৬ দফা আন্দোলন "Six Points"। ছয় দফার প্রণেতা কে? ছয় দফার জন্মবৃত্তান্ত। ৬ দফা আন্দোলনের ইতিহাস। ৬-দফার উৎস সংক্রান্ত এ রহস্য। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ। আওয়ামী লীগ প্রধান মওলানা ভাসানী।
১. While the "Six Points" gave rise to a lot of controversy, unfortunately no one thought it fit to find out who could be the author of such an outlandish scheme calculated to bring about radical change in the structure of the government of the country. Apart from the question of merit, a lot of thought and political acumen must have been devoted in the preparation of such a scheme which, prima facie, not only looked simple, but was calculated to provide answers to many of the political and economic problems besetting the province.
A note-worthy aspect of the scheme was that it did not ask the central government to do more for the province; on the contrary, it contemplated a change in the constitution to enable the province to do more for itself, and relieve the centre of such functions which it was not in a position to perform to the satisfaction of the province. Although the demand for autonomy was not anything new in the political firmament of the country, there was no indication that the Awami League or any other party ever devoted itself to working out a feasible scheme of a new set-up as an alternative, in keeping with their ideas.
The exercise itself would have generated a lot of discussion and attracted attention of the intelligentsia before the scheme could be finalized. No one could imagine that such a scheme could be the brainchild of Sheikh Mujibur Rahman; it could be an exercise from which others had to be excluded until it emerged in the form of the Six points. None came forward to claim its authorship. The scheme was designed to meet the requirements at a psychological moment, when the people were thrown into a state of perplexity regarding the future of their province and were in search of a panacea for their emancipation."
উৎসঃ Kazi Anwarul Huque / In Quest of Freedom ॥ [ UPL - April, 1991 । P. 168-169 ]
২. ছয় দফার প্রণেতা কে, এই নিয়ে অনেক জল্পনা হয়েছিল। কেউ কেউ বলেছিলেন সিভিল সার্ভিসের কয়েকজন সদস্য এটা তৈরি করে শেখ মুজিবকে দিয়েছিলেন, কেউ কেউ সে কৃতিত্ব কিংবা দোষ দিয়েছিলেন কয়েকজন সাংবাদিককে। তাদের পেছনে কোন শক্তি কাজ করছিল, সে বিচারও হয়েছিল। প্রথমে উঠেছিল ভারতের নাম। কিন্তু পাকিস্তান হওয়া অবধি তো দেশের বহু গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল ভারতের প্ররোচনা বলে। পরে বড়ো করে যে নাম উঠলো, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের বন্ধুত্ব এবং ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্টের বন্ধুত্বের কারণে পাকিস্তান ভাঙার উদযোগ নিচ্ছে মার্কিনরা, এমন একটা ধারণা খুব প্রচলিত হয়েছিল। আমরা যারা একটু বামঘেঁষা ছিলাম, তারা এই ব্যাখ্যা মেনে নিয়েছিলাম। ফলে, ফেডারেল পদ্ধতি ও স্বায়ত্ত্বশাসনের পক্ষপাতী হলেও ছয় দফাকে আমরা তখন গ্রহণ করিনি। আমরা আরো শুনেছিলাম যে, পাকিস্তান ভাঙতে পারলে পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি করতে দেওয়া হবে; সুতরাং এ কাজে মার্কিনদের উৎসাহ তো থাকবেই। যদি প্রশ্ন উঠতো যে, পাকিস্তান তো সেনটো-সিয়াটোর সদস্য, তাহলে জবাব পাওয়া যেতো যে, পাক-ভারত যুদ্ধের পরপ্রেক্ষিতে ওসব জোটের অসারতা প্রমাণ হয়ে গেছে এবং পাকিস্তান যে কোন সময় তার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। পাকিস্তান কখনোই এসব সামরিক জোট ছাড়েনি, তবে আইয়ুব খানের 'ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্সে'র প্রচারিত নীতি কিছুটা এ ধারণাকে পুষ্ট করেছিল॥"
উৎসঃ ড: আনিসুজ্জামান / কাল নিরবধি ॥ [ সাহিত্য প্রকাশ - ফেব্রুয়ারী, ২০০৩ । পৃ: ৪২৮ ]
