প্রিয় রাজাকার : শাহ্ আজিজুর রহমান। একমাত্র শাহ আজিজুর রহমান সাহেবই ঢাকায় আনোয়ার সাহেবের দলে ছিলেন। শাহ সাহেব চমৎকার বক্তৃতা করতে পারতেন। বগুড়ায় তাঁকে আমি প্রথম দেখি।
১. "... ১৯৪৪ সালে ছাত্রলীগের এক বাৎসরিক সম্মেলন হবে ঠিক হল। বহুদিন সম্মেলন হয় না। কলকাতায় আমার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কিছুটা ছিল - বিশেষ করে ইসলামিয়া কলেজে কেউ আমার বিরুদ্ধে কিছুই করতে সাহস পেত না। আমি সমানভাবে মুসলিম লীগ ও ছাত্রলীগে কাজ করতাম। কলকাতায় সম্মেলন হলে কেউ আমাদের দলের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবে না। যাহোক, শহীদ সাহেব (সোহরাওয়ার্দী) আনোয়ার সাহেবকেও ভালবাসতেন। আনোয়ার সাহেব অনেকটা সুস্থ হয়েছেন। ঢাকার ছাত্রলীগ ও আমাদের সাথের কেউ আনোয়ার সাহেবকে দেখতে পারত না। একমাত্র শাহ আজিজুর রহমান সাহেবই ঢাকায় আনোয়ার সাহেবের দলে ছিলেন। শাহ সাহেব চমৎকার বক্তৃতা করতে পারতেন। বগুড়ায় তাঁকে আমি প্রথম দেখি।
... কাউন্সিল সভা যখন শুরু হল, মওলানা আকরাম খাঁ সাহেব কিছু সময় বক্তৃতা করলেন। তারপরই আবুল হাশিম সাহেব সেক্রেটারি হিসাবে বক্তৃতা দিতে উঠলেন। কিছু সময় বক্তৃতা দেওয়ার পরই নাজিমুদ্দীন সাহেবের দলের কয়েকজন তার বক্তৃতার সময় গোলমাল করতে আরম্ভ করলেন। আমরাও তার প্রতিবাদ করলাম, সাথে সাথে গন্ডগোল শুরু হয়ে গেল। সমস্থ যুবক সদস্যই ছিল শহীদ সাহেবের দলে, আমাদের সাথে টিকবে কেমন করে। নাজিমুদ্দীন সাহেবকে কেউ কিছু বলল না। তবে তার দলের সকলেরই কিছু কিছু মারপিট কপালে জুটেছিল। আমি ও আমার বন্দু আজিজ সাহেব দেখলাম, শাহ আজিজুর রহমান সাহেব ছাত্রলীগের ফাইল নিয়ে নাজিমুদ্দীন সাহেবের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি ও আজিজ পরামর্শ করছি শাহ সাহেবের কাছ থেকে এই খাতাগুলি কেড়ে নিতে হবে, আমাদের ছাত্রলীগের কাজে সাহায্য হবে। নাজিমুদ্দীন সাহেব যখন চলে যাচ্ছিলেন, শাহ সাহেবও রওয়ানা করলেন, আজিজ তাকে ধরে ফেলল। আমি খাতাগুলি কেড়ে নিয়ে বললাম, 'কথা বলবেন না, চলে যাবেন'। আজকাল যখন শাহ সাহেবের সাথে কথা হয় ও দেখা হয় তখন সেই কথা মনে করে হাসাহাসি করি। শাহ সাহেব ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং ন্যাশনাল এসেম্বলিতে আওয়ামী লীগ পার্টির নেতা এবং বিরোধী দলের ডেপুটি লিডার হন। তার সাথে আমার মতবিরোধ ১৯৫৮ সালের মার্শাল ল' জারি হওয়া পর্যন্ত চলে।
'নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগে'র নাম বদলিয়ে 'নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ' করা হয়েছে। শাহ আজিজুর রহমান সাহেবই জেনারেল সেক্রেটারি রইলেন। ঢাকায় কাউন্সিল সভা না করে অন্য কোথাও তারা করলেন গোপনে। কার্যকরী কমিটির সদস্য প্রায় অধিকাংশই ছাত্র নয়, ছাত্র রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন। ১৯৪৪ সালে সংগঠনের নির্বাচন হয়েছিল, আর হয় নাই। আমরা ঐ কমিটি মানতে চাইলাম না। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ও জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে বহু ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তারা এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত নয়। আমি ছাত্রলীগ কর্মীদের সাথে আলাপ-আলোচনা শুরু করলাম। আজিজ আহমেদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আবদুল হামিদ চৌধুরী, দবিরুল ইসলাম, নইমউদ্দিন, মোল্লা জালালউদ্দিন, আব্দুর রহমান চৌধুরী, আবদুল মতিন খান চৌধুরী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আরও অনেক ছাত্রনেতা একমত হলেন, আমাদের একটা প্রতিষ্ঠান করা দরকার।
