পিতা ও পুএ : দুই সিরাজীর স্মৃতি

স্পেনে মুসলিম সভ্যতা, দীনেশচন্দ্র সেন, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, সিরাজী সাহেব, ফাতেহায়ে দোয়ায-দাহম, জসীমউদ্দীন, মুস্তফা জামান আব্বাসী, আব্বাসউদ্দিন : মানুষ ও শিল্পী

১. "... সিরাজী সাহেবের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় সিরাজগঞ্জের স্টিমারে। প্রথম শ্রেণীর আসনে তিনি বসিয়াছিলেন। হাতে একখানা ভারতবর্ষ কিংবা প্রবাসী। আমার আশে-পাশের লোকজন বলাবলি করিতেছিল, ‘ওই যে সিরাজী।’ সিরাজী নাম ইহার পূর্বে বহুবার শুনিয়াছি। তাহার রচিত ‘স্পেনে মুসলিম সভ্যতা’ পুস্তকের কঠিন কঠিন লাইনগুলি মুখস্থ করিয়া আমরা বিশুদ্ধ বাংলা আয়ত্ত করিতে শিখিতাম। লোকে বলিত, ‘সিরাজীর বক্তৃতায় অনল বর্ষণ করে।’ ইতালির সঙ্গে তুরস্কের যুদ্ধ বাঁধিলে, এই বীর বিক্রম সিরাজী সাহেবই বাংলা দেশ হইতে তুরস্কে গমন করিয়া সেখানকার মুসলিম ভাইদের হইয়া যুদ্ধ করিতে গিয়াছিলেন। আমার সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। আমি দুই নয়ন ভরিয়া সেই মহা মহিমের প্রতিমূর্তি দর্শন করিতে লাগিলাম। মোঘল আমলের যেন কোনো শাহান শাহ অতীত ইতিহাসের কক্ষ হইতে বিচ্যুত হইয়া পথ ভুলিয়া এখানে আসিয়া বসিয়া আছেন। তাহার সমস্ত অঙ্গ হইতে জ্যোতির্ময় রূপ ঠিকরিয়া পড়িতেছিল। নিকটে যাইয়া সালাম করিতে পারিলাম না। তখন কেইবা আমাকে চেনে। সামান্য কিছু কবিতা প্রকাশিত হইয়াছে। দূর হইতে মনে মনে তাহাকে সালাম জানাইলাম।

শ্রদ্ধাস্পদ দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ের অনুগ্রহে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ হইতে গ্রাম্য গান সংগ্রহের জন্য আমি প্রায়ই ময়মনসিংহ যাইতাম। একবার ময়মনসিংহ যাইবার পথে সিরাজগঞ্জে নামিয়া সন্ধ্যাবেলায় সিরাজী সাহেবের বাড়িতে অতিথি হইলাম। তখনও আমার কবিখ্যাতি হয় নাই। কিন্তু সিরাজী সাহেব খুব আন্তরিকতার সঙ্গে আমাকে গ্রহণ করিলেন। তাহার ব্যবহারে আর কথাবার্তায় মনে হইল, বহুকালের সঞ্চিত কতই না স্নেহমমতা এই লোকটির হৃদয়ে আমার জন্য জমা হইয়া আছে। আমার সঙ্গে ‘ময়মনসিংহ গীতিকার’র একখন্ড পুস্তক ছিল। পরদিন সকালের গাড়িতে আমি বই লইয়া চলিয়া যাইব। সেই জন্য সারারাত্র জাগিয়া সিরাজী সাহেব সেই বহু পৃষ্ঠাব্যাপী পুস্তকখানা পড়িয়া শেষ করিলেন। রাত্রি সাড়ে চারিটা বাজিতেই তিনি অমাকে ঘুম হইতে জাগাইয়া বইখানা ফেরত দিয়া গেলেন। বিস্ময়ে চাহিয়া দেখিলাম, পুস্তকের করুণরসাত্মক বহু স্থান সিরাজী সাহেবের অশ্রুজলে সিক্ত হইয়া আছে। আমি গ্রাম্য-গান সংগ্রহ করিতেছি বলিয়া সিরাজী সাহেব আমাকে খুব উৎসাহ দিলেন। আমাকে গ্রাম্য গান সংগ্রহের কাজে সাহায্য করিবার জন্য তিনি ময়মসিংহের কয়েকজন ভদ্রলোকের কাছে পরিচয়-পত্রও লিখিয়া দিলেন।

আমাদের ফরিদপুরে প্রতি বৎসর ‘ফাতেহায়ে দোয়ায-দাহম’ উপলক্ষে বিরাট সভার অধিবেশন হইত। একবার সিরাজী সাহেবকেও এই সভায় দাওয়াত দেওয়া হয়। সিরাজী সাহেব ফরিদপুরে আসিয়া আমাকে খোঁজ করেন। খবর পাইয়া তাহার সাথে দেখা করিতে গেলাম। তখন আমার ‘কবর’ কবিতা ছাপা হইয়াছে। বাহিরে কিঞ্চিৎ কবি-খ্যাতিও লাভ করিয়াছি। দেখা হইতেই আমাকে সস্নেহে আলিঙ্গন করিলেন। তারপর কিছু মিষ্টি অনাইয়া নিজের হাতে মুখে তুলিয়া দিয়া আমাকে খাওয়াইলেন। অত আদর আর জীবনে কাহারও কাছে পাই নাই। তিনি নিজে বহু কবিতা লিখিয়াছেন। সেগুলি নবীন সেন ও হেমচন্দ্র প্রভৃতি কবির রচনার মতো প্রাচীনপন্থী। আমার কবিতার মিল ও প্রকাশ ভঙ্গি রবীন্দ্রোত্তর যুগের। সেই হিসাবে আমার কবিতা সিরাজী সাহেবের সহজে ভালো লাগিবার কথা নয়। কিন্তু নিজের গন্ডিকে অতিক্রম করিয়া অপরের রচনাকে উপভোগ করার ক্ষমতা সিরাজী সাহেবের ছিল। সেই জন্য তিনি প্রাচীন হইলেও তরুণ সাহিত্যিকদের রচনার প্রতি বিশেষ লক্ষ রাখিতেন। কলিকাতায় যখন কবি নজরুলের অভ্যর্থনা হয়, সেই সময় সিরাজী সাহেব অসুস্থ ছিলেন এবং নানারূপ অর্থ-কষ্টে কাল কাটাইতেছিলেন।