৩. (তাসখন্দে) কয়দিন আলোচনার পর প্রেসিডেন্ট আয়ুব ও লালবাহাদুর শাস্ত্রী একটি যুক্ত ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করলেন। সিদ্বান্ত হল, শান্তিপূর্ণ ভাবে উভয় পক্ষ নিজেদের ছোট বড় সমস্যার সমাধান করবে। আশ্চর্যের কথা, যা' নিয়ে যুদ্ধ, অর্থাৎ কাশ্মীর, তার নামগন্ধও এই ঘোষণাপত্রে উল্লেখ রইল না। এত কান্ড করে, এত ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে, সারা পাকিস্তানকে প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি ঠেলে দেওয়ার পর সিদ্ধান্ত হল, ওম্ শান্তি। পশ্চিম পাকিস্তানে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অসংখ্য শহর বাজার গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেরা সৈনিক নিহত হয়েছেন। পৃথিবীর কোন যুদ্ধে নাকি এত অল্প সময়ে এত অফিসার নিহত হয় নাই। তাদের স্থান পূরণ সম্ভব হবে না। তাই, পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত বিরুপ ছিল। এত ক্ষয়ক্ষতির পর আয়ুব খাঁ সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে অপমান-জনক একটি ঘোষণায় স্বাক্ষর করলেন। দেশবাসীর আশা-আকাঙ্খার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। এই চুক্তি অপরাধ স্বীকৃতির শামিল বলে তারা মনে করে।
যে সব সৈনিক কর্মচারী শহীদ হয়েছেন তাদের বিধবা স্ত্রী ও পরিবারবর্গ এক মিছিল বার করল লাহোর শহরে। ধ্বনি তুলল, আমাদের স্বামী পুত্র ফেরত দাও। তারা শাহাদাত বরণ করার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেন নাই। অনর্থক আপনি তাদের মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছেন। অকারণে তাদের অমূল্য জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। যদি দেশের স্বার্থরক্ষার জন্য হতো, তা হলে আপনি এমন চুক্তি কেন স্বাক্ষর করলেন? ইত্যাদি –পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ পরিস্থিতি আলোচনা করার জন্য ফেব্রুয়ারী মাসের পাঁচ-ছয় তারিখে নিখিল পাকিস্তান জাতীয় কনফারেন্স আহ্বান করলেন। এই উপলক্ষে চৌধুরী মহম্মদ আলি ও নবাবজাদা নসরুল্লাহ খাঁ ঢাকা এসে সব দলের সাথে আলাপ আলোচনা করে কনফারেন্সে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ করলেন। বললেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত সঙ্কটজনক এই মূহুর্তে আমাদের কর্তব্য নির্ধারণ করা উচিত।
জামাত, নিজাম ও কাউন্সিল লীগ যোগদানে সম্মতি দিল। আওয়ামী লীগেরও দোমনাভাব। শেখ মুজিবের মতামতই দলের মত। প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন অভিমত নাই। শেখ মুজিব কনফারেন্সে যোগদানে অসম্মতি জ্ঞাপন করলেন। এন-ডি-এফ সভা করে মত প্রকাশ করল যে, কনফারেন্সের পক্ষে আমাদের নৈতিক সমর্থন রয়েছে, তবে বর্তমান অবস্থায় কোন সদস্য এতে যোগদান করতে পারছেনা। শেখ মুজিব আমাকে টেলিফোনে বললেন, আপনারা ঠিকই করেছেন। আমরাও যাবনা।
পরদিন সংবাদপত্রে দেখি, শেখ মুজিব সদলবলে লাহোর যাচ্ছেন। প্রায় চৌদ্দ পনেরো জন এক দলে। ব্যাপার কি? হঠাৎ মত পরিবর্তন। মতলবটা কি? লাহোর কনফারেন্স শুরু হল গভীর উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে। অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ একটি বোমা নিক্ষেপ করলেন - 'ছয় দফা'। প্রস্তাব বা দাবীর আকারে একটা রচনা নকল করে সদস্যদের মধ্যে বিলি করা হল। কোন বক্তৃতা বা প্রস্তাব নাই, কোন উপলক্ষ নাই, শুধু কাগজ বিতরণ। পড়ে সকলেই স্তম্ভিত হয়ে গেল। জাতীয় কনফারেন্সে এই দাবী নিক্ষেপ করার কি অর্থ হতে পারে? কনফারেন্স ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে সম্মিলিত হয়েছে। এই দাবী যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, এই সম্মেলন ও এই সময় তার উপযোগী নয় - সম্পূর্ণ অবান্তর। তারপর দলবলসহ শেখ মুজিব ঢাকা ফিরে এসে মহাসমারোহে 'ছয় দফা' প্রচার করলেন সংবাদপত্রে। শেখ মুজিবের দাবী ও নিজস্ব প্রণীত বলে ছয়-দফার অভিযান শুরু হয়ে গেল।