১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি তারিখে ফজলুল হক মুসলিম হলের এসেম্বলি হলে এক সভা ডাকা হল, সেখানে স্থির হল একটা প্রতিষ্ঠান করা হবে। যার নাম হবে 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ'। নইমউদ্দিনকে কনভেনর করা হল। অলি আহাদ এর সভ্য হতে আপত্তি করল। কারণ সে আর সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান করবে না। 'পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ' নাম দিলে সে থাকতে রাজি আছে। আমরা তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম এবং বললাম, 'এখনও সময় আসে নাই। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দেশের আবহাওয়া চিন্তা করতে হবে। নামে কিছুই আসে যায় না। আদর্শ যদি ঠিক থাকে, তবে নাম পরিবর্তন করতে বেশি সময় লাগবে না। কয়েক মাস হল পাকিস্তান পেয়েছি। যে আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তান পেয়েছি, সেই মানসিক অবস্থা থেকে জনগণ ও শিক্ষিত সমাজের মত পরিবর্তন করতে সময় লাগবে'॥"
উৎস : শেখ মুজিবুর রহমান / অসমাপ্ত আত্মজীবনী ॥ [ ইউপিএল - ২০১২ । পৃ: ২৮ / ৪৪ / ৮৮-৮৯ ]
২. "... '৪৭-এর শেষে বা '৪৮ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। তখন পাকিস্তান হয়ে গেছে। সদর ঘাটের বাঁধটা যেখানে, তার পূর্ব দিকে একটা পার্ক ছিল। পার্কটার নাম ছিল লেডিজ পার্ক। ঐ লেডিজ পার্ক ছিল একটা মিটিং প্লেস। মাঝে মাঝে সভা হত ওখানে। ওখানে ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় অবস্থার উপরে আলোচনা করার জন্যে একদিন একটিও মিটিং আহ্বান করে। এই সভায় সরদার ফজলুল করিম ওয়াজ টু প্রিসাইড ওভার দি মিটিং এন্ড মুনীর চৌধুরী ওয়াজ টু স্পিক। অন্য কমিউনিস্ট নেতা যারাই থাকুন না কেন - এই দুই জনই ছিল প্রধান।
আমরা মিটিং শুরু করতে যাবো, তখন দি মিটিং ওয়াজ এটাকড বাই শাহ আজিজুর রহমান গ্রুপ। সুলতান হোসেন খানও আক্রমণকারী গ্রুপের ছিলেন। এই জঙ্গি গ্রুপটা আমাদের মিটিং ভেঙ্গে দিল। লাঠিপেটা করল আমাদের। প্রাণ বাঁচানোর জন্যে আমাদের দৌড়ে পালিয়ে আসতে হল। পালিয়ে আমরা আশ্রয় নিলাম এখন যেটা বার লাইব্রেরি তার উত্তর দিকের একটা দোতলা বিল্ডিং-এ। এটা ছিল ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির অফিস। আমি আর মুনীর ওখানে আশ্রয় নিলাম। শাহ আজিজেরা ওখানে গিয়েও কিছু ইট-পাটকেল ছুঁড়ল আমাদের দিকে। তারপর তারা চলে গেল।
... '৪৬-এ সাম্প্রদায়িক গণহত্যা হলো কলকাতাতে। তার প্রতিক্রিয়ায় ঢাকাতেও শুরু হয়ে যেতে পারত নরমেধযজ্ঞ। কিন্তু তা যে হলো না, সে স্মৃতি আমার সচেতন গৌরবের স্মৃতি। ১৬ আগস্টের খবরে আমরাও কেঁপে উঠেছিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার প্রগতিশীল অংশটি। আমি তখন এম.এ পড়ি এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে বেশ কিছুটা জড়িত হয়েছি। আমরা ১৭ কিংবা ১৮ আগস্ট ঢাকাতে বের করেছিলাম হিন্দু-মুসলিম সম্প্র্দায়ের মধ্যে শান্তি রক্ষার শান্তি মিছিল। সে মিছিলটি স্মরণীয় ছিলো। তার উদ্যোগ এসেছিলো বামপন্থী, সমাজতন্ত্রী মহল থেকে। ঢাকার মুসলিম লীগের প্রগতিশীল কর্মীবৃন্দ যারা বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন, তারাও যুক্ত ছিলেন এই মিছিলে। এ কারণে শাহ আজিজুর রহমান, ফরিদ আহমদ এদের মতো সেদিনকার মুসলিম ছাত্র আন্দোলনের নেতৃস্থানীয়দের পক্ষে এ শান্তি মিছিলের বাইরে থাকা সম্ভব হয় নি।
