বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পর্যালোচনা। কওমী মাদ্রাসার সংকট। উপনিবেশের মোকাবেলায় দেওবন্দের সৃষ্টি। কামানের সম্মুক্ষে রেখে উলামা হত্যাযজ্ঞ। কওমী মাদ্রাসার সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থান, ঐতিহাসিক অবদান।
কওমী মাদ্রাসার ইতিহাস ও সংস্কার প্রসঙ্গ
[ আগের পর্বঃ বৃটিশ উপনিবেশ শাসনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ]
বর্তমানে বাংলাদেশে মোটামুটি পাঁচটি ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত; জেনারেল, আলীয়া, কারিগরি, ইংরেজি ও কওমী মাদ্রাসা (দেখুন চিত্রঃ ১)। পৃথিবীর আর কোন দেশে এরকম আছে কিনা আমার জানা নেই। এটা অদ্ভুত এবং একই ভাবে আশ্চার্য্যজনকও কেননা এত দিন ধরে চলছে এবং টিকে আছে। উপরন্ত, এক দেশে পাঁচটি শিক্ষা ধারা প্রচলিত থাকায় শিক্ষাই সমাজে বিভাজন তৈরির কারখানা হয়ে উঠেছে। তবে এই বিভাজনেরও রয়েছে করুণ ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক জরুরত। আগের পর্বে আমরা দেখেছি যে উপনিবেশ কালে ১৮৫৪ সালে Wood’s Despatch নামে একটি শিক্ষা কমিশন হয় বৃটিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে।এই শিক্ষা কমিশনের পরামর্শ অনুসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ কেন্দ্রিক মাদ্রাসা শিক্ষা থেকে দুনিয়াবি শিক্ষাকে পৃথক করা হয়। এই বিভাজন তৎকালীন মুসলিম সমাজ সহজে মেনে নেয়নি। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ মাদ্রাসাগুলো ‘মাকুলাত’ বা যুক্তি বিজ্ঞান (Rational Science) ছেড়ে দিয়ে ‘মানকুলাত’ বা ওহী সংশ্লিষ্ট জ্ঞান (revealed knowledge) এ সীমাবদ্ধ করে ফেলল নিজেদের।
![]() |
| চিত্রঃ বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার ধারা |
আলেম-ওলামা অবশ্য এর একটা ভিন্ন ব্যখ্যা দাঁড় করালেন। স্যাকুলার শিক্ষাকে (Rational Science) চিহ্নিত করলেন ‘দুনিয়াবী জ্ঞান’ হিসেবে যেটা ক্ষণস্থায়ী আর ধর্মীয় জ্ঞানকে নাম দিলেন দ্বীনী জ্ঞান, যা পরকালের জন্য চিরস্থায়ী। এভাবে করে দ্বীন এবং দুনিয়া আলাদা হয়ে গেল। তবে ওলামাদের কাছে বৃটিশের বিরুদ্ধে এটা এক ধরণের কালচারাল প্রতিরোধও ছিল বলে মনে করেন এখনকার কোন কোন স্কলার। For Ulama this was also a mode of resistance to colonialism: ‘The Din-Duniya separation should be construed as a form of cultural resistance, an effort to protect the “Inner World” from Western intrusion’ (Hassan, 2006: 61 cited in Ali Riaz, 2010).