হঠাৎ সওগাত অফিসে দশ টাকার একটি মনিঅর্ডার আসিল, তাহার কুপনে সিরাজী সাহেব লিখিয়াছেন, ‘নানা অর্থ-কষ্টের ভিতরে ইহার অধিক আমি কবির সম্মানের জন্য পাঠাতে পারলাম না। আমার যদি ক্ষমতা থাকত তবে সোনার মুকুট দিয়ে আমি এই কবিকে তার সাহিত্য সিংহাসনে বসিয়ে দিতাম। রোগশয্যায় পড়ে আছি নতুবা কবির সম্মান-উৎসবে নিজে গিয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতাম।’ এ যুগের লেখকদের প্রতি সিরাজী সাহেবের এতটা শ্রদ্ধা ছিল। তিনি আমাকে কাছে বসাইয়া আমার লেখার উচ্ছসিত প্রশংসা করিলেন। তিনি বলিলেন, ‘আমরা যখন সাহিত্য আরম্ভ করেছিলাম্, তখন সমস্ত দেশ অন্ধকারে আবৃত ছিল। সেই অন্ধকার দেশের এক কোণ হতে আর এক কোণে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াতাম। চিৎকার করে ডাক দিতাম। অনাগত যুগের সিংহাসন খালি আছে। যশের সিংহাসন, ইতিহাস রচনার সিংহাসন, কে এসে সেই সিংহাসনে আরোহন করবে? আজ তোমাদের সাহিত্য সাধনা দেখে মনে সন্দেহ জাগে হয়তো তোমাদের ভেতর হতেই কেউ আমার সেই ডাক শুনতে পেয়েছে। তোমাদের কাছে পেলে তাই বড় আনন্দ পাই।’ সিরাজী সাহেবের নিকট হইতে বিদায় লইয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম।

সারাপথ তার সেই মধুর ব্যবহার যেন লুবানের সুগন্ধের মতো আমার আকাশ-বাতাস সুবাসিত করিয়া তুলিতেছিল। বাড়িতে আসিয়া ‘আল-ইসলাম’ পত্রিকার পাতাগুলি উল্টাইতেছিলাম। একটি প্রবন্ধ পড়িয়া স্তম্ভিত হইলাম। সিরাজী সাহেবের লেখা প্রবন্ধ, ‘বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য সাধনা’। তাহাতে সিরাজী সাহেব লিখিতেছেন, ‘অধুনা ন্যুন পক্ষে আমাদের সমাজে সার্ধ ডজনেরও বেশি গ্র্যাজুয়েটের উদয় হইয়াছে। ইহারা কি শুধু চাকুরি করিয়া আর ঘুমাইয়া সময় কাটান? অবসর সময়ে কিঞ্চিৎ সাহিত্য-সাধনা করিলে জাতির কত উপকার হয়। তাহারা নানা ভাষা হইতে জ্ঞান আহরণ করিয়া আমাদের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করিতে পারেন।’ সিরাজী সাহেবের এই শুভ ইচ্ছার মধ্যে হয়তো কিঞ্চিৎ ফাঁক রহিয়াছে। গ্র্যাজুয়েট হইলেই সাহিত্যরচনা করা যায় না। কিন্তু একথা ভাবিলে কৃতজ্ঞতায়, শ্রদ্ধায় দুই নয়ন হইতে অশ্র গড়াইয়া পড়ে, বাঙালি মুসলমানের প্রতি কোন শুভ কামনা বুকে লইয়া এই মহান পাগল ঘুমন্ত সমাজের দুয়ারে দুয়ারে জাগরণীর গান গাহিয়া ফিরিয়াছেন। সেই সার্ধ ডজন গ্র্যাজুয়েট সম্বল করিয়া এই সমাজে বিরাট সাহিত্য সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন। বিকাল বেলায় জুবিলী পুকুরের ময়দানে সভা আরম্ভ হইল।

শহরের চারিপাশ হইতে সহস্র সহস্র লোক সিরাজী সাহেবের বক্তৃতা শুনিতে আসিয়াছে। ইতিপূর্বে ফরিদপুরের কোনো সভায় এত লোকের সমাগম দেখা যায় নাই। মুহুর্মুহু আল্লাহু আকবর ধ্বনি ও করতালির মধ্যে সিরাজী সাহেব দন্ডায়মান হইয়া তাহার বক্তৃতা আরম্ভ করিলেন। তখনকার দিনে সভা-সমিতিতে ‘মাইক্রোফোনের’প্রচলন হয় নাই। কিন্তু সিরাজী সাহেবের কন্ঠস্বর সেই বিরাট জনতার সকলেই শ্রবণ করিতে পারিতেছিল। সে কি বক্তৃতা শুনিলাম, না মহাসমুদ্রের কল-গর্জন শুনিলাম। সেই মহাসমুদ্রের তরঙ্গে তরঙ্গে চতুর্দিকের সমবেত জনতা যেন কি এক মহান ভাবে উদ্বেলিত হইয়া উঠিতেছিল। তিনি যখন বাঙালি মুসলমান সমাজের যাহা কিছু অসত্য, যাহা কিছু মিথ্যা সংস্কারের কুহকাচ্ছন্ন, তাহার বিরুদ্ধে সমালোচনা করিতেছিলেন, তাহার মুখ হইতে যেন যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি শিখা উদ্গিরণ করিতেছিল। মনে হইল বক্তা যেন ঝড়ের উপর সোয়ার হইয়া তাহার খুশি মতো যাহা কিছু ভাঙ্গিয়া, যাহা কিছু চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া চলিয়াছেন। চারিধারের শ্রোতারা যেন তৃণখন্ডের মতো তার সেই গতির দাপটে ছিটকাইয়া পড়িয়া খন্ডিত-বিখন্ডিত হইয়া আবার সেই দুর্বার কথাতরঙ্গের মধ্যে নিজেকে বিলীন করিয়া দিতেছিলেন। মনে হইল, জনগণ যেন তার হাতের ক্রীড়নকের মতো, সেই ক্রীড়নককে স্বেচ্ছায় যে কোনো অবস্থায় তিনি নিয়ন্ত্রিত করিতেছিলেন।