... শাহ আজিজকে আমি '৪২-'৪৩ সাল থেকে দেখেছি। '৪৬ সালে আমার মনে হয়, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ ক্লাসের ছাত্র ছিলেন। ইংরেজিতে। অবশ্য এর আগে আলীগড়ও হয়ে এসেছেন। তুখোড় বক্তা ছিলেন : ইংরেজি, বাংলা ও উর্দুতে। অবশ্য কারুর মধ্যে এতো বেশি দক্ষতা থাকলে স্বাভাবিকভাবে তার মধ্যে অহমিকা আর দক্ষতার সুবিধাজনক ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি প্রবণতারও প্রকাশ ঘটে। এক্ষেত্রে শাহ সাহেব কোনো ব্যতিক্রম ছিলেন বলে আমার স্মৃতিতে তেমন কোনো ঘটনা নেই। শাহ সাহেবের সঙ্গে বহুদিন ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ ঘটেনি। সাম্প্রতিককালে তিনি 'রাজপুরুষ' অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সরকারি নেতার স্থানেও অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
নিজের বন্ধু-বান্ধব কেউ এমন হলে তখনি আমার বেশি করে সঙ্কোচ জাগে। ব্যবধানটা তখনি বৃদ্ধি পায়। অথচ এটা ঠিক যে, চল্লিশের দশকের ঢাকার কর্মকান্ডে, এর প্রতি-ধারার অন্যতম নেতা হিসেবে শাহ আজিজুর রহমানের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল॥"
উৎস : সরদার ফজলুল করিম / আমি সরদার বলছি ॥ [ অন্বেষা - ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ । পৃ: ৫০ / ১৭৪-১৭৫ ]
৩. "... ১৯৪৮ সালের ৩০শে জুন করনেশন পার্কে যে সভা অনুষ্ঠিত হয় তাতে সভাপতিত্ব করেন শহীদ মুনীর চৌধুরী। সভায় সরদার ফজলুল করিম ও রণেশ দাশগুপ্তের বক্তৃতা দেওয়ার কথা স্থির করা হয়। ফজলুল করিম স্থানীয় সমস্যা ও কর্মসূচীর বিষয়ে বললেন। রণেশ দাশগুপ্ত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা সম্পর্কে বক্তৃতা করলেন। জনসভায় প্রায় হাজার খানেক লোক উপস্থিত ছিল। এই সময় শাহ আজিজুর রহমান তার দলবল নিয়ে সভায় উপস্থিত হন। সরদার ফজলুল করিম তার বক্তৃতা দেওয়ার অল্প কিছুক্ষণ পরেই শাহ আজিজুরের দল সভাপতির কাছে একের পর এক চিরকূট পাঠিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর দাবী করতে থাকেন। মাঝে মাঝে চিৎকার করে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। রণেশ দাশগুপ্ত তার বক্তৃতায় আম্তর্জাতিক পরিস্থিতি ছাড়াও কমনওয়েলথ ছাড়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। উভয় বক্তাই পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচী ব্যাখ্যা করেন। শাহ আজিজের এই গোলমালের পর মুনীর চৌধুরী সাধারণভাবে কিছু বলে সভা ভেঙ্গে দেন। সভা ভঙ্গের বিরুদ্ধে শাহ আজিজের দল প্রতিবাদ করতে থাকেন এবং তাদের বক্তব্য পেশ করার অধিকার দাবী করেন। তারপর কিছু ধাক্কাধাক্কি হয়। এরপর কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা সভাস্থল ত্যাগ করে অফিসের দিকে চলে যান। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা চলে যাবার পরই শাহ আজিজ মাঠ দখল করে কিছুক্ষণ কমিউনিস্ট পার্টিকে গালাগালি করে সভা শেষ করেন।