উপনিবেশের মোকাবেলায় দেওবন্দের সৃষ্টি
![]() |
চিএঃ কামানের সম্মুক্ষে রেখে উলামা হত্যাযজ্ঞ |
এদিকে উত্তর ভারতের পরিস্থিতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসতে থাকে। নামকা ওয়াস্তে মুগল শাসক দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ সিংহাসনে। ১৮০৩ সালে ইংরেজরা দিল্লি দখলে নেয়। শাহ ওয়ালি উল্লাহ্র ছেলে শাহ আব্দুল আজিজ ফতওয়া দিলেন; ভারত হচ্ছে দারুল হারব (যুদ্ধ ক্ষেত্র) এবং ভারতকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করতে আহবান জানালেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে সৈয়দ আহমেদ শহীদ তাঁর দল ‘তরিকায়ে মোহাম্মদী’ নিয়ে নিস্ফল চেষ্টা করলেন এবং ১৮৩১ সালে বালাকোটে শহীদ হলেন। এই সময়ে উত্তর ভারতের মুসলমানদের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। সামাজিক, আর্থিক ও মানসিক সকল দিক দিয়েই আক্রমণ চলছে। খ্রিষ্টান মিশনারীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ১৮৫৭ সালে ঐতিহাসিক সিপাহী বিপ্লব সংগঠিত হয়। ১৭৫৭ সালের পর এটা ছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ। আলেম উলামা ছিলেন এই বিদ্রোহের অগ্রভাগে। ৩৪ জন শীর্ষ স্থানীয় আলেম ঐক্যবদ্ধভাবে জিহাদের ডাক দেন, বৃটিশের কবল থেকে ভারতের স্বাধীনতাই ছিল মূল লক্ষ্য। এইসব আলেমদের মধ্যে ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের দুই প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবি এবং রশিদ আহমেদ গাঙ্গোহি। সিপাহী বিপ্লবে বৃটিশের গনহত্যা ছিল খুবই করুণ। প্রায় ২ লক্ষ শহীদের মধ্যে আলেমের সংখ্যাই ছিল ৫১, ২০০ জন (Maulana Burhanuddin Qasmi, 2007)।
এটা এমন এক পরিস্থিতি যার সাথে তুলনা করা চলে হযরত আবু বকরের (রাঃ) সময়ে সংঘটিত ইয়ামামার যুদ্ধের সাথে।যেখানে ৭০ জন কুরআনের হাফেজ শহীদ হলে বাকী সাহাবাদের মাঝে কুরআন সংকল ও সংরক্ষণের জোর তাগিদ দেখা দেয়। ঠিক তেমনি বিপুল পরিমাণ আলেমের শহীদ হওয়ার ফলে দ্বীনের বেসিক বিষয়াদির হেফাজত করা অন্যতম ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরনের একটি রক্ষণশীল মানসিকতা থেকে, পশ্চিমা শিক্ষা ও কালচারের আগ্রাসন থেকে মুসলিমদেরকে বাঁচাতে কতিপয় আলেমের উদ্যেগে ১৮৬৬ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের পশ্চিমা সভ্যতার আগ্রাসান থেকে মুক্ত রাখা এবং ইসলামের হেফাজত করা। দেওবন্দ ছিল একটি প্রতিবাদ।
এটা এমন এক পরিস্থিতি যার সাথে তুলনা করা চলে হযরত আবু বকরের (রাঃ) সময়ে সংঘটিত ইয়ামামার যুদ্ধের সাথে।যেখানে ৭০ জন কুরআনের হাফেজ শহীদ হলে বাকী সাহাবাদের মাঝে কুরআন সংকল ও সংরক্ষণের জোর তাগিদ দেখা দেয়। ঠিক তেমনি বিপুল পরিমাণ আলেমের শহীদ হওয়ার ফলে দ্বীনের বেসিক বিষয়াদির হেফাজত করা অন্যতম ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরনের একটি রক্ষণশীল মানসিকতা থেকে, পশ্চিমা শিক্ষা ও কালচারের আগ্রাসন থেকে মুসলিমদেরকে বাঁচাতে কতিপয় আলেমের উদ্যেগে ১৮৬৬ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের পশ্চিমা সভ্যতার আগ্রাসান থেকে মুক্ত রাখা এবং ইসলামের হেফাজত করা। দেওবন্দ ছিল একটি প্রতিবাদ।
![]() |
| চিত্রঃ ১৭০০ সালে প্রস্তুত সমৃদ্ধশালী মূল দারস ই নিজামি কারিকুলাম এবং একই সময়ের শাহ ওয়ালি উল্লাহ্র মাদ্রাসা ই রহিমিয়ার কারিকুলামের তুলনা |
সকল ধরণের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে কেবলমাত্র মুসলমানদের ইমান-আকিদা-আমল সংরক্ষণের দিকে নজর দেয়া হয়। এই লক্ষ্যে তারা শাহ ওয়ালি উল্লাহর ‘মানকুলাত’ ট্রেডিশানকে গ্রহন করেন।প্রায় সকল প্রকার যুক্তি বিজ্ঞান (Rational Sciences) পাঠ্য থেকে বাদ দেয়া হয়। হাদীস ও ফিকাহর বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে পাঠ্যসুচী সাজানো হয়। এক্ষেত্রে বৃটিশ প্রফেসর ফান্সিস রবিনসনের পর্যবেক্ষণটি গুরুত্ত্বের দাবী রাখে, তিনি বলেন;
Overall their’s was a scriptural religion; knowledge of God’s word was crucial to knowing how to behave properly as a Muslim. At a time when they did not control the state, they must get knowledge for themselves and impose it upon themselves, the promptings of the individual human conscience being the main sanction. Appropriately this has come to be termed a ‘protestant’ form of Islam. And in its association, for instance, with literacy, the printing press and personal responsibility bears comparison with the emergence of Christian Protestantism in Europe (Francis Robinson, 2001).