সেই জন্য সিরাজী সাহেবের সভায় কেহ তাহার কোনো মতের প্রতিবাদ করিতে সাহসী হইতেন না। সিরাজী সাহেব বন্ধুবর লাল মিঞা সাহেবের বাসায় উঠিয়াছিলেন। সভা শেষ হইয়া গেলে তিনি আমাকে সঙ্গে করিয়া সেখানে লইয়া আসিলেন। সারারাত্র তিনি ঘুমাইলেন না। আমাদের কাছে তাহার বিগত জীবনের কাহিনী বলিয়া রাত্রি ভোর করিলেন। মানিকগঞ্জের অঞ্চলে মহাজন সম্প্রদায়ের লোকেরা নানা ছল-ছুতায় গ্রামের চাষিদিগকে উচ্চ হারের সুদে টাকা-পয়্সা ধার দিয়া পরিণামে তাহাদিগকে সর্বনাশের পথে টানিয়া লইয়া যাইত। সিরাজী সাহেব মানিকগঞ্জে যাইয়া চাষি সম্প্রদায়কে একতাবদ্ধ হইযা এই মহাজনদিগকে বয়কট করিতে উপদেশ প্রদান করেন। এই উপলক্ষে তিনি গ্রাম্যভাষায় ‘সাহা-ধ্বংসী ফতোয়া’ নামে একটি কবিতা রচনা করিয়া গ্রামবাসীদের মধ্যে বিতরণ করেন। সেই কবিতাটি আমাকে পড়িয়া শুনাইলেন। তাহা আমার খুব ভালো লাগিয়াছিল। সিরাজি সাহেবের মৃত্যুর পর তাহার পুত্রের নিকট সেই কবিতাটির সন্ধান করিয়াছিলাম। কিন্তু তিনি তাহার কোনো খোঁজ দিতে পারিলেন না। মানিকগঞ্জ এলাকায় এই মহাজন বয়কট আন্দোলন প্রায় চার-পাঁচ বৎসর চলিয়াছিল।

দেশের নেতারা কেহ এই আন্দোলনকে সমর্থন না করায় পরে উহা থামিয়া যায়। আজ আমরা ‘মহাজনী আইন’ প্রণয়ন করিয়া গর্ব অনুভব করি, কিন্তু এই মহাপ্রাণ নেতা কত বৎসর পূর্বে সেই হীন-প্রাণ মহাজনদের বিরুদ্ধে তাহার সর্বশক্তি লইয়া দন্ডায়মান হইয়াছিলেন। সারারাত্র ভরিয়া তিনি আরও কত গল্প করিলেন। দেশের কত কত জায়গায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন; গরিব ছাত্রদের বাসস্থান নির্মাণ করিয়া দিয়াছিলেন; তাহার কাহিনী সবিস্তারে বলিলেন। সকাল বেলা সিরাজী সাহেবের নিকট হইতে বিদায় লইয়া বাড়ি ফিরিবার সময় তিনি আমার হাত ধরিয়া বলিলেন, ‘জসীম! তুমি তো কবি! কবিরা নাকি দেশের দূর-ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। বলতে পার আমার এই আজন্ম সাধনা কি একদিন সফল হবে? আমি তো নিজের জন্য সম্মান চাইনে, অর্থ-সম্পদ চাইনে। আমি চাই এই ঘুমন্ত জাত আবার মাথা নাড়া দিয়ে জেগে উঠুক - সিংহ গর্জনে হুঙ্কার দিয়ে উঠুক। আমি চাই এমনই একটি মুস্লিম সমাজ, যারা বিদ্যায়, সাহিত্যে, সাহসে, আত্মত্যাগে কারও চাইতে পিছপা হবে না। যা কিছু মিথ্যা, যা কিছু অন্ধ কুসংস্কার তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।

দেশের মেয়েদের পরদায় আবদ্ধ রেখে তাদের কাছ থেকে দুনিয়ার আলো বাতাস বন্ধ করে রাখবে না - স্বাধীন সজীব একটি মুসলিম জাতি। বল তো জসীম, এ কি আমি দেখে যেতে পারব?’ আমি বলিলাম, ‘আপনি আজীবন সাধনা করেছেন আমাদের জন্যে। আমাদের অনাগত জীবনের সাধনা দিয়ে আপনার সেই স্বপ্নকে আমরা রূপ দেব। নিশ্চয় আপনার স্বপ্ন সার্থক হবে।’ শুনিয়া তিনি বড় খুশি হইলেন। তিনি আমাকে বলিলেন, ‘সেই আমার একমাত্র সান্তনা। আজও যে এই বৃদ্ধ বয়সে চারণের বেশে বাংলার প্রান্তে প্রান্তে জাগরণের বাণী প্রচার করে ফিরছি, সে তোমাদের মুখের দিকে চেয়ে।’ সিরাজী সাহেবের নিকট হইতে বিদায় লইয়া আসিলাম। সারাপথ আমার কেবলই মনে হইতেছিল, বাঙালি মুসলমান জাতির সেই মহান দরবেশ সমস্ত দেশের উপর দিয়া যেন ‘এসমে আজম’ পাঠ করিয়া চলিয়াছেন, তাহার পদাঘাতে গ্রামে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হইতেছে, ছাত্রাবাস তৈরি হইতেছে, গ্রন্থাগার তৈরি হইতেছে। ছাত্র দলের কলকাকলিতে তাহার সমস্ত পথ মুখর। এই ছবি আজও আমার অন্তর হইতে বিলীন হয় নাই।