৩০ শে জুন করনেশন পার্কের সভার পর প্রায় এক হাজার লোক কোর্ট হাউস স্ট্রীটের পার্টি অফিস ঘেরাও করে আক্রমণ চালায়। ফলে তাদের সাথে অফিসের লোকজনদের প্রায় আধ-ঘন্টাব্যাপী তুমুল খন্ডযুদ্ধ হয়। বিনয় বসু, অমূল্য সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, মুনীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম ছাড়াও প্রায় কুড়িজন যুবক তখন অফিসের মধ্যে ছিলেন। সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিরোধের ফলে পার্টি অফিসের মধ্যে গুন্ডারা প্রবেশ করতে পারেনি। সে সময় পার্টিকে বেআইনী করা হয়নি সত্য, কিন্তু নানা প্রকার নির্যাতনের মাধ্যমে পার্টির কাজ কার্যত: অসম্ভব করে তোলা হয়॥"
উৎস : মণি সিংহ / জীবন সংগ্রাম ॥ [ জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী - জুলাই, ১৯৮৩ । পৃ: ১০৭-১০৮ ]
... কাউন্সিল সভা যখন শুরু হল, মওলানা আকরাম খাঁ সাহেব কিছু সময় বক্তৃতা করলেন। তারপরই আবুল হাশিম সাহেব সেক্রেটারি হিসাবে বক্তৃতা দিতে উঠলেন। কিছু সময় বক্তৃতা দেওয়ার পরই নাজিমুদ্দীন সাহেবের দলের কয়েকজন তার বক্তৃতার সময় গোলমাল করতে আরম্ভ করলেন। আমরাও তার প্রতিবাদ করলাম, সাথে সাথে গন্ডগোল শুরু হয়ে গেল। সমস্থ যুবক সদস্যই ছিল শহীদ সাহেবের দলে, আমাদের সাথে টিকবে কেমন করে। নাজিমুদ্দীন সাহেবকে কেউ কিছু বলল না। তবে তার দলের সকলেরই কিছু কিছু মারপিট কপালে জুটেছিল। আমি ও আমার বন্দু আজিজ সাহেব দেখলাম, শাহ আজিজুর রহমান সাহেব ছাত্রলীগের ফাইল নিয়ে নাজিমুদ্দীন সাহেবের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি ও আজিজ পরামর্শ করছি শাহ সাহেবের কাছ থেকে এই খাতাগুলি কেড়ে নিতে হবে, আমাদের ছাত্রলীগের কাজে সাহায্য হবে। নাজিমুদ্দীন সাহেব যখন চলে যাচ্ছিলেন, শাহ সাহেবও রওয়ানা করলেন, আজিজ তাকে ধরে ফেলল। আমি খাতাগুলি কেড়ে নিয়ে বললাম, 'কথা বলবেন না, চলে যাবেন'। আজকাল যখন শাহ সাহেবের সাথে কথা হয় ও দেখা হয় তখন সেই কথা মনে করে হাসাহাসি করি। শাহ সাহেব ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং ন্যাশনাল এসেম্বলিতে আওয়ামী লীগ পার্টির নেতা এবং বিরোধী দলের ডেপুটি লিডার হন। তার সাথে আমার মতবিরোধ ১৯৫৮ সালের মার্শাল ল' জারি হওয়া পর্যন্ত চলে।'নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগে'র নাম বদলিয়ে 'নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ' করা হয়েছে। শাহ আজিজুর রহমান সাহেবই জেনারেল সেক্রেটারি রইলেন। ঢাকায় কাউন্সিল সভা না করে অন্য কোথাও তারা করলেন গোপনে। কার্যকরী কমিটির সদস্য প্রায় অধিকাংশই ছাত্র নয়, ছাত্র রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন। ১৯৪৪ সালে সংগঠনের নির্বাচন হয়েছিল, আর হয় নাই। আমরা ঐ কমিটি মানতে চাইলাম না। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ও জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে বহু ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তারা এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত নয়। আমি ছাত্রলীগ কর্মীদের সাথে আলাপ-আলোচনা শুরু করলাম। আজিজ আহমেদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আবদুল হামিদ চৌধুরী, দবিরুল ইসলাম, নইমউদ্দিন, মোল্লা জালালউদ্দিন, আব্দুর রহমান চৌধুরী, আবদুল মতিন খান চৌধুরী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আরও অনেক ছাত্রনেতা একমত হলেন, আমাদের একটা প্রতিষ্ঠান করা দরকার।
