বিদ্রোহ করে। জেনারেল জিয়ার বাস ভবনের ফটক ভেঙ্গে তারা তাকে নিয়ে যায় এবং ক্ষমতায় বসায়। এগারো বছর পরে ১৯৮৬ সালে এই কয়দিনের ঘটনাবলী সম্বন্ধে আমি বেগম খালেদা জিয়ার কাছে জানতে চাই। তিনি বলেন : দু' তারিখ রাতে আমরা বাইরে গিয়েছিলাম - ডিনার ছিলো একটা। রাত বারোটার দিকে ফিরে এসে আমরা শুয়ে পড়েছি। দুটার দিকে কলিং বেল বাজলো। তখন স্বাভাবিকভাবেই বাসায় কেউ ছিলো না। তো সে (জেনারেল জিয়া) নিজেই দরজা খুলতে গেলো। অনেকক্ষণ পরেও যখন সে ফিরলোনা তখন আমি দেখতে গেলাম। সামনের দরজায় গিয়ে বেশ কিছু লোকজন দেখলাম। আর্মি অফিসার আছে দু'চারজন , আরো লোকজন দেখলাম। দেখলাম আমার স্বামী তাদের সঙ্গে বাইরের বারান্দায় বসেই কথাবার্তা বলছেন। কি হচ্ছে ব্যাপারটা আমি তখনও বুঝে উঠতে পারলাম না। এ রকম ভাবে প্রায় সারা রাতই চলে গেলো। ভোরের দিকে, যখন আলো হোলো, তখন আমার স্বামী তাদেরকে নিয়ে ড্রইংরুমে এসে বসলেন। এর মধ্যে বেশ জানাজানি হযে গেছে ব্যাপারটা। কোয়ার্টার থেকে আমার অর্ডারলি, কাজের লোক - তারা উঠে এসেছে। আমার স্বামী খুব স্বাভাবিকভাবেই - যে রকম সে সব সময় করে, যতো কিছু ঘটে যাক সব সময়ই নর্ম্যালি ব্যবহার করে - সে রকম স্বাভাবিক ভাবেই বললেন - এদেরকে চা নাশতা দাও। ফ্রিজে যা কিছু ছিলো সেসব দিয়ে তাদেরকে খাওয়ানো হলো। সকাল হওয়ার পরই শুধু বুঝতে পারলাম যে ব্যাপারটা অন্য রকম।

সকাল হবার পরে দেখি আমার বাসার গেট বন্ধ। কেউ বাইরে যেতে পারছেনা, কেউ বাইরে যাচ্ছেনা। আমাদের পাশের বাসায় ছিলেন, এখন জেনারেল হয়েছেন - জেনারেল মঈন - তিনি এলেন, একটা আলাপ-সালাপ করলেন, তারপর বললেন, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাবেন না।

আমার বাসায় যারা ছিলো, দু'জন অফিসার বরাবরই ছিলো, তারা সকলেই আমাদের সঙ্গে নাশতা করলো। সারা দিনই দেখেছি যে ড্রইং রুমে বসে তারা আলাপ করছে, লোকজন আসছে, যাচ্ছে। খালেদ মোশাররফও এসেছিল। আমার স্বামীর সঙ্গে কি কি কথাবার্তা হয়েছে। তারা ও রুমেই আছে। আমার স্বামীও সেখানে বসা, বাইরে যাচ্ছেনা। বাড়ীর আশেপাশে এবং চারিদিকে সামরিক পাহারা, বাড়ীর ভেতরেও আছে। তিন-চারদিন এ রকমই চললো।

সাত তারিখে রাত্রিবেলা - রাত্রি প্রায় বারোটার সময় থেকে একটু একটু গোলাগুলীর শব্দ হচ্ছিলো। ব্যাপারটা যে কি বুঝতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ গোলাগুলী চলার পর আমরা শুনতে পারলাম যে কতগুলো শ্লোগান হচ্ছে - নারাযে তাকবীর আল্লাহু আকবর - এ রকম শ্লোগান হচ্ছে। আস্তে আস্তে সেটা বাড়তে লাগলো। এক পর্যায়ে দেখলাম যে সকলে এদিকে আসছে, আমাদের বাসার দিকে আসছে। আমার গেট বন্ধ ছিলো, সে গেটটা একদম ভেঙ্গে ফেলার মতো অবস্থা।