ছয় দফার জন্মবৃত্তান্ত নিম্নরুপ : কিছুসংখ্যক চিন্তাশীল লোক দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দূরাবস্থার কথা আলাপ আলোচনা করেন। আমাদের ইঙ্গিত ও ইশারা পেয়ে তারা একটা খসড়া দাবী প্রস্তুত করলেন। তারা রাজনীতিক নয় এবং কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্টও নয়। তারা 'সাতদফার' একটা খসড়া আমাদের দিলেন। উদ্দেশ্য, এটা স্মারকলিপি হিসাবে আয়ুব খাঁর হাতে দেওয়া, কিংবা জাতীয় পরিষদে প্রস্তাবাকারে পেশ করার ব্যবস্থা করা। এই খসড়ার নকল বিরোধীদলীয় প্রত্যেক নেতাকেই দেওয়া হয়। শেখ মুজিবকেও দেয়া হয়। খসড়া রচনার শেষ বা সপ্তম দফা আমরাও সমর্থন করি নাই। শেখ মুজিব সেই দফা কেটে দিয়ে ছয়দফা তারই প্রণীত বলে চালায়ে দিল। তারপর বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির দ্বারা ছয় দফার দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক মর্ম ও তাৎপর্য লেখায়ে প্রকাশ করা হয়। ইংরেজী ও বাংলায় মুদ্রিত হয়ে পুস্ত্কাকারে প্রচারিত হয় সারা দেশব্যাপী।
লাহোর কনফারেন্স বানচাল হয়ে গেল। নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবকেই এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী করেন। তারা অভিযোগ করেন, শেখ মুজিব সরকার পক্ষ থেকে প্ররোচিত হয়ে এই কর্ম করেছেন। লাহোরে পৌঁছার সাথে সাথে আয়ুব খাঁর একান্ত বশংবদ এক কর্মচারী শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করে কি মন্ত্র তার কানে ঢেলে দেয় যার ফলেই শেখ মুজিব সব উলটপালট করে দেয়। তারা এও বলে যে আওয়ামী লীগের বিরাট বাহিনীর লাহোর যাতায়াতের ব্যয় সরকারের নির্দেশে কোন একটি সংশ্লিষ্ট সংস্থা বহন করে। আল্লাহ আলীমূল গায়েব।"
- আতাউর রহমান খান (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী) / স্বৈরাচারের দশ বছর॥ [নওরোজ কিতাবিস্তান - ১৯৭০। পৃ: ৩৫৪-৩৫৫]
৪. রহস্যের উন্মোচন করতে গেলে প্রথমেই প্রশ্ন জাগে - শেখ মুজিব ৬-দফা কোথায় পেলেন? কে তার পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ৬-দফা? একথা ঐতিহাসিক সত্য এবং আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব কর্তৃক স্বীকৃত যে, আওয়ামী লীগের কোন পর্যায়ের কোন সভায় বা বৈঠকে ৬-দফা কর্মসূচী আলোচিত বা গৃহীত হয়নি - পাকিস্তান আওয়ামী লীগে তো নয়ই, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কোনো ফোরামেও নয়। শেখ মুজিব গেলেন করাচী হয়ে লাহোরে। লাহোরে তিনি পকেট থেকে বের করলেন ৬-দফা। ঢাকা-করাচী-লাহোরের পথে অপরাপর যে সমস্ত আওয়ামী লীগ নেতা তার সহযাত্রী ছিলেন তারা পর্যন্ত কিছু জানতে পারেননি এক মূহূর্ত আগেও। অত:পর লাহোর থেকে ঢাকা এয়ারপোর্টে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করলেন। পরবর্তী পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ শেখ মুজিব ঘোষিত ৬-দফা অনুমোদন করে। এজন্য শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে একখানা পুস্তিকাও প্রকাশ করেছিলেন।
৬-দফার উৎস সংক্রান্ত এ রহস্যময়তা প্রসঙ্গে ৩টি তত্ত্ব প্রচলিত আছে।প্রথম তত্ত্বটা হল : ৬-দফা একান্তভাবেই বাংলাদেশের কয়েকজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা যেমন - রুহুল কুদ্দুস, শামসুর রহমান খান ও আহমদ ফজলুর রহমান এবং বাংলাদেশের কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকের তৈরী। অথবা অধ্যাপক ও আমলাদের দ্বারা যৌথভাবে তৈরী।
দ্বিতীয় তত্ত্বটি হলো : ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর আইয়ুব খান যে তাসখন্দ চুক্তি স্বাক্ষর করেন সেই চুক্তি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর অন্যান্য জেনারেল এবং সাধারণ মানুষ মেনে নেয়নি। সারা পাকিস্তানে এর প্রতিবাদ হয়। ভুট্টো পদত্যাগ করেন। এই সব কারণে আইয়ুব খান ঘাবড়ে গিয়ে তার মূল সমর্থক পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং কিছু রাজনীতিবিদকে আবার ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে চান। এই উদ্দেশ্যে আইয়ুব খান তখনকার পাকিস্তানের বিশেষ পরিচিত সিভিল সার্ভেন্ট আলতাফ গওহরের মাধ্যমে ৬-দফা পরিকল্পনা প্রনয়ণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল এই ধরণের কর্মসূচীর ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে উঠলে তৎকালীন পাকিস্তানের মিলিটারী ব্যুরোক্রেসী ও রাজনীতিকরা আবার তার হাত শক্ত করতে আসবেন। জনাব আলতাফ গওহরই নাকি এই কর্মসূচীটি জনাব রুহুল কুদ্দুসের কাছে দেন। রুহুল কুদ্দুস দেন খায়রুল কবীরের (প্রাক্তন ম্যানেজিং ডিরেক্টর, কৃষি ব্যাংক) কাছে। জনাব খায়রুল কবীর দেন এই ড্রাফট শেখ মুজিবের কাছে।