১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি তারিখে ফজলুল হক মুসলিম হলের এসেম্বলি হলে এক সভা ডাকা হল, সেখানে স্থির হল একটা প্রতিষ্ঠান করা হবে। যার নাম হবে 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ'। নইমউদ্দিনকে কনভেনর করা হল। অলি আহাদ এর সভ্য হতে আপত্তি করল। কারণ সে আর সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান করবে না। 'পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ' নাম দিলে সে থাকতে রাজি আছে। আমরা তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম এবং বললাম, 'এখনও সময় আসে নাই। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দেশের আবহাওয়া চিন্তা করতে হবে। নামে কিছুই আসে যায় না। আদর্শ যদি ঠিক থাকে, তবে নাম পরিবর্তন করতে বেশি সময় লাগবে না। কয়েক মাস হল পাকিস্তান পেয়েছি। যে আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তান পেয়েছি, সেই মানসিক অবস্থা থেকে জনগণ ও শিক্ষিত সমাজের মত পরিবর্তন করতে সময় লাগবে'॥"
উৎস : শেখ মুজিবুর রহমান / অসমাপ্ত আত্মজীবনী ॥ [ ইউপিএল - ২০১২ । পৃ: ২৮ / ৪৪ / ৮৮-৮৯ ]
২. "... '৪৭-এর শেষে বা '৪৮ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। তখন পাকিস্তান হয়ে গেছে। সদর ঘাটের বাঁধটা যেখানে, তার পূর্ব দিকে একটা পার্ক ছিল। পার্কটার নাম ছিল লেডিজ পার্ক। ঐ লেডিজ পার্ক ছিল একটা মিটিং প্লেস। মাঝে মাঝে সভা হত ওখানে। ওখানে ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় অবস্থার উপরে আলোচনা করার জন্যে একদিন একটিও মিটিং আহ্বান করে। এই সভায় সরদার ফজলুল করিম ওয়াজ টু প্রিসাইড ওভার দি মিটিং এন্ড মুনীর চৌধুরী ওয়াজ টু স্পিক। অন্য কমিউনিস্ট নেতা যারাই থাকুন না কেন - এই দুই জনই ছিল প্রধান।
আমরা মিটিং শুরু করতে যাবো, তখন দি মিটিং ওয়াজ এটাকড বাই শাহ আজিজুর রহমান গ্রুপ। সুলতান হোসেন খানও আক্রমণকারী গ্রুপের ছিলেন। এই জঙ্গি গ্রুপটা আমাদের মিটিং ভেঙ্গে দিল। লাঠিপেটা করল আমাদের। প্রাণ বাঁচানোর জন্যে আমাদের দৌড়ে পালিয়ে আসতে হল। পালিয়ে আমরা আশ্রয় নিলাম এখন যেটা বার লাইব্রেরি তার উত্তর দিকের একটা দোতলা বিল্ডিং-এ। এটা ছিল ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির অফিস। আমি আর মুনীর ওখানে আশ্রয় নিলাম। শাহ আজিজেরা ওখানে গিয়েও কিছু ইট-পাটকেল ছুঁড়ল আমাদের দিকে। তারপর তারা চলে গেল।
... '৪৬-এ সাম্প্রদায়িক গণহত্যা হলো কলকাতাতে। তার প্রতিক্রিয়ায় ঢাকাতেও শুরু হয়ে যেতে পারত নরমেধযজ্ঞ। কিন্তু তা যে হলো না, সে স্মৃতি আমার সচেতন গৌরবের স্মৃতি। ১৬ আগস্টের খবরে আমরাও কেঁপে উঠেছিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার প্রগতিশীল অংশটি। আমি তখন এম.এ পড়ি এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে বেশ কিছুটা জড়িত হয়েছি। আমরা ১৭ কিংবা ১৮ আগস্ট ঢাকাতে বের করেছিলাম হিন্দু-মুসলিম সম্প্র্দায়ের মধ্যে শান্তি রক্ষার শান্তি মিছিল। সে মিছিলটি স্মরণীয় ছিলো। তার উদ্যোগ এসেছিলো বামপন্থী, সমাজতন্ত্রী মহল থেকে। ঢাকার মুসলিম লীগের প্রগতিশীল কর্মীবৃন্দ যারা বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন, তারাও যুক্ত ছিলেন এই মিছিলে। এ কারণে শাহ আজিজুর রহমান, ফরিদ আহমদ এদের মতো সেদিনকার মুসলিম ছাত্র আন্দোলনের নেতৃস্থানীয়দের পক্ষে এ শান্তি মিছিলের বাইরে থাকা সম্ভব হয় নি।
