রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আমাদের জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং বাঙালী জাতিকে স্বাধিকার অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পরই শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে ১৯৭১ সালে অর্জিত হয় বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা।
পাঁচ. খাজা নাজিমুদ্দীন ধার্মিক মুসলমান একথা কেউই অস্বীকার করবেন না, কিন্তু তিনি যেন নিজেকে দ্বিতীয় ওসমান-বিন-আফফান প্রমাণিত না করেন আমরা এ আশা এবং এ প্রার্থনাই করি।’’ ২১ ফেব্রুয়ারি প্রস্তুতি হিসেবে ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন জিল্লুর রহমান। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পাস হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, সরকারী এক ঘোষণায় ঐদিন থেকে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে সভা-মিছিল ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়। ১৪৪ ধারা জারির প্রেক্ষিতে ২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় এক বৈঠক বসে। ৯৪, নওয়াবপুর রোড আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এই বৈঠকের ডাক দেয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ নেতা আবুল হাশিম। উক্ত বৈঠকে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে-বিপক্ষে ভোট গ্রহণ করা হয়। বেশিরভাগ সদস্য ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার বিপক্ষে ভোট দেয়।
২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তারিখে গভীর রাতে ঢাকা হলের (বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল) পুকুরপারে ১১ ছাত্রনেতা এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়। চরম উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠার মধ্যে ২০ ফেব্রুয়ারির রাত অতিবাহিত হয়। সারা ঢাকা শহরে থমথমে পরিবেশ। রাস্তাঘাট ফাঁকা ফাঁকা। সব জায়গায় একটাই কথা, একটাই আলোচনা, একুশে ফেব্রুয়ারি কি হবে? ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হবে, কি হবে না?
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, এদিনে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করায় ছাত্র-জনতার মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এক কথায় এদিনটি ভাষা আন্দোলনের বিস্ফোরণ ও চরম পর্যায়। একুশে ফেব্রুয়ারি খুব ভোর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মধ্যে তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা ভোর থেকেই দু’একজন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জমায়েত হতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা ছাত্রদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে।
সকাল ১১টায় আমতলায় বিস্ফোরণোম্মুখ ছাত্র যুবকদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এমআর আখতার মুকুলের প্রস্তাবক্রমে ছাত্রনেতা গাজীউল হক উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য রাখেন : শামসুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নেওয়াজ, আবদুল মতিন। সভা প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর অবশেষে গাজীউল হক সভাপতি হিসাবে বক্তব্য রাখেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সপক্ষে মত প্রকাশ করে তিনি বলেন যে, এভাবেই তারা নুরুল আমীন সরকারের চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করতে চান। গাজীউল হক কর্তৃক ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় সমবেত ছাত্র-ছাত্রীরা উত্তেজনায় অস্থির হয়ে ওঠেন এবং বিভিন্ন রকম সেøাগান দিতে থাকেন। সভায় আব্দুস সামাদ আজাদের এক প্রস্তাবক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, ১০ জন করে গ্রুপ করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে। প্রথম ১০ জনের গ্রুপের নেতৃত্ব দেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র আলী আজমল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাবিবুর রহমান। আলী আজমল প্রথম গ্রেফতার বরণ করেন।
বিকেল ৩ থেকে ৩.৩০টার মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলি চালানোর ফলে ঘটনাস্থলে শহীদ হন রফিক উদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত এবং আব্দুল জব্বার। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য থেকে ২১ ফেব্রুয়ারিতে এই তিনজন ভাষাশহীদের পরিচয় পাওয়া যায়। তবে ভাষাশহীদের সংখ্যা যে তিনের অধিক ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। ভাষাসৈনিকদের স্মৃতিচারণ, পত্রিকার বিবরণ থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তৎকালীন সরকার অনেক ভাষাশহীদের মরদেহ গুম করে ফেলেছিল ফলে অন্যদের কোন পরিচয় এমনকি করবেরও সন্ধান পাওয়া যায়নি। গুলি বর্ষণের কিছুক্ষণ পর আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণের জন্য আবুল হাশিম, কামরুদ্দীন আহমদ, শামসুল হক, গাজী গোলাম মাহবুব, আবদুর গফুর নেতৃবৃন্দ প্রথমে ফজলুল হকের কে.এম. দাস লেনস্থ বাড়িতে এবং পরবর্র্তীতে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এক বৈঠকে মিলিত হন॥ (পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, পৃ: ২১১)