তৃতীয় তত্ত্ব হল : এই ৬-দফা কর্মসূচী ভারতের কাছ থেকে আসে কমিউনিস্ট পার্টির খোকা রায়ের কাছে। খোকা রায় দেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও পীর হাবিবুর রহমানের কাছে। তারা দেন খায়রুল কবীরের কাছে। খায়রুল কবীর দেন শেখ মুজিবের কাছে।
এই তিনটি তত্ত্বের কোনটি সঠিক? তবে মনোরঞ্জন ধরও দাবি করেছেন - এই ৬-দফা কর্মসূচী বস্তুত: তাদেরই তৈরী। ১৯৫০ সালে তারা পাকিস্তানের সংবিধানের 'মৌলিক নীতিমালা কমিটি'র সদস্য হিসাবে যে নীতিমালা তৈরীর সুপারিশ করেন, ৬-দফা মোটামুটি তারই বাস্তবায়ন। অলি আহাদ সাহেব বলেছেন - এই ৬-দফা দাবি শেখ মুজিব সাহেব প্রথম দিন দিয়েছিলেন তৎকালীন গভর্ণর হাউসে এক সভায় নুরুল আমীনকে। নুরুল আমীন তখন সম্মিলিত বিরোধী দলীয় জোট এনডিএফ-এর চেয়ারম্যান। নুরুল আমীন ৬-দফাকে দেখেই বললেন - এই দাবির অর্থ পাকিস্তান ভেঙ্গে দেয়া। এ প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক মেঘনা (১২ মার্চ, ১৯৮৬) লিখেছে - 'লাহোর বিরোধী দলীয় কনভেনশনে যাবার সময় শেখ মুজিবের সাথে ছিলেন আবদুল মালেক উকিল ও অধ্যাপক ইউসুফ আলী। তারা দুজনেই এই প্রতিবেদকে বলেছেন, এই দলিলটি লাহোর না যাওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু আমাদের দেখাননি।'
এদিকে ছাত্রলীগ, মুজিব বাহিনী, আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সাবেক নেতা বর্তমানে বাকশালের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকের মতে, '৬-দফা এর মূল কপি আমি দিয়েছিলাম মনি ভাইকে, তিনি এটি হারিয়ে ফেলেন।' শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন ও আবদুস সালাম খান প্রমুখ সমন্বয়ে গঠিত আওয়ামী লীগের একটি টীম আইয়ুব খানের সাথে আলাপ করার জন্য 'টকিং পয়েন্ট' হিসাবে নাকি এটা নিয়ে যান। আবার সাবেক সিএসপি রুহুল কুদ্দুস দাবী করেছেন যে, তিনিই নাকি ৬-দফার প্রণেতা। তবে রহস্যের মূলে আরও কিছু আলোক সম্পাত করতে হলে ৬-দফার প্রেক্ষিতটাও আলোচনা করা দরকার।
শেখ মুজিব ৬-দফা দিয়েছেন ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী। এর আগে ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ১৭ দিনের একটা যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধের ফলাফলটা আইয়ুব খানের জন্য আনন্দদায়ক ছিল না। ফলে তাসখন্দ চুক্তি করে তিনি দেশে ফিরে এলে প্রচন্ড প্রতিবাদের মুখোমুখি হন।
এই যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আইয়ুব খানকে বিশেষভাবে পীড়িত করে। পাকিস্তান আমেরিকার সাথে যুদ্ধ জোটে আবদ্ধ। ভারত জোট নিরপেক্ষ দল। সে ক্ষেত্রে আইয়ুব খানের স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সমর্থন করবে। কিন্তু কার্যত: যুক্তরাষ্ট্র সযত্নে এমন ধরণের কাজ থেকে বিরত থেকেছে - যা ভারতের অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে।
উল্লেখ্য, '৬২-এর চীন-ভারত যুদ্ধের অজুহাতে ইতিপূর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র সরবরাহ করে আসছিল। এ অস্ত্রও স্বাভাবিক কারণেই পাক-ভারত যুদ্ধে ভারত ব্যবহার করেছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আইয়ুবের ক্ষোভের কারণ হয়েছে। ক্ষুব্ধ আইয়ুব খান অত:পর আমেরিকার সেই সময়কার জানী দুষমন, চীনের সাথে দারুণ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পেতে ফেলেন। পিকিং-এ তাকে বিশ্ব-নায়কোচিত সম্বর্ধনা দেয়া হয়। স্মরণ করা যেতে পারে, এরই সূত্র ধরে পরবর্তীকালে আইয়ুব খান 'ফ্রেন্ডস নট মাষ্টারস' নামে একখানি গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থে মার্কিন ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছিল। এসব ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রকেও ক্ষুব্ধ করেছিল। স্বাভাবিক কারণে, যুক্তরাষ্ট্রেরও প্রয়োজন পড়েছিল আইয়ুব খানকে কিছুটা 'উচিত শিক্ষা' দেয়ার। বিশেষত: ১৯৫৮ সালে এই আইয়ুব খান মার্কিন মদদেই পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেছিলেন। তার এতবড় স্পর্ধা আমেরিকা নীরবে সহ্য করবে কেন?