... শাহ আজিজকে আমি '৪২-'৪৩ সাল থেকে দেখেছি। '৪৬ সালে আমার মনে হয়, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ ক্লাসের ছাত্র ছিলেন। ইংরেজিতে। অবশ্য এর আগে আলীগড়ও হয়ে এসেছেন। তুখোড় বক্তা ছিলেন : ইংরেজি, বাংলা ও উর্দুতে। অবশ্য কারুর মধ্যে এতো বেশি দক্ষতা থাকলে স্বাভাবিকভাবে তার মধ্যে অহমিকা আর দক্ষতার সুবিধাজনক ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি প্রবণতারও প্রকাশ ঘটে। এক্ষেত্রে শাহ সাহেব কোনো ব্যতিক্রম ছিলেন বলে আমার স্মৃতিতে তেমন কোনো ঘটনা নেই। শাহ সাহেবের সঙ্গে বহুদিন ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ ঘটেনি। সাম্প্রতিককালে তিনি 'রাজপুরুষ' অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সরকারি নেতার স্থানেও অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
নিজের বন্ধু-বান্ধব কেউ এমন হলে তখনি আমার বেশি করে সঙ্কোচ জাগে। ব্যবধানটা তখনি বৃদ্ধি পায়। অথচ এটা ঠিক যে, চল্লিশের দশকের ঢাকার কর্মকান্ডে, এর প্রতি-ধারার অন্যতম নেতা হিসেবে শাহ আজিজুর রহমানের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল॥"
উৎস : সরদার ফজলুল করিম / আমি সরদার বলছি ॥ [ অন্বেষা - ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ । পৃ: ৫০ / ১৭৪-১৭৫ ]
৩. "... ১৯৪৮ সালের ৩০শে জুন করনেশন পার্কে যে সভা অনুষ্ঠিত হয় তাতে সভাপতিত্ব করেন শহীদ মুনীর চৌধুরী। সভায় সরদার ফজলুল করিম ও রণেশ দাশগুপ্তের বক্তৃতা দেওয়ার কথা স্থির করা হয়। ফজলুল করিম স্থানীয় সমস্যা ও কর্মসূচীর বিষয়ে বললেন। রণেশ দাশগুপ্ত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা সম্পর্কে বক্তৃতা করলেন। জনসভায় প্রায় হাজার খানেক লোক উপস্থিত ছিল। এই সময় শাহ আজিজুর রহমান তার দলবল নিয়ে সভায় উপস্থিত হন। সরদার ফজলুল করিম তার বক্তৃতা দেওয়ার অল্প কিছুক্ষণ পরেই শাহ আজিজুরের দল সভাপতির কাছে একের পর এক চিরকূট পাঠিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর দাবী করতে থাকেন। মাঝে মাঝে চিৎকার করে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। রণেশ দাশগুপ্ত তার বক্তৃতায় আম্তর্জাতিক পরিস্থিতি ছাড়াও কমনওয়েলথ ছাড়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। উভয় বক্তাই পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচী ব্যাখ্যা করেন। শাহ আজিজের এই গোলমালের পর মুনীর চৌধুরী সাধারণভাবে কিছু বলে সভা ভেঙ্গে দেন। সভা ভঙ্গের বিরুদ্ধে শাহ আজিজের দল প্রতিবাদ করতে থাকেন এবং তাদের বক্তব্য পেশ করার অধিকার দাবী করেন। তারপর কিছু ধাক্কাধাক্কি হয়। এরপর কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা সভাস্থল ত্যাগ করে অফিসের দিকে চলে যান। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা চলে যাবার পরই শাহ আজিজ মাঠ দখল করে কিছুক্ষণ কমিউনিস্ট পার্টিকে গালাগালি করে সভা শেষ করেন।
৩০ শে জুন করনেশন পার্কের সভার পর প্রায় এক হাজার লোক কোর্ট হাউস স্ট্রীটের পার্টি অফিস ঘেরাও করে আক্রমণ চালায়। ফলে তাদের সাথে অফিসের লোকজনদের প্রায় আধ-ঘন্টাব্যাপী তুমুল খন্ডযুদ্ধ হয়। বিনয় বসু, অমূল্য সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, মুনীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম ছাড়াও প্রায় কুড়িজন যুবক তখন অফিসের মধ্যে ছিলেন। সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিরোধের ফলে পার্টি অফিসের মধ্যে গুন্ডারা প্রবেশ করতে পারেনি। সে সময় পার্টিকে বেআইনী করা হয়নি সত্য, কিন্তু নানা প্রকার নির্যাতনের মাধ্যমে পার্টির কাজ কার্যত: অসম্ভব করে তোলা হয়॥"