শেষ পর্যন্ত গেটটা ভেঙ্গেই ফেললো। আমাদের সামনের দরজা ভেঙ্গে সকলে হুড়মুড় করে বাসায় ঢুকে বললো, স্যার কোথায়? আমার স্বামী তখন বেরিয়ে এলেন, ওদের সঙ্গে কথা বললেন। তারপর তারা তাকে ঘাড়ে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেলো, তার নামে শ্লোগান দিচ্ছিলো তারা। আর নারায়ে তাকবীর্। তাকে তারা জোর করে, একদম যে রকম অবস্থায় ছিলেন সে রকম ভাবেই উঠিয়ে নিয়ে চলে গেলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় তোমরা তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছো? তারা বললো, আপনি কোন চিন্তা করবেন না, আমরা তাকে নিয়ে যাচ্ছি, তিনি ভালো থাকবেন। কতোক্ষণ পরে এসে তার ইউনিফর্ম নিয়ে গেলো তারা। তারা বললো যে আমার স্বামী আর্টিলারী রেজিমেন্টে আছেন। সারাদিন তিনি ওখানেই ছিলেন। মাঝে কতোক্ষণ পর পর লোকজন আসে, খবর দেয় তিনি ভালো আছেন। এ রকম ভাবেই চললো কয়েক দিন। এর মধ্যে সবাই আসে। তখন আমরা দেখেছি যে অবস্থাটা অত্যন্ত খারাপ ছিলো।

সত্যিকারের অফিসাররাও দেখেছি যে নানা রকম খারাপ অবস্থায় ছিলো - অনেক ঘটনা আছে - হয়তো পরবর্তীতে কখনো বলবো। তবে তখন সবাই আমার বাসায়। মনে করতো যে আমার বাসাটাই সবচাইতে নিরাপদ এবং যে পারতো সেই এসে এ বাসাটাতেই আশ্রয় নিতো। আমার বাসায় সেদিন অফিসাররা এবং জোয়ানরা এসে আশ্রয় নিয়েছে। যারা এসেছে তাদেরকে যতোটুকু আমরা পেরেছি সাহায্য-সহযোগীতা করেছি। এবং যারা সেদিন - প্রেসিডেন্ট জিয়াকে তিন তারিখ রাত থেকে যারা গার্ড দিয়ে রেখেছিলো, সে অফিসারগুলো, তারা খুব অসহায় বোধ করছিলো - তারা নিরাপদ ছিলোনা। সাধারণ সৈনিকরা তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছিলো। তারা খুব উত্তেজিত ছিলো। তাদেরকে খুঁজছিলো এজন্যে যে বিভিন্ন কারণে অফিসারদের উপর তাদের খুব রাগ ছিলো। তিন চারদিন এ রকম অবস্থা ছিলো। তারপর আস্তে আস্তে কিছুটা শান্ত হয়ে এলো। বলেন বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮৬ সালে॥"

উৎস : সিরাজুর রহমান / ইতিহাস কথা কয় ও নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ ॥ [ শিকড় - ফেব্রুয়ারী, ২০০২ । পৃ: ৯২-৯৪ ]

COMMENTS

BLOGGER
Name

আন্তর্জাতিক,2,ইতিহাস,4,ইসলাম ধর্ম,1,ইসলামের ইতিহাস,4,কোরআন ও বিজ্ঞান,2,নবী ও রাসুল,1,নাস্তিক্যবাদ,2,পাকিস্তান অধ্যায়,3,প্রতিবেশী ভূ-রাজনীতি,1,বাংলা সাহিত্য,1,বাংলাদেশ অধ্যায়,2,বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব,1,ভাষা আন্দোলন,6,ভাষা ও সংস্কৃতি,1,মতামত,3,মুক্তিযুদ্ধ,5,মুসলিম বিজ্ঞানী,1,মুসলিম শাসনকাল,5,রাজনীতি,9,রাজনীতিবিদ,8,রাষ্ট্র ও প্রসাশন,2,লেখক ও সাহিত্যিক,1,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,2,শিক্ষা ব্যবস্থা,4,সাম্প্রদায়িকতা,1,সাহাবীদের জীবনী,2,সাহিত্য ও সংস্কৃতি,3,
ltr
item
iTech: স্মৃতির আয়নায় জিয়াউর রহমান : দ্বীতিয় পর্ব
স্মৃতির আয়নায় জিয়াউর রহমান : দ্বীতিয় পর্ব
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। উই রিভোল্ট। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরিত বক্তব্য। ১৯৭১-এর কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষনা।
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgjS0bJHjpwtqsplAuyZJmfkQhk98ZMJfOxOuqrifVRWqjfZAyIX57ofsgCf7sSsO95FLx5yoIe4-Kz9hGm2LVzLDUPwrkWsRnPh1OEEP8dsQ5tUEUpy99JA-11lb2LDIAspfZOEsEEVtzN/s320/Ziaur+Rahman+Art.jpg
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgjS0bJHjpwtqsplAuyZJmfkQhk98ZMJfOxOuqrifVRWqjfZAyIX57ofsgCf7sSsO95FLx5yoIe4-Kz9hGm2LVzLDUPwrkWsRnPh1OEEP8dsQ5tUEUpy99JA-11lb2LDIAspfZOEsEEVtzN/s72-c/Ziaur+Rahman+Art.jpg
iTech
https://qtechmedia.blogspot.com/2017/04/blog-post_48.html
https://qtechmedia.blogspot.com/
https://qtechmedia.blogspot.com/
https://qtechmedia.blogspot.com/2017/04/blog-post_48.html
true
5233664077611017960
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy Table of Content