উৎস : এম.আর.মাহবুব / জনকণ্ঠ : চতুরঙ্গ॥ (বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : ৯ই ফাল্গুন ১৪১৯)
ছয়. একুশের হত্যাকান্ডের পর পূর্ব পাকিস্তান বিধান সভায় স্পীকার আব্দুল করিমের সঙ্গে মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত ও আনোয়ারা খাতুন সদস্যের বাগবিতন্ডা এবং মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস সদস্যসহ ৩৫জন সভা ত্যাগ করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে স্থাপন করা হয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। ছাত্রদের একসভা শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন ছাত্র সংসদের ভিপি গোলাম মওলাকে আহবায়ক করে গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তারা ২২ ফেব্রুয়ারি গায়েবানা জানাজা, শোকসভা, মিছিলের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। একুশে রক্তাক্ত ঘটনা সম্পর্কে আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘ভাষা দমনে গুলি' শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশ করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের ১ ঘণ্টার মধ্যে কবি ফররুখ আহমদ, সিকান্দার আবুজাফর, সায়ীদ সিদ্দিকী, আবদুল আহাদ, আবদুল লতিফ শিল্পীদের নেতৃত্বে এই হত্যাকা-ের প্রতিবাদে রেডিও শিল্পীদের নেতৃত্বে প্রথম ধর্মঘট পালিত হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাসান হাফিজুর রহমানের উদ্যোগে ক্যাপিটাল প্রেসের সহযোগিতায় প্রকাশিত হয় একুশের প্রথম লিফলেট। একুশে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আলাউদ্দিন আল আজাদ, মুস্তাফা নুরউল ইসলাম, ফজলে লোহানী, হাসান হাফিজুর রহমান পাটুয়াটুলির পাইওনিয়ার প্রেস থেকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেন একুশের প্রথম বুলেটিন। বুলেটিনের 'বিপ্লবের কোদাল দিয়ে আমরা অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর কবর রচনা করব' শীর্ষক শিরোনাম রচনা করেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। একুশের প্রথম কবিতা 'কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি' রচনা করেন কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী। একুশের হত্যাকান্ডের খবর শুনে সেদিনই তিনি এই ঐতিহাসিক কবিতাটি রচনা করেন।


একুশের ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে নিহত ভাষা শহীদদের মরদেহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে গভীর রাতে পুলিশ আজিমপুর গোরস্তানে দ্রুত দাফন সম্পন্ন করে। দাফনের সময় উপস্থিত ছিল মৌলানা গফুর, ড্রেসার সুরুজ্জামান, লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম.এ. গোফরান, পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজি এ.জেড. ওবায়দুল্লাহ, এসপি ইদ্রিস প্রমুখ। একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তারিখ ভাষাশহীদদের মরদেহ শনাক্ত করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন ছাত্রনেতা খোন্দকার আলমগীর এবং আমীর আহসান। সামরিক বাহিনীর লোকজন গভীর রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে মরদেহ আজিমপুর কবরস্থানে নিয়ে যায় এবং গণকবর দেয়। এ সময় এসব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এই দু’জন ছাত্রনেতা। তারা রাতের শেষপ্রহরে ভাষা শহীদদের কবর শনাক্ত করে ভাষা শহীদদের রক্তাক্ত বস্ত্র নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে এলে ছাত্র-জনতা আন্দোলনের নতুন এক কর্মসূচী গ্রহণ করে।
২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে একুশের শহীদদের স্মরণে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় হাজার হাজার লোক শরিক হয়। জানাজা শেষে যুব লীগের সম্পাদক মুহম্মদ এমাদুল্লাহর সভাপতিত্বে এক সংক্ষিপ্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অলি আহাদ বক্তব্য রাখেন। তারা মাতৃভাষা বাংলাকে পূর্ণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ২২ তারিখেও পুলিশ-মিলিটারি নিরস্ত্র জনতার ওপর লাঠিচার্জ ও গুলি চালিয়েছে, গ্রেফতার করেছে শত শত নিরপরাধ মানুষকে। এদিন ৪জন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হয়। শহীদদের মরদেহ ষড়যন্ত্র করে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। এদিন ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিবাদ সভা, মিছিল, বিক্ষোভ, পিকেটিং অব্যাহত থাকে। ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় মিছিলকারীরা এক পর্যায়ে মর্নিং নিউজ পত্রিকার ছাপাখানা ‘জুবিলী প্রেস’-এ অগ্নিসংযোগ করে।