৬ দফা কি আইয়ুব খানকে সেই 'উচিত শিক্ষা দেয়ার' দফা হতে পারে না? এ ক্ষেত্রে ধারণাটাকে আরও পরিষ্কার করার জন্য যে সংযোগসূত্রগুলো দরকার তা হচ্ছে :
১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূত বগুড়ার মোহাম্মদ আলী যখন উড়ে এসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আসনটি জুড়ে বসেছিলেন তখন মার্কিন মদদপুষ্ট সে মন্ত্রিসভায় শেখ মুজিবের আদর্শিক নেতা সোহরাওয়ার্দীরও একটি সম্মানজনক আসন ছিল। (সোহরাওয়ার্দী-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক)
২. এই সোহরাওয়ার্দীই আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে তার দল আওয়ামী লীগ প্রধান মওলানা ভাসানীর প্রচন্ডতম বিরোধিতার মুখে যখন পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি ও বিভিন্ন যুদ্ধ জোটের পক্ষে ওকালতি করেন - শেখ মুজিব গ্রুপ তখন দলের নেতা 'অ-মন্ত্রী' মওলানা ভাসানীর পরিবর্তে মার্কিনী ইচ্ছার বাহক ও ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীকেই সমর্থন দিয়েছিলেন। (মুজিব-সোহরাওয়ার্দী-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক)
৩. ৫১-এর দশকে শেখ মুজিব সংখ্যাসাম্য, এক ইউনিট ও জাতীয় সংহতির প্রবক্তা। ৬-দফার বক্তব্য তার সম্পূর্ণ বিপরীত - স্বাধীনতার একেবারে কাছাকাছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কেও কিন্তু ৬-দফা সম্পূর্ন নীরব।
৪. রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক হিসাবে শেখ মুজিব মোটা বেতনে চাকুরী করতেন (কাজ করতে হত না) আলফা ইনসিওরেন্স কোম্পানী নামক একটা বীমা প্রতিষ্ঠানে। এ প্রতিষ্ঠানটির মালিক ছিল কুখ্যাত ২২ পরিবারে অন্যতম হারুন গ্রুপ। আইয়ুব খান আবার ছিলেন এই হারুণ গ্রুপের জানী দুষমন। ১৯৫৮ সালে ক্ষমতায় এসে আইয়ুব খান এই হারুণ গ্রুপের প্রধান ব্যক্তিকে সামরিক আদালতের বিচারে বেত্রাঘাত দিয়েছেন, তাদের কোটি টাকার ব্যবসা নষ্ট করেছেন।
৫. '৫৮ সালে আইয়ুব খান স্বয়ং শেখ মুজিবকেও কিন্তু দুর্নীতির মামলায় ঝুলিয়েছিলেন।
অবশ্য স্বীকার্য, এ সিদ্ধান্তটি পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য প্রসূত। তবে, এর স্বপক্ষে আরও শক্ত প্রমাণ রেখে গেছেন স্বয়ং শেখ মুজিব - '৭১-এর ১ মার্চ (৬-দফা চাপিয়ে দেয়া হবে না ঘোষণা করে) এবং ২৩ মার্চ (৬-দফাকে বাদ দিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সাথে সমঝোতা করে)। এই সাথে, কুখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডের (ইন্দোনেশিয়ায় '৬৫ সালে সুকর্ণ বিরোধী অভ্যুত্থান ও গণহত্যার সময় জাকার্তায় কর্মরত ছিলেন) সাথে শেখ মুজিবের বুড়িগঙ্গা নদীতে গোপন অভিসার, ৭ মার্চ 'এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম' উচ্চারণ করার পাশাপাশি সংবাদপত্রে আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতিদান, পাকিস্তানী বাহিনীর কাছে ২৫ মার্চ আত্মসমর্পণ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ইত্যাদি মিলিয়ে দেখলে সম্ভবত: আর কিছু অপরিষ্কার থাকে না।
সে যাই হোক, চূড়ান্ত বিশ্লেষণে ৬-দফা আইয়ুবের জন্য 'কাল' হলেও আইয়ুবও সাময়িকভাবে ৬-দফাকে আত্মরক্ষার অবলম্বন হিসাবে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। তাই ৬-দফা ও শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের আক্রমণও হয়েছিল সর্বাত্মক। পাশাপাশি, অন্যদিকে আবার সরকারী নির্যাতনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুদ্ধের দিনগুলিতে অরক্ষিত পূর্ব বাংলার অনিশ্চয়তার দিকটিকে প্রাধান্যে এনে স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবিকে তুলে ধরার ফলে ৬-দফাও দ্রুত পরিচিতি লাভ করেছিল।
তথাপি ৬-দফা বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো সফল আন্দোলন নির্মাণ করতে পারেনি। শেখ মুজিব ও অন্যান্য আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের গ্রেফতারের পরপর '৬৬ সালের জুনেই এর অকাল পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। সেই নির্দিষ্ট সময়ে সর্বস্তরের জনগণের সমর্থন অর্জনে ব্যর্থতা ছিল এই পরিণতির প্রধান কারণ। 'ভূমিহীনদের মধ্যে উদ্বৃত্ত জমি বিতরণ' করার মত ২১-দফায় ঘোষিত কোনো কর্মসূচী ৬-দফায় ছিল না। ফলে কৃষক-শ্রমিক মেহনতী জনতাকে যেমন আকৃষ্ট করা যায়নি, তেমনি শিক্ষা সংক্রান্ত কোনো কর্মসূচীর অনুপস্থিতির কারণে ছাত্র সমাজকেও টেনে আনা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া শোষণের ব্যবস্থা হিসেবে সামন্তবাদ বা পুঁজিবাদ এতে চিহ্নিত হয়নি। ওদিকে, '৫৪ সাল থেকে স্বায়ত্ত্বশাসনের প্রমাণিত প্রধান শত্রু সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কেও ৬-দফায় অর্থবহ নীরবতা পালিত হয়েছিল। অন্য কথায় পাকিস্তানের বৃহৎ পুঁজির সাথে প্রতিযোগিতায় পরাস্ত এবং অবদমিত বাঙ্গালী উঠতি ধনিক শ্রেণীর সমর্থন সমাবিষ্ট করার লক্ষ্যেই প্রধানত: ৬-দফা প্রণীত হয়েছিল। সেই সাথে ছিল এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কারণ, যে ইঙ্গিত আগেই দেয়া হয়েছ।