এই দেওবন্দেরই শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে পরেছে দুনিয়ার আনাচে কানাচে। বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসা এই ট্রেডিশানকেই ধারণ করেছে। সকল প্রকার সরকারী অর্থ সহযোগিতা থেকে দূরে থাকায় কওমি মাদ্রাসা সংস্কারের কোন সরকারী উদ্যেগই কাজ করেনি।
কওমী মাদ্রাসার সংকট
আমার মত এই ‘কওমী মাদ্রাসা’ই একমাত্র ধারা যারা বৃটিশ উপনিবেশের কলুষতা থেকে মুক্ত থেকেছে। তারা ইতিহাসের একটা ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ভাষা আরবী, ফার্সি ও উর্দুকে এই বাংলাদেশে সংরক্ষণ করে চলেছে। এই ধারা ব্যাতীত বাকী প্রায় সবাই কম বেশী চিন্তা-চেতনায়-ভাষায়-সাহিত্যে কলনাইজড হয়েছে এবং উপনিবেশিক মানসিকতা ধারন করে চলেছে।
কিন্তু একথাও এখানে বলে নেয়া দরকার, যে কারিকুলাম বা যে পুস্তকাদি তারা বর্তমানে অধ্যয়ন করেন সেটা যুগের চাহিদায় মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পরেছে কিনা সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা জরুরী হয়ে পরেছে। প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এই ধারায় শিক্ষিতদের পড়া শেষে কর্মজীবনে করণীয় এবং সামগ্রিকভাবে আর্থ-সামাজিক অবস্থা নিয়েও। একই সাথে মুঘল আমলে দারস ই নিজামি সিলেবাসে পড়ুয়ারা যেখানে মুঘল প্রশাসন চালাতে সক্ষম ছিল সেখানে বর্তমানে কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসে পড়ুয়ারা বর্তমান বাংলাদেশের প্রশাসনা চালাতে কতটা যোগ্যতা অর্জন করছে সেটাও মৌলিক একটি চিন্তা হতে পারে। তবে কুরআন-হাদীস যেহেতু মেয়াদোত্তীর্ণ হবার সুযোগ নেই, সেহেতু শুধুমাত্র ধর্মতত্ত্বের জায়গা থেকে কওমী মাদ্রাসাকে দেখা যেতে পারে।
আর্থ-সামাজিক অবস্থা চিন্তা করে কওমী পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী আলীয়া মাদ্রাসার মাধ্যমে মূলধারায় আসার একটা সুযোগ গ্রহণ করত।সে লক্ষ্যে কওমী মাদ্রাসাগুলোতে সরকারী পাঠ্যপুস্তকের বাংলা, অংক ও ইংরেজি পড়ানো হয় অন্যান্য বিষয়ের সাথে। ফলে, কওমী মাদ্রাসার বড় একটা অংশ দাখিল পরীক্ষার আগে রেজিষ্ট্রেশন করে তাঁদের নিয়মিত পড়াশুনার ফাঁকে পরীক্ষা দিয়ে সার্টিফিকেট পেয়ে যেত। এতে করে তাঁদের ক্লাসিকাল ধর্মতত্ত্বের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থাকত।
কিন্তু ২০১০ সাল থেকে আলীয়া মাদ্রাসায় ইবতেদায়ী পরীক্ষা (৫ম শ্রেণী) চালুর পরে কওমী শিক্ষার্থীদের আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তির সুযোগ অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এ কে এম ছায়েফ উল্যা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর কে জানান, শুধুমাত্র ইবতেদায়ী পরীক্ষা দিতে অল্প কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী এখনো আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। “ইবতেদায়ী পরীক্ষা চালুর আগে অনেক কওমী শিক্ষার্থী আলিয়া মাদ্রাসার বিভিন্ন শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে (মাধ্যমিক পর্যন্ত) পরীক্ষা দিত। কিন্তু এখন ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ভর্তি হতে সনদ প্রয়োজন” (শহীদুল ইসলাম, ২০১৫)। এতে তাঁদের উচ্চ শিক্ষার পথ অনেকটা সংকুচিত হয়ে পরে।