আইন পরিষদ সদস্য পদ থেকে দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন পদত্যাগ করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকা ‘তদন্ত চাই’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। এতে একুশ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের ওপর গুলি বর্ষণের তদন্ত দাবি করা হয়। এদিন বিকেলে অনুষ্ঠিত ব্যবস্থা পরিষদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এক প্রস্তাবে গণপরিষদের নিকট বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ করা হয়।
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এটিই কোন পত্রিকার ভাষা শহীদ স্মরণে প্রথম বিশেষ সংখ্যা। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী ঢাকায় লাগাতার হরতাল পালিত হয়। এদিন এসএম হল প্রাঙ্গণে ভাষা শহীদদের স্মরণে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং ফজলুল হলে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ব্যবস্থাপনা পরিষদের সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি হতে পদত্যাগ করেন। এদিন রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ব্যারাক প্রাঙ্গণে ভাষা শহীদদের স্মরণে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। এটাই ছিল ঢাকায় নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার।
২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের প্রচেষ্টায় ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে নির্মিত প্রথম শহীদমিনারটি ২৪ ফেব্রুয়ারি অনানুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন শহীদ সফিউর রহমানের পিতা মোলভী মাহবুবুর রহমান। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বান অনুযায়ী ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশের অধিকাংশ স্থানে হরতাল পালিত হয়। একই সঙ্গে দেশব্যাপী প্রতিবাদ সভা, বিক্ষোভ, পিকেটিং অব্যাহত থাকে। এদিন সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভবনে শিক্ষকদের কমন রুমে কলা অনুষদের ডিন আইএইচ জুবেরীর সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির এক প্রতিবাদ ও শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন একুশের সামগ্রীক ঘটনার ওপর আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘মাতৃভাষার জন্য’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয় ‘পূর্ব বঙ্গের জনসাধারণ তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যে আদর্শনিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন, তা কখনও ব্যর্থ হবার নয়। পাকিস্তানের মোট জনসমষ্টির দুই-তৃতীয়াংশের মাতৃভাষার দাবিকে কাঁদানে গ্যাস, লাঠি ও গুলি চালিয়ে হত্যা করা যে সম্ভব নয়, তা পাকিস্তান কর্তাদের হৃদয়ঙ্গম করা উচিত ছিল। পূর্ববঙ্গের অধিবাসীদের মাতৃভাষার সঙ্গত দাবি দমনের জন্য গুলি নিক্ষেপের মতো নিন্দনীয় আচরণ অনুষ্ঠিত হলো কেন, বিস্ময়ের সঙ্গে তা ভাবছি।
২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, এদিন আজিমপুর কলোনিতে ঢাকার মহিলাদের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণ না করা পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য পূর্ববঙ্গের জনগণকে অনুরোধ জানানো হয়। এদিন ৯৬ ঘণ্টার হরতাল ও ধর্মঘটের শেষের দিন অতিবাহিত হয়। এদিন দেশের প্রধান প্রধান শহরে হরতাল পালিত হয়েছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পক্ষে কাজ করার দায়ে পুলিশ নিরাপত্তা আইনে ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে আবুল হাশিম, মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ (এমএলএ), মনোরঞ্জন ধর (এমএলএ), গোবিন্দলাল ব্যানার্জী (এমএলএ), খয়রাত হোসেন (এমএলএ) ব্যক্তিবর্গকে গ্রেফতার করে। এদিন পুলিশ ও মিলিটারি নানা স্থানে হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে দমননীতির মাধ্যমে স্তব্ধ করার চেষ্টা করে। তাদের মূল টার্গেট ছিল বিভিন্ন স্থানে মাইকের মাধ্যমে আন্দোলনের পক্ষে পরিচালিত প্রচারকার্য বন্ধ করে দেয়া। ঐদিন ফজলুল হক হল ও এসএম হলে স্থাপিত মাইক পুলিশ ও মিলিটারি যৌথ অভিযান চালিয়ে ছিনিয়ে নেয়।
২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, এদিন বেলা আড়াইটার সময় বিপুলসংখ্যক পুলিশ এসএম হলে হানা দেয়। হলের টিউটর ড. মফিজউদ্দিনসহ ৩০ ছাত্রকে গ্রেফতার করে। এদিন সন্ধ্যায় পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে নির্মিত শহীদমিনারটি সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে দেয়। এ সময় পুলিশ ৭০ ছাত্রকে গ্রেফতার করে॥
উৎস : এম.আর.মাহবুব / জনকণ্ঠ : চতুরঙ্গ॥ শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : ১০ই ফাল্গুন, ১৪১৯। [ কৃতজ্ঞতাঃ কাই কাউস ]
আরো দেখুনঃ
১. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : প্রথম পর্ব
২. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : ৩য় পর্ব
আরো দেখুনঃ
১. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : প্রথম পর্ব
২. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ : ৩য় পর্ব
COMMENTS