শেষবার সিরাজী সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা হয় কলিকাতায় মরহুম ওলি আহম্মদ ইসলামাবাদী সাহেবের বাসায়। ওলি আহম্মদ ইসলামাবাদী সাহেবের আর্থিক অবস্থাও তখন খুব খারাপ। সিরাজী সাহেবের অবস্থা তার চাইতেও শোচনীয়। সভা সমিতিতে বক্তৃতা করিয়া যাহা পাইতেন তাহাই ছিল সিরাজী সাহেবের একমাত্র জীবিকা। তাহার অধিকাংশ তিনি গরিব ছাত্রদের দান করিয়া দিতেন। সঞ্চয় করিবার মনোবৃত্তি তাহার ছিল না। ইদানিং কয়েক বৎসর অসুস্থ থাকিয়া সভা-সমিতিতে যোগ দিতে পারেন নাই। যখন স্বাস্থ্য ভালো ছিল তখন দেশের অনেক বড় বড় নেতা সিরাজী সাহেবকে লইয়া কাড়াকাড়ি করিতেন, নিজ নিজ দলের সমর্থনের জন্য। আজ রোগজীর্ণ অবস্থায় তিনি তাহাদের নিকট প্রয়োজনহীন। এই বিশাল কলিকাতায় সিরাজী সাহেবের জন্য তাই আর কোনো আশ্রয় নাই। আজীবনের সহকর্মী ওলি আহম্মদ ইসলামাবাদী সাহেব তার একমাত্র আশ্রয়দাতা। তিনিও আজ সিরাজী সাহেবের মতোই হৃতসর্বস্ব হতমান রোগজীর্ণ। আমাকে কাছে পাইযা সিরাজী সাহেব কতই যে খুশি হইলেন।

তিনি আমাকে কাছে বসাইয়া গায়ে মুখে হাত বুলাইয়া আদর করিতে লাগিলেন। তারপর পকেট হাতড়াইয়া বিষন্ন বদনে বলিলেন, ‘জসীমের মুখে যে একটু মিষ্টি তুলে দেব, একটা পয়সাও পকেটে নেই।’ সামনেই ম্লানমুখে ওলি আহম্মদ সাহেব বসিয়াছিলেন। তিনি তাহার জামার-পকেট হাতরাইয়া হয়রান হইয়া গেলেন। সিরাজি সাহেব আবার বলিলেন, ‘কেউ কি দুটো পয়সা আনতে পারে না কোথা থেকে?’ আমি আমার পকেটে হাত দিতেছি, সিরাজী সাহেব আমার হাত থাপা দিয়া ধরিয়া ফেলিলেন। সামনে একটি যুবক বসিয়া ছিল। সে একটি এক আনি সিরাজী সাহেবের হাতে দিল। সেই এক আনা দিয়া একটি রসগোল্লা কিনাইয়া তিনি মায়ের মতো মমতায় আমার মুখে পুরিয়া দিলেন। তিনি আমাকে বলিলেন, ‘এই হয়তো আমাদের শেষ দেখা কিনা আল্লাহ বলতে পারেন। যদি আর দেখা নাও হয় তবে মনে রেখো আমার কথা! মনে রেখো, তোমাদের আসার বহুকাল আগে থেকে সঞ্চিত করে রেখেছিলাম স্নেহ মমতার আবেহায়াত আমার বুকে। তোমাদের কালে যারা আসবে, তাদের দেখে যেতে পারলাম না। তাদের কাছেও বলো আমার কথা।’

সিরাজী সাহেবের নিকট হইতে বিদায় লইয়া চলিয়া আসিলাম। কি এক দু:সহ বিষাদে সমস্ত অন্তর ভরিয়া রহিল। এই বিশাল মহীরুহ একদিন কত ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়াছেন। রাজ-ভয়, সমাজ-ভয়, আর্থিক দূর্গতির ভয়, সকল ভয়কে তিনি তৃণের মতো তুচ্ছ মনে করিয়া আপনার গতি-পথে ছুটিয়া চলিয়াছেন। আজ রোগের শর-শয্যায় আরোহণ করিয়া সেই বিশাল মহীরুহ তার ভগ্ন শাখা-বাহু গুটাইয়া মরনের পথে আগাইয়া চলিয়াছেন। আর্থিক দুর্গতি যদি তাহার না থাকিত, যদি ভালোমতো চিকিৎসার ব্যবস্থা হইত, তবে এই জাতির মহান পিতাকে হয়তো আরও কিছুদিন বাঁচাইয়া রাখা যাইত। মরাকে বাঁচাইবার জন্য যাহারা চেষ্টা করেন, তাহাদের বুঝি এমনই করিয়া তিলে তিলে নিজেকে দান করিতে হয়।

ইহার কিছুদিন পরেই খবর পাইলাম্, সিরাজী সাহেবের মৃত্যু হইয়াছে। সিরাজী সাহেবের পুত্র সোদরপ্রতিম আসাদুদ্দৌলার সঙ্গে একদিন আলাপ হইল। অশ্রুসিক্ত নয়নে আসাদ বলিল, ‘বাপজানের এন্তেকালের পর আমাদের ঘরে একটি টাকাও ছিল না। বউ-এর গহনা মহাজনের বাড়িতে বন্ধক দিয়ে টাকা এনে বাপজানের শেষ কার্য সমাধা করলাম।’ আজ কান্নায় বুক ফাটিয়া যায় এতবড় সিরাজগঞ্জ শহরে কি একজনও মুসলিম ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিল না, যে আপন ইচ্ছায় আগাইয়া আসিয়া এই কাজে আসাদকে সাহায্য করিতে পারিত।  অথচ এই সিরাজী সাহেবের সাহায্যে বিদ্যাশিক্ষা করিয়া কত লোক সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। জাতির মহান পিতাকে আমরা এইভাবেই সম্মান প্রদর্শন করিয়াছি। খোদা! তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হউক॥"  

উৎসঃ জসীমউদ্দীন / স্মৃতিকথা সমগ্র ॥ [ দে'জ পাবলিশিং - জানুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ২৫৪-২৫৮ ]