উদ্দেশ্যের এই সীমাবদ্ধতা এবং আন্দোলন নির্মাণে ব্যর্থতা সত্ত্বেও ৬-দফাই শেষ পর্যন্ত কিন্তু পূর্ব বাংলার প্রধান দাবিতে রুপান্তরিত হয়েছিল। এর কারণ, '৬৮- র ডিসেম্বরে সূচিত মওলানা ভাসানীর ঘেরাও আন্দোলনের পথ ধরে নির্মিত ১১-দফা ভিত্তিক '৬৯-এর সফল ছাত্র-গণ অভ্যুত্থান। এই ছাত্র-গণ অভ্যুত্থান আইয়ুব সরকারের পতনকে অনিবার্য করে তুলেছিল এবং তার মধ্য দিয়ে একইযোগে অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী হিসেবে বিচারাধীন বন্দী শেখ মুজিব। বাস্তবে শেষ দিকে সমগ্র আন্দোলনই আবর্তিত হয়েছিল শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিটিকে কেন্দ্র করে। এই জনপ্রিয়তার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি তার বিস্মৃতপ্রায় ৬-দফাকে পরে সুকৌশলে পুনর্বাসিত করেছিলেন ১১-দফার সাথে ৬-দফাকে জুড়ে দিয়ে। এ পর্যায়ে প্রথম কিছুদিন পর্যন্ত '৬-দফা ও ১১-দফা' বলার পর ধীরে ধীরে তিনি ৬-দফাকেই তার প্রধান শ্লোগান বানিয়েছিলেন। এর ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত না হলেও ১১-দফাকে বাস্তবে ৬-দফার মধ্যে পরিণতিলাভ করতে হয়েছিল।
বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর মনে মারাত্মক পশ্চিম পাকিস্তান বিদ্বেষের সংক্রমণ ঘটানো ছিল শেখ মুজিবের প্রধান কৌশল। এই প্রচারণা অবলম্বনের ফলে ৬-দফার ভিত্তিতে '৭০ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করে প্রদেশের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতেই আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয়লাভ করেছিল। নির্বাচনোত্তর সাংবিধানিক সংকট এবং সবশেষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার প্রেক্ষিতে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনার পেছনেও প্রধান কারণ হিসেবে ক্রিয়া করেছিল ৬-দফাই। মুজিব স্বাধীনতা না চাইলেও এবং পাকিস্তানের মধ্যেই সমাধান অন্বেষণ করলেও 'বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ' হিসেবে কথিত ৬-দফা পরিস্থিতিকে তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতাও হয়ে পড়েছিল অনিবার্য॥"
উৎসঃ আবদুর রহিম আজাদ / বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রকৃতি ও প্রবণতা : ২১-দফা থেকে ৫-দফা ॥ [ সমাজ বিজ্ঞান গবেষনা কেন্দ্র - জুন, ১৯৮৭ । পৃ: ১৪-২১ ]
৫. এক বছর সময় পেয়েছিল ন্যাপ সংগঠিত করতে। এরপরই মার্কিন অনুপ্রাণিত সামরিক শাসন প্রবর্তন হলো পাকিস্তানে। ফলে নতুন দল হিসেবে জনগণের কাছে পৌঁছানোও সেভাবে সম্ভব হলো না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ৯ বছরের পুরনো যে অবকাঠামো গড়ে তুলেছিল, সেটি টিকে ছিল এই দূর্যোগেও। তাই এই দূর্যোগের মধ্যেও বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সুযোগটা বেশি ছিল। তাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ১৯৬৯ সালের জুনে জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য যে ব্যাপক গণতান্ত্রিক ১৪ দফা কর্মসুচি প্রণয়ন করেছিল তা খুব বেশি প্রচার পেল না। অথচ ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ যে ৬ দফা জনসাধারণকে পেশ করল তাতে অনেক বেশি চমক ও চটক সৃষ্টি করেছিল। তাছাড়া আওয়ামী লীগ এতদিনের মওলানা ভাসানীর গড়ে তোলা দল তার তার ভিত্তি অনেক মজবুত ছিল বলে ৬ দফার প্রচার প্রচারণা ব্যাপক হলো এবং দলের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে সামরিক শাসকেরা এবেলা গ্রেফতার করে ওবেলা ছেড়ে দিচ্ছিল, বারবার গ্রেফতার এবং মুক্তির কারণে জনগণের মধ্যেও এক ধরণের কারিশমা গড়ে উঠেছিল॥"
উৎসঃ কামাল লোহানী / রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার ॥ [ভূমিকা - ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৩১]
৬. "মুনতাসীর মামুন : ৬-দফা সম্পর্কে আপনার মত কী?