সম্প্রতি কওমী মাদ্রাসার দাওরা হাদীস বিভাগের একজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে কিছু বিষয় জানা গেছে। তাঁর মতে, কওমী মাদ্রাসায় পড়ানো বিষয়াদি এখনো আন্তর্জাতিক মানের।
কিন্তু একথাও এখানে বলে নেয়া দরকার, যে কারিকুলাম বা যে পুস্তকাদি তারা বর্তমানে অধ্যয়ন করেন সেটা যুগের চাহিদায় মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পরেছে কিনা সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা জরুরী হয়ে পরেছে। প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এই ধারায় শিক্ষিতদের পড়া শেষে কর্মজীবনে করণীয় এবং সামগ্রিকভাবে আর্থ-সামাজিক অবস্থা নিয়েও। একই সাথে মুঘল আমলে দারস ই নিজামি সিলেবাসে পড়ুয়ারা যেখানে মুঘল প্রশাসন চালাতে সক্ষম ছিল সেখানে বর্তমানে কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসে পড়ুয়ারা বর্তমান বাংলাদেশের প্রশাসনা চালাতে কতটা যোগ্যতা অর্জন করছে সেটাও মৌলিক একটি চিন্তা হতে পারে। তবে কুরআন-হাদীস যেহেতু মেয়াদোত্তীর্ণ হবার সুযোগ নেই, সেহেতু শুধুমাত্র ধর্মতত্ত্বের জায়গা থেকে কওমী মাদ্রাসাকে দেখা যেতে পারে।
আর্থ-সামাজিক অবস্থা চিন্তা করে কওমী পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী আলীয়া মাদ্রাসার মাধ্যমে মূলধারায় আসার একটা সুযোগ গ্রহণ করত।সে লক্ষ্যে কওমী মাদ্রাসাগুলোতে সরকারী পাঠ্যপুস্তকের বাংলা, অংক ও ইংরেজি পড়ানো হয় অন্যান্য বিষয়ের সাথে। ফলে, কওমী মাদ্রাসার বড় একটা অংশ দাখিল পরীক্ষার আগে রেজিষ্ট্রেশন করে তাঁদের নিয়মিত পড়াশুনার ফাঁকে পরীক্ষা দিয়ে সার্টিফিকেট পেয়ে যেত। এতে করে তাঁদের ক্লাসিকাল ধর্মতত্ত্বের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থাকত।
কিন্তু ২০১০ সাল থেকে আলীয়া মাদ্রাসায় ইবতেদায়ী পরীক্ষা (৫ম শ্রেণী) চালুর পরে কওমী শিক্ষার্থীদের আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তির সুযোগ অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এ কে এম ছায়েফ উল্যা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর কে জানান, শুধুমাত্র ইবতেদায়ী পরীক্ষা দিতে অল্প কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী এখনো আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। “ইবতেদায়ী পরীক্ষা চালুর আগে অনেক কওমী শিক্ষার্থী আলিয়া মাদ্রাসার বিভিন্ন শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে (মাধ্যমিক পর্যন্ত) পরীক্ষা দিত। কিন্তু এখন ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ভর্তি হতে সনদ প্রয়োজন” (শহীদুল ইসলাম, ২০১৫)। এতে তাঁদের উচ্চ শিক্ষার পথ অনেকটা সংকুচিত হয়ে পরে।
সম্প্রতি কওমী মাদ্রাসার দাওরা হাদীস বিভাগের একজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে কিছু বিষয় জানা গেছে। তাঁর মতে, কওমী মাদ্রাসায় পড়ানো বিষয়াদি এখনো আন্তর্জাতিক মানের।