২. "... সিরাজগঞ্জের ‘বাণীকুঞ্জ’। এখানেই শুয়ে ‘অনল প্রবাহের’ কবি বিশিষ্ট বাগ্মী ইসমাইল হোসেন সিরাজী। তার ছেলে আসাদুদ্দৌলাহ সিরাজী আব্বার বিশিষ্ট বন্ধু। তাকে নিয়ে তার বলার অনেক কিছু ছিল। বিশেষ করে ১৯৪০-এ সিরাজগঞ্জ কনফারেন্সে সিরাজী ও আব্বাসউদ্দিনের যৌথ সংগীত ও বক্তৃতা সে দিন বাংলার মুসলমান সমাজকে জাগিয়ে তুলেছিল। সিরাজি সাহেব ছিলেন আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ, আব্বার নিকট বন্ধু। তার মতো বাগ্মী বাংলাদেশে আর কেউ ছিল না। ঢাকায় এলে আমাদের বাসাতেই থাকতেন। তার দু:খবহ মৃত্যু আমার কাছে এখনো দু:সহ মনে হয়। বলা বাহুল্য, তিনি ছিলেন প্রকৃত বাঙালি, এবং প্রকৃত মুসলমান। যখনই সিরাজগঞ্জের পাশ দিয়ে আমি যাই গাড়ি থামিয়ে যমুনা নদী গর্ভে তার জন্যে দোয়া করতে থাকি। বাংলার মুসলমান নিশ্চয়ই একদিন তাকে মূল্যায়ন করবে। মা’র লেখা এই প্রবন্ধ তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মূল্যায়ন বলে আমার ধারণা। আমার মা (লুৎফুন্নেসা আব্বাস) তার সম্বন্ধে লিখছেন : সিরাজি সাহেবের বক্তৃতায় উপস্থিত ছিল আগুন ঝরান দেশপ্রেম। তিনি লিখে রাখেন নি, লিখিত কোনো কাগজের পাতায় লিপিবদ্ধ করান নি হয়ত দরকারও মনে করেন নি। তার সাপ্তাহিক একটা কাগজ বের হত ‘দরবার’ নাম দিয়ে, তাতে তিনি লিখতেন। শুধু ভালো কথা বললেই ভালো কাজ হয় না। সেই মানুষটিও ভালো হওয়া চাই। বাজারে ওষুধ পাওয়া যায়, ওষুধ নির্ণয়ের বইও কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু ডাক্তার ছাড়া ঔষধের ব্যবস্থা দিতে কে সাহস করে?

তার সুন্দর কথা আমার কাছে বড় ভালো লাগত। মুখে বলতে তিনি ভালোবাসতেন কিন্তু লিখতে বললেই বলেন কী হবে লিখে। তিনি হচ্ছেন সৈয়দ আসাদুদ্দৌলাহ সিরাজি সাহেব। আমাদের স্বপ্নদ্রষ্টা ইসমাইল হোসেন সিরাজি সাহেবের বড় পুত্র।তিনি বলতেন মহাজীবনের স্মরণ পথের সন্ধান পাই মানুষের স্নেহের ছায়ায়। সংসার তাপ দগ্ধ হলেও শান্তির আশ্রয় ওখানেই। দেশকে ভালো করতে চাও? জাতিকে ভালো করতে চাও? তবে নিজে ভালো হও। নিজেকে ভালো করতে হলে ভালো মানুষের সন্ধান কর। তিনি একজন আদর্শ, আমাদের পরিবারের আপন জন, আমার ক্ষুদ্র আঙ্গিনায় বিচরণ করেছেন অনেকবার। অনেক পুরাতন স্মৃতি - সব সময় ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। আমাদের সিরাজি ভাই বড় মহৎ, দূর থেকে আদর করে, ডাক নাম ধরে গেট থেকে আলেয়া আলেয়া বলে স্নেহের ডাকটি আজও গেটের সামনে শুনতে পাই।

আমার স্বামী তার প্রিয় বন্ধু ছিল। মাসের পর মাস আমাদের বাড়িতে কাটিযে গেছেন। আনন্দের নহর বয়ে গেছে ঘরে। কথায়, সুরে ও বক্তৃতায় সারা রাত দুইজনে দুই খাটে শুয়ে গল্প করতে করতে খাট থেকে লাফিয়ে উঠে। আমি কত দিন ওদের হাসিগল্প শুনে উপর থেকে নেমে আসতাম। আমাকে দেখে ওদের আরো প্রবল হাসি উপচিয়ে পরার উপক্রম। মুক্ত প্রাণের উচ্ছাসে দু’জনে স্বর্গ রচনা করে। ভাই আদেশ করেন, ‘তুমি এসেছ? আমার ক্ষিধা পেয়েছে কিছু খেতে দাও। আব্বাস আমাকে ঘুমাতে দিবে না। এই জন্য কারো বাড়িতে আমার ভালো লাগে না, ওর কাছে ছুটে আসি।’ ভাই আবদার করে আদেশ করেন ‘আলেয়া আলুর চিপ ভাজতে পারবে? বড় খেতে ইচ্ছা হচ্ছে।’ আদরের টানে অত রাতে আলু ভেজে দিয়েছি, মুড়ি মেখে চানাচুর দিয়ে সামনে এগিয়ে দিয়েছি। প্রাণখোলা আদরের আবদার আমাকেও কম আনন্দ দেয় নি। আমার ঘরে ছিল পরম পবিত্রতার সমাবেশ, সিরাজি ভাই বক্তৃতা করে আগুন ঝরান। স্ফুলিঙ্গের মতো গায়ের লোম তাজা হয়ে উঠত। আমি হেসে বলতাম, ‘ভাই, আপনি নজরুল ইসলাম, আব্বাসউদ্দিন তিনজন মিলে যদি দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তবে আমাদের দেশের জাতীয় অধিকার অর্জন করতে বেশি সময় লাগবে না। আপনার বক্তৃতা, নজরুলের ক্ষুরধার গান-আবৃত্তি, আব্বাসের গলায় দরাজ কন্ঠ আর মোহামেডান স্পোর্টিং-এর খেলা মুসলিম জাগরণের জন্য, ভাসানীর দু:খী মানুষের অধিকার। আপনারা হাতিয়ার হিসাবে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। জাগ্রত কবির কবিতা দিয়ে।’ তিনি হেসে বলতেন, ‘তুমি থাকবে আমাদের পাশে?’ ‘অভয় দিলে নিশ্চয় থাকব। আমাদের ঘরের বাঁধন আরো মজবুত হবে, শান্তির পারাবত জয় করে ফিরে আসব আপন গৃহে। আমরা তো তাই চাই।’

