কবাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থ, বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতিহাস। মুঘল আমলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। আমাদের এই অঞ্চলে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার বিবর্তন। মুঘল শাসকগন শিক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদার ও মনযোগী ছিলেন।
মুঘল আমলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা
বাংবাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে হুলস্থূল কান্ড-কারখানা ঘটছে। নয়া জাতী-রাষ্ট্র হিসেবে দলীয় রাজনীতি’র মাধ্যমে রাষ্ট্রগঠনের প্রচেষ্টার ফলে যে রাষ্ট্রীয় সংকট বিরাজ করছে সেটা থেকে শিক্ষাও বাদ যাচ্ছেনা। পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে সংকীর্ণ ‘দলীয় আদর্শকেন্দ্রিক’ ঢেলে সাজানোর চেষ্টা’র ফলে এই সংকট তীব্রতর হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থা কি ধর্মীয় মুল্যবোধের ভিত্তিতে হবে, নাকি ‘সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ’ হবে এটা নিয়ে চলছে বাদানুবাদ এবং সে থেকে আন্দোলন। ধারাবাহিক এই প্রবন্ধে আমরা দেখার চেষ্টা করব ঐতিহাসিকভাবে আমাদের এই অঞ্চলে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার বিবর্তন কিভাবে হয়েছে এবং সেটা কিভাবে বর্তমান সমস্যায় প্রভাব বিস্তার করছে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতিহাস
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বহু আগে আমাদের এই অঞ্চলে সনাতন ধর্মালম্বী (হিন্দু) জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রচলিত ছিল ‘টোল’ (tol) নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যার লক্ষ্য ছিল সংস্কৃত ভাষায় হিন্দু ধর্মীয় বিষয় শিক্ষাদান। আরেকটি প্রতিষ্ঠান তাঁদের ছিল যাকে বলা হত পাঠশালা যার মাধ্যমে তখনকাঁর যুগের জন্য কারিগরি শিক্ষা দেয়া হত যেমন নৌকা তৈরি (Ali Riaz, 2010)। ঐ সময়ে শিক্ষা গ্রহণ সীমাবদ্ধ ছিল কেবল ব্রাহ্মণদের মাঝে। বর্ণপ্রথায় সবার উপরে তাঁদের অবস্থান হওয়ায় নিন্মবর্ণের হিন্দুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ ছিল বন্ধ। ভারতে মুসলিম শাসনের মাধ্যমে ধনী গরিব, উচ্চ বর্ণ, নিম্ন বর্ণের মানুষের সার্বজনিন শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ উন্মুক্ত হয় (Jaffar, 1984 cited in Nazeer, 2011)। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ (বাধ্যতামুলক) নীতি’র ভিত্তিতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই মুসলিম সুফি, সাদক, পীর, আলেমগন মানুষের মাঝে ইসলামের জ্ঞান বিতরন করেছেন। শুরুতে সূফীদের ‘খানকাহ ‘ গুলোতে হালাকাহ’র মাধ্যমে কুরাআন-হাদীসের মৌলিক জ্ঞান সরবরাহ করা হত। সুলতানী আমলে ইসলামে মানুষের অন্তর্ভুক্তি বাড়ার সাথে সাথে সূফী সাধকগন তাদের আবাস কেন্দ্রিক ‘মক্তব’ তৈরির মাধ্যমে জ্ঞান বিতরণ করে গেছেন।
পরবর্তীতে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় গনমানুষের জন্য মসজিদ কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে ‘মক্তব’ নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।ইসলাম ধর্মের জ্ঞান সরবরাহ করাই ছিল এসব প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। গ্রামাঞ্চলে এই প্রতিষ্ঠান এখনো বিদ্যমান। এক হিসেবে জানা যায় ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৭০ হাজার ফুরকানিয়া ও মসজিদ ভিত্তিক মক্তব রয়েছে (আ.ব.ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী, ২০১৫)। তখন থেকেই হিন্দু ও মুসলিম দুই জাতির মধ্যকার শিক্ষার একটি সতন্ত্র ধারা চলে আসছিল।