উৎস : মণি সিংহ / জীবন সংগ্রাম ॥ [ জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী - জুলাই, ১৯৮৩ । পৃ: ১০৭-১০৮ ]
৪. "... সারা ভারতের মত রাজশাহী শহরও সেদিন রাজনৈতিক তৎপরতায় কম্পমান ছিল। আজকালকার ছাত্রদের মত অতশত না বুঝলেও রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পারিনি। ঝুঁকে পড়েছিলাম বস্তুত মুসলিম লীগ তথা পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে। মুসলিম ছাত্রলীগ, মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল গার্ড প্রত্যেকটির সাথে সক্রিয় যোগাযোগ ছিল। ন্যাশনাল গার্ডের খাকি পোষাক আর সবুজ ক্যাপে চাঁদতারা লাগিয়ে ঘোরাফেরা করতে এক রকম ভাল লাগতো বই কি! সে সময়ের বঙ্গদেশের ১নং ছাত্রনেতা অনলবর্ষী বক্তা শাহ আজিজ সাহেব আমাদের আদর্শ ছিলেন॥"
উৎস : মুহাম্মদ আবদুল হালিম / ক' দিনের এই দেখা ॥ [ অনির্বাণ - আগস্ট, ২০০৫ । পৃ: ৫৪ ]
৫. "... শাহ আজিজুর রহমান বাংলাদেশের খ্যাতিমান আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি ২৩ নভেম্বর, ১৯২৫ খৃ: ভারতের পশ্চিম বাংলার হুগলী জিলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তাহার পিতা কুষ্টিয়ায় বসতি স্থাপন করেন। তিনি কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা, প্রেসিডেন্সী কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন।
শাহ আজিজুর রহমান কলিকাতায় ছাত্র জীবনেই রাজনীতির সহিত জড়িত হইয়া পড়েন। তিনি ১৯৪২ হইতে ১৯৪৭ পর্যন্ত বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ এবং ১৯৪৪ হইতে ১৯৪৭ পর্যন্ত নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনে তদানীন্তন শীর্ষস্থানীয় ছাত্র নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। আগস্ট ১৬, ১৯৪৭ খৃ: কলিকাতা গড়ের মাঠে Direct Action Day পালন উপলক্ষে আয়োজিত জনসভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন। ঐ সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্।
আইনশাস্ত্রে ডিগ্রী লাভের পর ঢাকা বারে আইনজীবী হিসাবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। শাহ আজিজুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রথমে যুগ্ম সম্পাদক এবং পরে ১৯৫০ হইতে ১৯৫৮ খৃ: পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ খৃ: তৎকালীন পাকিস্তানে সামরিক আইন প্রত্যাহার হইলে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মুসলিম লীগের সহিত তাহার মতবিরোধ দেখা দেয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টে (NDF) তিনি যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৬৪ খৃ: শাহ আজিজুর রহমান পাকিস্তান আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৬৩-৬৪ খৃ: তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সম্মিলিত বিরোধী দলের (COP) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ খৃ: শাহ আজিজ বিরোধী দলের মনোনয়নে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। একইসাথে তিনি আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৫ হইতে ১৯৬১ খৃ: পর্যন্ত তিনি জাতীয় পরিষদে সম্মিলিত বিরোধী দলের উপনেতা ছিলেন। একই সময়ে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ কর্তৃক বিশ্ব আন্ত:সংসদীয় ইউনিয়নের সদস্য নির্বাচিত হন।