জে: রাও ফরমান আলি : কথা ছিল ছয়দফার সংশোধন করে তা সহনীয় করে তুলবেন। কেননা, ওটা কোনও কুরআনী কানুন তো ছিল না। ৬ দফা আর যা-ই হোক বেহেশত থেকে আসে নি। আর এও আমাদের জানা ছিল আওয়ামী লীগের ভেতরেই কিছু লোক ছিল যাদের মধ্যে ছয়দফার বিষয়গুলির ধারণা নিয়ে মতপার্থক্য ছিল। এমন পরিস্থিতিতে মুজিব যদি কম ভোট পেতেন তাহলে তিনি যেভাবে চেয়েছিলেন সেভাবেই সবকিছু করার অপেক্ষাকৃত যুক্তিসঙ্গত সুযোগ পেতেন। কিন্তু কল্পনাতীত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেলেন তিনি। মাত্র দুটি আসনে হারতে হয় তাকে। আর এর পরিণতিতে তিনি ৬ দফার দাবিদারদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েন। কাজেই ছয়দফার প্রশ্নে সর্বাত্মক সমর্থন ঘোষনা ছাড়া তার কোনো গত্যন্তর রইল না। ৬ দফা চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় হয়ে উঠল। ৬ দফা হয়ে গেল মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন - এ জাতীয় অনিবার্য কিছু। অথচ রাজনীতিতে লেনদেনমূলক আলাপ-আলোচনা চলছিল এমন সময়ে এটি হওয়া উচিত ছিল না॥"
উৎসঃ মুনতাসীর মামুন / পরাজিত জেনারেলদের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ ॥ [সময় - ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯ । পৃ: ১০৯]
৭. ১৯৫৪ সনের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব বাংলার মুসলিম আসনের শতকরা সাড়ে ৯৭টি যে একুশ দফার পক্ষে আসিয়াছিল, লাহোর-প্রস্তাবের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনার দাবি ছিল তার অন্যতম প্রধান দাবি। মুসলিম লীগ তখন কেন্দ্রের ও প্রদেশের সরকারী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। সরকারী সমস্ত শক্তি ও ক্ষমতা লইয়া তারা এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধতা করিয়াছিলেন। এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলে ইসলাম বিপন্ন ও পাকিস্তান ধ্বংস হইবে, এ সব যুক্তি তখনও দেওয়া হইয়াছিল। তথাপি পূর্ব বাংলার ভোটাররা এই প্রস্তাবসহ একুশ দফার পক্ষে ভোট চাহিয়াছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের পক্ষের কথা বলিতে গেলে এই প্রশ্নের চূড়ান্তভাবে গণতান্ত্রিক উপায়ে মীমাংসিত হইয়াই গিয়াছে। কাজেই আজ লাহোর-প্রস্তাবভিত্তিক শাসনতন্ত্র রচনার দাবি করিয়া আমি কোনও নতুন দাবি তুলি নাই। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের পুরান দাবিরই পুনরুল্লেখ করিয়াছি মাত্র। তথাপি লাহোর-প্রস্তাবের নাম শুনিলেই যারা আঁৎকিয়া উঠেন, তারা হয় পাকিস্তান-সংগ্রামে শরিক ছিলেন না, অথবা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দাবি-দাওয়ার বিরোধিতা ও কায়েমী স্বার্থীদের দালালি করিয়া পাকিস্তানের অনিষ্ট সাধন করিতে চান।
এ প্রসঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানী ভাই বোনদের খেদমতে আমার কয়েকটি আরজ আছে: তারা মনে করিবেন না আমি শুধু পূর্ব পাকিস্তানীদের অধিকার দাবি করিতেছি। আমার ৬-দফা কর্মসূচীতে পশ্চিম পাকিস্তানীদের দাবিও সমভাবেই রহিয়াছে। এ দাবি স্বীকৃত হইলে পশ্চিম পাকিস্তানীরাও সমভাবে উপকৃত হইবেন।
যে নেতা বিশ্বাস করেন, দুইটি অঞ্চল আসলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় দেহের দুই চোখ, দুই কান, দুই নাসিকা, দুই পাটি দাঁত, দুই হাত দুই পা; যে নেতা বিশ্বাস করেন পাকিস্তানকে শক্তিশালী করিতে হইলে এই সব জোড়ার দুটিকেই সমান সুস্থ ও শক্তিশালী করিতে হইবে; যে নেতা বিশ্বাস করেন পাকিস্তানের এক অঙ্গ দূর্বল হইলে গোটা পাকিস্তানই দূর্বল হইয়া পড়ে; যে নেতা বিশ্বাস করেন ইচ্ছা করিয়া বা জানিয়া শুনিয়া যারা পাকিস্তানের এক অঙ্গকে দূর্বল রাখিতে চায় তারা পাকিস্তানের দুষমন; যে নেতা দৃঢ় ও সবল হস্তে সেই দুশমনদের শায়েস্তা করিতে প্রস্তুত আছেন - কেবল তিনিই পাকিস্তানের জাতীয় নেতা হইবার অধিকারী। কেবল তারই নেতৃত্বে পাকিস্তানের ঐক্য অটুট ও শক্তি অপরাজেয় হইবে। পাকিস্তানের মত বিশাল ও অসাধারণ রাষ্ট্রের নায়ক হইতে হইলে নায়কের অন্তরও হইতে হইবে বিশাল ও অসাধারণ।
আশা করি আমার পশ্চিম পাকিস্তানী ভাইরা এই মাপকাঠিতে আমার ছয় দফা কর্মসূচীর বিচার করিবেন। তা যদি তারা করেন তবে দেখিতে পাইবেন, আমার এই ছয় দফা শুধু পূর্ব পাকিস্তানের বাঁচার দাবি নয়, গোটা পাকিস্তানেরই বাঁচার দাবি। ৬ দফা বা আমাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচী ইসলামকে বিপন্ন করে তুলেছে বলে যে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে - সে মিথ্যা প্রচারণা থেকে বিরত থাকার জন্য আমি শেষবারের মত আহবান জানাচ্ছি। অঞ্চলে অঞ্চলে এবং মানুষে মানুষে সুবিচারের নিশ্চয়তা প্রত্যাশী কোনকিছুই ইসলামের পরিপন্থী হতে পারে না। আমরা এ শাসনতান্ত্রিক নীতির প্রতি অবিচল ওয়াদাবদ্ধ। কোরাণ ও সুন্নাহর নির্দেশিত ইসলামী নীতির পরিপন্থী কোন আইন এদেশে পাশ হতে বা চাপিয়ে দেয়া যেতে পারে না॥" - শেখ মুজিবুর রহমান / রেডিও পাকিস্তান থেকে প্রচারিত ভাষণ - ১০.১০.১৯৭০
তথ্যসূত্র: শেখ মুজিবুর রহমান / মুজিবরের রচনা সংগ্রহ ॥ [প্রকাশক: সোমেন পাল / রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন (৩০, মহাত্মা গান্ধী রোড, কলিকাতা - ৯) - ১৫ই শ্রাবণ, ১৩৭৮ (প্রথম প্রকাশ) । পৃ: ১৮-১৯/৫৫ ]
৮. Mujib’s programme, on which he based his election campaign and won a landslide victory in East Pakistan, was like many other political programmes - capable of more than one interpretation. The identity of its real authors or draftsmen is still a matter of speculation. Rumour went so far as to make the author Altaf Gauhar, one of the most trusted and close members of the ruling elite during the Ayub era; the hint was made in certain quarters that Ayub himself asked Altaf Gauhar to do this job at a time when there was great unrest in West Pakistan over the Tashkent agreement, and that Ayub wanted to divert the attention of West Pakistan by raising the specter of the secession of East Pakistan.