পুরো, কওমী মাদ্রাসার শিক্ষাকে একটি ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাথে তুলনা করা চলে। ইসলামিক দৃষ্টিকোন থেকেও তাঁদের পাঠ্যসুচী আলীয়া থেকে অনেক ভাল এবং আন্তর্জাতিক মানের। তবে স্বীকৃতির অভাবের কারণে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীগন তাঁদের এই সার্টিফিকেটকে কাজে লাগাতে পারছেনা দেশে বিদেশে।
কওমী মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দিক থেকেও রয়েছে যথাযথ উদ্যেগের অভাব। তাঁর মতে, খুব সহজেই কওমী মাদ্রাসার ডিগ্রিকে সৌদি ও মিশর সহ অন্যান্য মুসলিম দেশের মাদ্রাসা, ইউনিভার্সিটিগুলোর সাথে লিয়াজো করে সম-মান অর্জন করা সম্ভব। কওমী মাদ্রাসায় মৌলিক পরিবর্তনের কষ্টসাধ্য প্রচেষ্টার চেয়ে এই সম-মান অর্জন করা অনেক সহজ হবে মনে হয়।
তবে, যুগের চাহিদা, সামাজিক চাপ ও সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলে কওমী মাদ্রাসায় মৌলিক কিছু পরিবর্তন ভবিষ্যতে আসতেও পারে। তবে সরকার বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা, এনজিও ও মিডিয়ার চাপে যদি কওমী মাদ্রাসায় কিছু পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে তাহলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। সব পরিবর্তনই ভাল এমন নয়, কিন্তু এই বিষয়ে দরকার যথাযথ পরিকল্পনা।
বাংলাদেশে পাবলিক ইউনিভার্সিটির পদার্থ, রসায়ন বা জীববিজ্ঞানে অনার্স মাষ্টার্স করে অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে ব্যাংক, বিসিএস দিয়ে সরকারী চাকুরীতে কাজ করেন। অধিকাংশ স্যাকুলার সংস্কারবাদী ও সমালোচক কওমি মাদ্রাসা ও তার কারিকুলাম সম্পর্কে ন্যুনতম ধারণা না নিয়েই সংস্কারের আওয়াজ তুলেন, ক্যাম্পেইন করে চলেছেন। তাঁদের দাবী অনেকটা গরু দিয়ে ঘোড়ার কাজ করানোর প্রস্তাবনার মত। অথচ তাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয় ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিস থেকে অনার্স করা একজন শিক্ষার্থী যদি ব্যাংকে চাকুরী করতে পারে তাহলে কওমি মাদ্রাসায় সমমানের দাওরা হাদীস পড়ুয়া শিক্ষার্থী কেন পারবেনা? উত্তর পাওয়া দুষ্কর।
কওমী মাদ্রাসার সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থান, ঐতিহাসিক অবদান ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান রেখেই তাঁদেরকে কিভাবে দেশের মূলধারায় অংশগ্রহন করানো যায় সেই পরিকল্পনা হওয়া দরকার। পুরো কওমি মাদ্রাসাকে বিবেচনা করতে হবে একটি ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিস ডিপার্টমেন্ট। সেখানে ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর প্রস্তাবনা করলে চলবেনা। আমাদের ডাক্তার, ইংঞ্জিনিয়ার যেমন দরকার, দরকার জাতিকে ধর্মীয় ইস্যুতে দিক নির্দেশনা দিতে পারে এমন আলেমও। সেসব আলেম কোন ইউনিভার্সিটি থেকে তৈরি হচ্ছেনা। কওমি মাদ্রাসাকে জঙ্গিবাদের সাথে জড়িয়ে যে অন্যায় অপপ্রচার গত ১ যুগ যাবত হয়েছে সেটা আশাকরি সাম্প্রতিক গুলশান ট্রাজেডি’র পর আর নতুন করে আলোচনার দরকার হবেনা॥ [ পরের পর্বঃ বৃটিশ উপনিবেশ শাসনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ]
রেফারেন্সঃ
১. Ali Riaz, Madrassah Education in Pre-colonial and Colonial South Asia, Journal of Asian and African Studies 46(1) 69–86, 2010.