শাহ আজিজ সামরিক শাসক আইয়ুব খানের কঠোর সমালোচক ছিলেন। ১৯৬৫ খৃ: নির্বাচনে তিনি ফাতিমা জিন্নাহর পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ খৃ: আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে জাতীয় লীগ গঠিত হইলে তিনি সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। ১৯৭১ খৃ: মার্চে ঢাকায় পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান। ঐ সময়ে পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর ভূমিকায় তিনি নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
১৯৭১ খৃ: পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসাবে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেন। ১৯৭১ খৃ: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাহার ভূমিকার কারণে পরবর্তীকালে তিনি কারারুদ্ধ হন। ১৯৭৩ খৃ: তিনি জেল হইতে মুক্তি পান।
বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তাহাদের মধ্যে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ছিল সকল প্রতিপক্ষতার উর্ধ্বে। তিনি কারাগারে আটক থাকাকালীন শেখ মুজিব নিয়মিত তাহার খোঁজ-খবর রাখিতেন। তাহারা উভয়েই পাকিস্তান আন্দোলনে একত্রে কাজ করিয়াছেন।
১৯৭৬ খৃ: বাংলাদেশে রাজনৈতিক তৎপরতা পুনরায় শুরু হইলে শাহ আজিজুর রহমান বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৭৮ খৃ: কয়েকটি দল লইয়া জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠিত হইলে তিনি ফ্রন্টের অন্যতম নেতা হিসাবে কাজ করেন। ফ্রন্টভুক্ত দলসমূহের সমন্বয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত হইলে তিনি ইহাতে যোগ দেন এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মনোনীত হন। ১৯৭৮ খৃ: জুন মাসে শাহ আজিজ শ্রম ও শিল্প কল্যাণ মন্ত্রী হিসাবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী সভায় যোগ দেন। ১৫ এপ্রিল, ১৯৭৯ খৃ: তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন এবং মার্চ ২৪, ১৯৮২ খৃ: সরকারী হ্জ্ব প্রতিনিধি দলের নেতা হিসাবে হ্জ্ব পালন করেন।
সংসদীয় দলের সদস্য হিসাবে তিনি বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করেন। তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক (১৯৬২-৬৪ খৃ:) এবং পাকিস্তান বার কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। একজন প্রখ্যাত আইনজীবী হিসাবে তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাসহ বহু রাজনৈতিক মামলা পরিচালনা করিয়াছেন। ১৯৭৫ খৃ: রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলির সহিত বাংলাদেশের সুসম্পর্ক স্থাপনে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করিয়াছিলেন। তিনি একজন সুবক্তা ছিলেন। বাংলা, ইংরেজী ছাড়াও আরবী, উর্দু ও ফারসী ভাষাও জানিতেন। তাহার প্রচেষ্টায় কুষ্টিয়া জিলার শান্তিপুরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। রাজনৈতিক জীবনে অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ও প্রখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান হিসাবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। বেশ কিছুদিন রোগ ভোগের পর সেপ্টেম্বর , ১৯৮৮ খৃ: তিনি ঢাকায় ইন্তিকাল করেন। তাহাকে শেরে বাংলা নগরস্থ জাতীয় গোরস্তানে দাফন করা হইয়াছে॥" (চলবে...)
তথ্যসূত্র : ইসলামী বিশ্বকোষ (২৩শ খন্ড) / ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ - জুন, ১৯৯৭ । পৃ: ৬৪০-৬৪১ ] [ সংকলনঃ কাই কাউস ]
COMMENTS