দেখতাম তার মনটা বড় উদার। মেয়েদের উৎসাহ উদ্দীপনা জোগাতেন। তিনি বলতেন নারীদের আমরাই তো লাজুক করে ঘরে বেঁধে রেখেছি।শিক্ষার দুয়ার থেকে বঞ্চিত ওদের সাহস জোগাতে হবে। মানসিক পর্দার শালীনতা বজায় রেখে আমাদের পাশে এসে তাদের কর্মকে সফল করে তুলবেন, এটাই তো মানবতার পরিচয়। তিনি ধার্মিক ছিলেন। দেশে দেশে মুরিদান অগণিত। পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর, আসাম সব জায়গা থেকে তিন বছর পর পর সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজির মাজারের পাশে ওরশ হত।ধর্মের আকর্ষন মানুষের হৃদয়কে প্রলুব্ধ করে, সংযম সাধনা শেখায়। আকরাম খাঁর আজাদ পেপার কলকাতায় আমাদের মুখপাত্র। অধিকার আদায় করতে বেশি সময় লাগবে না। মোহামেডান স্পোর্টিং এর খেলা মুসলিম জাগরণ। কবি নজরুল ইসলাম, সুসাহিত্যিক হাতেম আলি নওরোজি, শিল্পী আব্বাসউদ্দিন। বরিশালের সাহিত্যিক ও কলকাতায় মন্ত্রী হাসেম সাহেব তার একখানা ‘গুলিস্তান’ নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হত। বক্তা ছিলেন সৈয়দবদরুদ্দোজা সাহেব। আন্দোলনে অগ্রযাত্রা সুভাষ বোস, আবুল কালাম শামসুদ্দিন্, আবুল মনসুর সাহেব এদের ভূমিকা সারা কলকাতা কলকোলাহলে ব্যস্ত বন্ধু মহল ওদের অধিকারের মুসলিম জাগরণ তন্ময় হয়ে উঠত। আমার বড় আদরণীয় দিন ছিল। অতি তাড়াতাড়ি সুখময় দিনগুলো হারিয়ে গেল সময়ের বিবর্তনে।

মুসলিম লীগের সভাপতি আবুল হাসেম সাহেব, সুবক্তা সৈয়দ বদরুদ্দোজা এরা আন্দোলনে সত্যের ধ্বজা।সিরাজি সাহেব ব্যস্ত সময়গুলো আমার বেশ মনে পড়ে। কিছু বুঝতাম না তবু মনে হয় ব্রিটিশ আমাদের হাতে শিকল পরিয়েছে। তারি অত্যাচারে বাংলাদেশের মানুষ দিশেহারা। এর প্রতিকার কোথায়? ১৯৪৬-এ একবার সিরাজি সাহেব রংপুর জেলার রসুলপুরে কনফারেন্স করতে গিয়েছিলেন। সেখানে সিরাজি সাহেব, আব্বাসউদ্দিন, বেদারউদ্দিন আরো অনেকে। যাবার পথে বিরাট এক খালের মধ্যে মটরকার ৪০/৫০ হাত গর্তে পড়ে সবাই গুরুতর আহত হলেন এবং হাসপাতালে পড়ে রইলেন। আব্বাস সাহেব মেরুদন্ডে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে হাসপাতালে পড়ে রইলেন। হাসপাতালে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম। আহত অবস্থায় সিরাজি সাহেব নিজেকে সামলিয়ে, মাথায় রক্তঝরা ব্যান্ডেজ পরা সেই অবস্থায় বক্তৃতায় শরিক হয়ে মানুষকে সান্তনা দিলেন। তিনি ব্যাথার দিকে না তাকিযে এতগুলো লোক যোগদান করে নিরাশ হয়ে ফিরে যাবে তা হতে দিলেন না। রংপুর হাসপাতালে ২২/২৫ জন সবাই ভর্তি হয়ে পড়ে রইলেন এক সপ্তাহ। সেই থেকে আব্বাস সাহেবের মেরুদন্ড আঘাতের অসুখটা অবনতির দিকে যায়। অবহেলা করে ভিতরের স্পাইনাল কর্ড শুকিয়ে যায়। মারাত্মক অসুখ অবহেলা করে অতি তাড়াতাড়ি জীবন হারিয়ে গেল।

সে যুগে নাসিরউদ্দিন সাহেব সাপ্তাহিক ‘সওগাত’ পেপারে তুলে ধরেছেন মুসলিম জাগরণ। আমি তখন নেহাৎ ঘরের বৌ কলকাতা এসেছি। নতুন সংসার সাজাতে। চারপাশে তাকিয়ে মনের আশা আকাঙ্খা স্বামীর অন্তরে সাজিয়ে দিতাম হেসে-খেলে। আমার আকুল আবদার কলকাতায় পূরণ হযেছে। মনটা বিরাট বড়, ধর্মের গোঁড়ামী ছিল না। বড় মনের অধিকারী ছিল। সামাজিক গোঁড়ামী পছন্দ করে নি কিন্তু তার বিরুদ্ধেও কোনো দিন প্রতিবাদ কারও সাথে করে নি। একবার শ্রদ্ধেয় ড. মো: শহীদুল্লাহ সাহেব ফাংশানে বক্তৃতা দিতে এসেছেন। সেই মজলিশে আব্বাস সাহেবও গান গাইতে আমন্ত্রণ পেয়েছেন।শহীদুল্লাহ সাহেব গান শুনবেন না। তাড়াতাড়ি তিনি এ সুরের স্থান থেকে বেরিয়ে গেলেন। আব্বাস সাহেব লক্ষ করলেন, কিন্তু কোনদিন কিছু বলেন নি। এরপর ইসলামিক গান যখন তাকে শুনিয়েছেন, অবাক হয়ে শুনেছেন। বাংলা গানের এত মধু। তারপর হয়ত তিনি দূরে থাকেন নি। কিন্তু বাজনাকে পছন্দ করতেন না। তিনি শরিয়তের বাইরে মনে করতেন। বিরাট পন্ডিত মানুষ। আমাদের বাংলাদেশের আদরণীয়। সম্মানী মানুষ হারিয়ে যায় কেন? এদের হাত প্রসারিত করে দেশ গড়ে উঠবে, সেই সাধনায় তৈরি হয়েছিল কিছু ত্যাগের মহিমায়।

ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। ইসমাইল হোসেন সিরাজি সাহেবের ভাই ইসহাক হোসেন সিরাজি ডোমার বালিকা স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন। তার কাছে আমার প্রথম শিক্ষা। তার মা খুব সুন্দর দেখতে। আমাদের সেলাই মাস্টার ছিলেন। আমরা তাকে গুরু মা বলে ডাকতাম। আমাদের ভীষন আদর করতেন। ত্খন বুঝতে পারিনি এরা একটি আদর্শ পরিবার। সিরাজি ভাইয়ের কাছে তার বাবার সুনাম শুনেছি অনেক। কিন্তু জীবনে জ্ঞান পরিধি আমার প্রসার ছিল না বলে উপলব্ধি করতে দেরি হল। সিরাজি সাহেবের বাবা মুসলিম জাগরণের জন্য জেল খেটেছেন। তুরস্ক ভ্রমণ করে কামাল পাশার সাহচর্যে দেশের অধিকার অর্জন করার প্রেরণা তার মধ্যে জাগরূক ছিল। অনেক বই লিখেছেন। ‘অনল প্রবাহ’ পড়েছি, সত্যের সন্ধানে নিজের আত্মাকে আগুনে পুড়ে ধুয়ে মুছে উঠতে পারে নি। সে সময় ব্রিটিশ আমাদের সর্বস্ব লুন্ঠন করে, কারাগারে পুড়িয়েছিল বুদ্ধিজীবী মানুষকে। তার বেদনা দেশের প্রতিটি মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সোচ্চার। এমন কি যাবার আগে সামান্য দেশ ভাগ করে দিয়ে নিষ্কৃতি পেয়েছে। এদেরকে ক্ষমার চোখে দেখা যায় না। সামান্য দেশ আমাদের ভাগ্যে একটা অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে।

একবার তিনি কুচবিহার গিয়েছিলেন। আমার বাড়িতে মেহমান। রাত্রে বড় বারান্দায় বিছানা পেতে দেয়া হল, কিন্তু মশারী মাত্র একখানা, প্রচুর মশা। উপায় নেই কিছু করার। ড্রইংরুম খুলে দিলাম, রাতে গোটা ঘর খোলা। কুচবিহারে চোরের কোন উপদ্রব নেই, বড় শান্তির দেশ। ঘর খোলাই রইল। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে মশারী ছাড়া। আমি আধা রাতে উঠে দেখি আলাদা আলাদা সবার মশারী খাটান; আমি অবাক হয়ে চেয়ে দেখি সবাই ঘুমে। কিছুক্ষণ পরে আবার দেখতে গেলাম আমার চোখের ধাঁ ধাঁ নাকি। দেখি সত্যি মশারী খাটান। ঘরে ফিরে অবাক হয়ে ভাবছি। সিরাজি ভাইয়ের আধ্যাত্মিক কোনো পাওয়ার আছে। নিশ্চয় অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণ পেতাম। যাই হোক পরের দিন সাহেবকে বললাম, ভাইকে বলেছে, তিনি হেসে উড়িয়ে দিলেন ওটা তোমার চোখে দেখার ভুল। শ্রদ্ধা আমার আরও বেড়ে গেল তার উপর। গোসল করতে গেলে পুরো এক ঘন্টা সময় লাগে। ধোয়া নতুন কাপড় পরা তার অভ্যাস। প্রত্যেক দিন এক শিশি আতর তার সর্ব শরীর ও কাপড় চোপড় সুগন্ধে ভরে রাখতেন। বলতেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মানুষের অন্তরের পরিচয়।

রংপুরের লাল আলুর ভর্তা আর বড় কই মাছ খুব পছন্দ করতেন। প্রত্যেক দিন দুই বেলাতেই আলু ভর্তা চাই। আলু চিপস্, চিড়া ভাজা ও শাক পছন্দ। মানুষকে খুব ভালোবাসতেন। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে তার কোনো পার্থক্য ছিল না। তিনি বলতেন শরীর কাটলে একই রকম রক্ত বের হবে। আলাদা কিছু নয়, এটাও সংস্কার। জীবনে চলার পথে অধিকার অর্জন করা মানুষ তো ক্ষণিকের জন্য আসে পৃথিবীতে আবার ফিরে যাবে কিছু সুগন্ধ ছড়িয়ে। নয়ত ভুল পথে অগ্রসর। নিয়তির পরিবর্তন পৃথিবীর আদান প্রদান। মানুষের ভোগ, ভালোবাসা শিক্ষায়্-দিক্ষায়, ধর্মে ইসলামের পতাকা বড় উদার শান্তির। এর মাঝে কোনো সংকীর্ণতা নেই। মানুষকে আলাদা করে দেখে না। তাই তিনি হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সবাইকে ভালোবাসতেন। তার বাড়িতে রায়টের সময় হিন্দু এবং বিহারীদের আশ্রয় দিয়েছিলেন তাই তার জীবন বিপন্ন হয়েছিল। তাকে কষ্ট দেয়া হয়েছিল। তার লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যারা দানশীল তাদের পৃথিবী সহ্য করতে পারে না। বাণীকুঞ্জ একদিন ইতিহাস প্রসিদ্ধ হয়ে উঠবে। সময়ের ব্যতিক্রম। তার আদর্শ বড় উন্নত। উজানউদ্দিন সাহেব লেখক ওনার বোনের জামাই সাহিত্যিক ছিলেন। 