২. Francis Robinson, The ‘Ulama of Farangi Mahall and Islamic Culture in South Asia, Hurst and Company, UK, 2001.
৩. Maulana Burhanuddin Qasmi (2007), 150 Years on: The first War of India’s Independence; Recounting untold Story, Available Here.
৪. শহীদুল ইসলাম (২০১৫), উচ্চ শিক্ষার পথ হারাচ্ছে কওমীর শিক্ষার্থীরা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৮ জুলাই ২০১৫। [ উৎসঃ আনোয়ার মোহাম্মদ / মুলধারা বাংলাদেশ। ]
তবে, যুগের চাহিদা, সামাজিক চাপ ও সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলে কওমী মাদ্রাসায় মৌলিক কিছু পরিবর্তন ভবিষ্যতে আসতেও পারে। তবে সরকার বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা, এনজিও ও মিডিয়ার চাপে যদি কওমী মাদ্রাসায় কিছু পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে তাহলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। সব পরিবর্তনই ভাল এমন নয়, কিন্তু এই বিষয়ে দরকার যথাযথ পরিকল্পনা।
বাংলাদেশে পাবলিক ইউনিভার্সিটির পদার্থ, রসায়ন বা জীববিজ্ঞানে অনার্স মাষ্টার্স করে অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে ব্যাংক, বিসিএস দিয়ে সরকারী চাকুরীতে কাজ করেন। অধিকাংশ স্যাকুলার সংস্কারবাদী ও সমালোচক কওমি মাদ্রাসা ও তার কারিকুলাম সম্পর্কে ন্যুনতম ধারণা না নিয়েই সংস্কারের আওয়াজ তুলেন, ক্যাম্পেইন করে চলেছেন। তাঁদের দাবী অনেকটা গরু দিয়ে ঘোড়ার কাজ করানোর প্রস্তাবনার মত। অথচ তাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয় ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিস থেকে অনার্স করা একজন শিক্ষার্থী যদি ব্যাংকে চাকুরী করতে পারে তাহলে কওমি মাদ্রাসায় সমমানের দাওরা হাদীস পড়ুয়া শিক্ষার্থী কেন পারবেনা? উত্তর পাওয়া দুষ্কর।
কওমী মাদ্রাসার সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থান, ঐতিহাসিক অবদান ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান রেখেই তাঁদেরকে কিভাবে দেশের মূলধারায় অংশগ্রহন করানো যায় সেই পরিকল্পনা হওয়া দরকার। পুরো কওমি মাদ্রাসাকে বিবেচনা করতে হবে একটি ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিস ডিপার্টমেন্ট। সেখানে ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর প্রস্তাবনা করলে চলবেনা। আমাদের ডাক্তার, ইংঞ্জিনিয়ার যেমন দরকার, দরকার জাতিকে ধর্মীয় ইস্যুতে দিক নির্দেশনা দিতে পারে এমন আলেমও। সেসব আলেম কোন ইউনিভার্সিটি থেকে তৈরি হচ্ছেনা। কওমি মাদ্রাসাকে জঙ্গিবাদের সাথে জড়িয়ে যে অন্যায় অপপ্রচার গত ১ যুগ যাবত হয়েছে সেটা আশাকরি সাম্প্রতিক গুলশান ট্রাজেডি’র পর আর নতুন করে আলোচনার দরকার হবেনা॥ [ পরের পর্বঃ বৃটিশ উপনিবেশ শাসনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ]
রেফারেন্সঃ
১. Ali Riaz, Madrassah Education in Pre-colonial and Colonial South Asia, Journal of Asian and African Studies 46(1) 69–86, 2010.
২. Francis Robinson, The ‘Ulama of Farangi Mahall and Islamic Culture in South Asia, Hurst and Company, UK, 2001.
৩. Maulana Burhanuddin Qasmi (2007), 150 Years on: The first War of India’s Independence; Recounting untold Story, Available Here.
৪. শহীদুল ইসলাম (২০১৫), উচ্চ শিক্ষার পথ হারাচ্ছে কওমীর শিক্ষার্থীরা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৮ জুলাই ২০১৫। [ উৎসঃ আনোয়ার মোহাম্মদ / মুলধারা বাংলাদেশ। ]



COMMENTS