But during my four years stay in Islamabad, both during and after the fall of Ayub, I could find no basis for such a rumour. Nor can I believe that Ayub with his very real patriotism could resort to such a trick; with all his limitations, Ayub was a great Pakistani leader and a statesman. A shrewd document like this was most likely the joint product of several intellectual advisers and associates of Mujib.”
উৎসঃ G. W. Choudhury (member of the Pakistan cabinet - 1967-71) / The Last Days of United Pakistan ॥ [ UPL - 1994 (first ed. 1974) । P. 134 ]
৯. The right wing Opposition in West Pakistan condemned the Tashkent Declaration as a humiliating document. A two-day conference of Awami Party, was convened in Lahore on 5 February where a resolution moved by Maulana Maududi was unanimously adopted, condemning the Tashkent Declaration as detrimental to Pakistan’s interests. The West Pakistan government imposed a black-out on the proceedings of the meeting. It was at this meeting that Sheikh Mujib presented his six-points programme. None of the Opposition leaders criticized that programme, nor did anyone dissociate himself from it. To cover their own political bankruptcy they floated a ridiculous rumour that Mujib’s six-points had been drafted by the Information Secretary (present writer) at the behest of Ayub to disunite the Opposition.”
উৎসঃ Altaf Gauhar (Information Secretary - 1963-69) / Ayub Khan : Pakistan’s First Military Ruler ॥ [ UPL - 1996 । P. 275 ]
১০. অনেকের, এমনকি খোদ আওয়ামী লীগারদেরও অনেকের, বিশ্বাস, ‘ছয় দফা’ আমিই রচনা করিয়াছি। যুক্তফ্রন্টের ‘একুশ দফাও’ আমিই রচনা করিয়াছিলাম। এই সুপরিচিত তথ্য হইতেই সকলে ঐ সহজেই ‘ছয় দফাও’ আমার রচনার কথাটা বিশ্বাস করিতে পারিয়াছেন। আসল সত্য তা নয়। আমি ‘ছয় দফা’ রচনা করি নাই। ‘ছয় দফার’ ব্যাখ্যায় বাংলা-ইংরেজী যে দুইটি পুস্তিকা ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ ও ‘আওয়ার রাইট টু লিভ’ প্রকাশিত ও বহুল প্রচারিত হইয়াছে, এই দুইটি অবশ্যই আমি লিখিয়াছি এবং বরাবরের মত নির্ভুল ছাপা হওয়ার গ্যারান্টি স্বরূপ আমি নিজেই তাদের প্রুফও দেখিয়া দিয়াছি।
মুজিবের ভালর জন্যই একথাটা গোপন রাখা স্থির হইয়াছিল। সে গোপনতার হুঁশিয়ারি হিসাবে প্রুফ নেওয়া-আনার দায়িত্ব পড়িয়াছিল তাজউদ্দিনের উপর্। মানিক মিয়া, মুজিব, তাজউদ্দিন ও আমি এই চারজন ছাড়া এই গুপ্ত কথাটা আর কেউ জানিতেন না। অথচ অল্প দিনেই কথাটা জানাজানি হইয়া গেল। মুজিব তখন জেলে। আমি ভাবিলাম, মুজিবের কোনও বিরোধী পক্ষ তার দাম কমাইবার অসাধু উদ্দেশ্যে এই প্রচারণা চালাইয়াছে। কাজেই আমি খুব জোরে কথাটার প্রতিবাদ করিতে থাকিলাম। পরে শেখ মুজিবের সহকর্মী মরহুম আবদুস সালাম খাঁ ও যহিরুদ্দিন সাহেবানদের মুখে যখন শুনিলাম, স্বয়ং মুজিবই তাদের কাছে একথা বলিয়াছেন, তখন আমি নিশ্চিন্ত ও আস্বস্ত হইলাম॥"
উৎসঃ আবুল মনসুর আহমদ / আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর ॥ [ খোশরোজ কিতাব মহল - সেপ্টেম্বর, ২০১৩ । পৃ: ৫৩২ ] [সংকলন : কাইকাউস]
COMMENTS