আমার বাড়িতে মাঝে মাঝে একবার সাহিত্য আসর, গানের আসর, কবিতার আসর জমে উঠত। তখন কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে নি, আমার ঘরে বড় বড় সাহিত্য সমাজসেবী, শিল্পী, লেখক, লেখিকার পদার্পণ ঘটেছে। সৈয়দ আলি আহসান, সৈয়দ আলি আশরাফ দুই ভাই আচকান টুপি পরা ইসলামিক মনোভাবাপন্ন কবিতায় বেশ পারদর্শী ছিল। আমার বেশ মনে পড়ে তাদের কথা। কাজী মোতাহার হোসেন আসতেন অতিথি হিসেবে। বড় মধুর বড় ব্যাথার সাহিত্যে রসে ভরে থাকত আমার ঘরখানা।

সাংবাদিক আসাফুদ্দৌলা তার বোনের ছেলে এবং মেয়ের জামাই, ওরা সবাই খুব সাহিত্যমনা পরিবার সাংবাদিক। তেজদ্দীপ্ত ব্যবহার, ব্যক্তিত্ব কর্ম সংবাদের মাধ্যমে। তার মা ছিলেন তেজস্বী লেখিকা, অন্ধকার যুগে গৃহকোণে চাপা পড়ে গেছে। হয়ত একদিন ইতিহাস কথা বলবে। ওনার বড় মেয়ে গুলরুখ মহল ঝর্ণা তেজদীপ্ত। বি. এ. পাস করে লীগের ফরে কাজ করে যাচ্ছে। ইলেকশনে দাঁড়িয়ে ছিল কনটেস্ট করতে পারেনি। চোখেমুখে আগুনের ছাপ। দাদা বাবার মতো বক্তৃতা, আচরণে।

স্বামী আসাফুদ্দৌলা রেজা ইত্তেফাকের সাংবাদিক। তার মা ছিলেন তেজস্বী লেখিকা। সেযুগের অন্ধকার গৃহকোণে চাপা পড়ে আছে। জ্ঞান আর বুদ্ধি হারিয়ে যায় না। হয়ত ইতিহাস কথা বলবে। একটা প্রেম আমরা পেয়েছি দেশপ্রেম, রাহুমুক্ত বাংলাদেশ। যত ছোট হোক বাঙালির মুক্ত পতাকা দশ কোটি মানুষের প্রাণ বন্যা। বাংলার স্বাধীন সত্ত্বা। নিয়ে চলবে, কথা বলবে, লিখতে পড়তে লেখক সমাজ শেখ মুজিবকে ভুলবে না ইতিহাস। জীবনের কথা বড় মূল্যবান। আসাদুদ্দৌলাহ সিরাজির মরণ বীরের মতো। তারা হারিয়ে যায় না রেখে যায় অমর কীর্তি। তার লাশ পাওয়া যায় নি। দেহ একটা আত্মাকে বহন করে। কিন্তু আত্মার মরণ নেই। সিরাজগঞ্জ তার বাড়ি, ‘বাণীকুঞ্জ্’ আবাস স্থান সেখানে দাঁড়িয়ে আছে দু’টি কবর। ইসমাইল হোসেন সিরাজি, আসাদুদ্দৌলাহ সিরাজি, পাশাপাশি এদের দেশপ্রেম নিশ্চয় কথা বলবে। আত্মা জাগরূক অধিকারের স্বপ্ন॥"

উৎস : মুস্তফা জামান আব্বাসী / আব্বাসউদ্দিন : মানুষ ও শিল্পী ॥ [ অনন্যা - ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ । পৃ: ২৩৪-২৩৮ ]

COMMENTS

BLOGGER
Name

আন্তর্জাতিক,2,ইতিহাস,4,ইসলাম ধর্ম,1,ইসলামের ইতিহাস,4,কোরআন ও বিজ্ঞান,2,নবী ও রাসুল,1,নাস্তিক্যবাদ,2,পাকিস্তান অধ্যায়,3,প্রতিবেশী ভূ-রাজনীতি,1,বাংলা সাহিত্য,1,বাংলাদেশ অধ্যায়,2,বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব,1,ভাষা আন্দোলন,6,ভাষা ও সংস্কৃতি,1,মতামত,3,মুক্তিযুদ্ধ,5,মুসলিম বিজ্ঞানী,1,মুসলিম শাসনকাল,5,রাজনীতি,9,রাজনীতিবিদ,8,রাষ্ট্র ও প্রসাশন,2,লেখক ও সাহিত্যিক,1,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,2,শিক্ষা ব্যবস্থা,4,সাম্প্রদায়িকতা,1,সাহাবীদের জীবনী,2,সাহিত্য ও সংস্কৃতি,3,
ltr
item
iTech: পিতা ও পুএ : দুই সিরাজীর স্মৃতি
পিতা ও পুএ : দুই সিরাজীর স্মৃতি
স্পেনে মুসলিম সভ্যতা, দীনেশচন্দ্র সেন, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, সিরাজী সাহেব, ফাতেহায়ে দোয়ায-দাহম, জসীমউদ্দীন, মুস্তফা জামান আব্বাসী, আব্বাসউদ্দিন : মানুষ ও শিল্পী
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgOEIA_ZmhJN3i7d-GvD_SOD_2psBueCBtjkmIr89aJxUR0SsU8Rud-eOXDZIatcrIDHOlh8zmva3vWdKKEzvKBt2PPE__XvpEBxKe7Ehks-Zvjg8YQlVM65aL5Aeyg4ob10Px5NfbAE9r2/s320/grf.jpg
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgOEIA_ZmhJN3i7d-GvD_SOD_2psBueCBtjkmIr89aJxUR0SsU8Rud-eOXDZIatcrIDHOlh8zmva3vWdKKEzvKBt2PPE__XvpEBxKe7Ehks-Zvjg8YQlVM65aL5Aeyg4ob10Px5NfbAE9r2/s72-c/grf.jpg
iTech
https://qtechmedia.blogspot.com/2017/04/blog-post_89.html
https://qtechmedia.blogspot.com/
https://qtechmedia.blogspot.com/
https://qtechmedia.blogspot.com/2017/04/blog-post_89.html
true
5233664077611017960
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy Table of Content