মুঘল আমলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা
ইতিহাসে এটা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত যে, মুঘল শাসকগন শিক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদার ও মনযোগী ছিলেন। শিক্ষার জন্য ব্যাপক সাহায্য সহযোগিতা তারা উদার হস্তে দিয়েছেন এবং বহু মাদ্রাসা তৈরি করেছিলেন (Francis Robinson, 2001; Ali Riaz, 2010)। ব্যক্তিগত ও শাসকদের দান করা ওয়াকফ সম্পত্তি দিয়ে পরিচালিত হত মক্তব ও মাদ্রাসাগুলো। সেসব ওয়াকফ সম্পত্তি খাজনা মুক্ত ছিল এবং সেখান থেকে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহ হত এবং ছাত্রদের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য বৃত্তি দেয়া হত। ইংরেজ শাসনের অধীন আসার পর বিশাল ওয়াকফ সম্পত্তি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক হাত বদল ও দখল হয়ে যাবার কারনে শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায়।
তৎকালে মুসলমানদের শিক্ষা সন্বন্ধে উইলিয়াম এ্যাডাম (Willim Adam) মন্তব্য করেন যে, এ দেশে মুসলিমগন বহু বেসরকারী বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন এবং তাঁরা শিক্ষাকে পেশা ও জীবিকা নির্বাহের উপায় বলে গ্রহন করেননি। তাঁরা একে ন্যায় ও পূণ্যের কাজ বলে মনে করতেন। সে আমলে প্রথম পর্যায়ের শিক্ষা বাংলা ভাষার এবং উচ্চ শিক্ষা আরবী ও ফারসী ভাষার দেয়া হত। কিন্তু বহিরাগত মুসলিমগণ, বিশেষ করে পশ্চিম ও উত্তর ভারতীয় মুসলিমগণ ফারসী ও উর্দুভাষা ব্যবহার করতেন। মুসলমান সমাজের অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে মেয়েরা মসজিদে কুরআন শিক্ষার সাথে এক বা একাধিক বিষয় যেমন বাংলা, গনিত, আরবী, ফারসী ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানলাভ করত। বিত্তশালী লোকেরা নিজকর জমি, ওয়াকফ ও লাখেরাজ সম্পত্তি দান করে এ শিক্ষা ব্যবস্থা উৎসাহ দিতেন [মোঃ হাসানূজ্জামান বিপুল, (তারিখ বিহীন), বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর যশোর ]
যদিও মাদ্রাসা ভারতে মুঘলদের আগে সুলতানী আমল থেকেই চলে আসছিল। কিন্তু মুঘল আমলে সিলেবাস তৈরির মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট মানব সম্পদ তৈরির কাজ চলে। সেসময় মুসলমান সমাজে জ্ঞানের দুটো ধারা ছিল; একটি ‘মানকুলাত’ (ওহী সংশ্লিষ্ট জ্ঞান বা revealed knowledge) এবং আরেকটি ‘মাকুলাত’ (যুক্তি বিজ্ঞান বা Rational Science)। এই দুটো ধারার মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে আসছিল আব্বাসী আমল থেকে।যখন গ্রীক সাহিত্যের আরবী অনুবাদের ফলে গ্রীক দর্শনের প্রভাব মুসলিম সমাজে পরে।
মুঘল শাসনের সময় মাকুলাত (যুক্তি বিজ্ঞান বা Rational Science) এর উপর জোর দেয়া হয় তবে শেষের দিকে দুটোর মাঝে সমন্বয় চেষ্টাও ছিল।১৫শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের সীরাজ নগরী থেকে আসা স্কলার মীর ফাতেউল্লাহ সিরাজীর প্রচেষ্টায় একটি কারিকুলাম গড়ে উঠে যেখানে মাদ্রাসাগুলোতে নৈতিকতা, গণিত, জোতির্বিদ্যা, কৃষি বিদ্যা, চিকিৎসা বিজ্ঞান, তর্কশাস্ত্র, সরকার ব্যবস্থাপনা বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হয়। একই সাথে সংস্কৃত ব্যকরন, দর্শন এবং ইয়োগাও প্রস্তাব করা হয়েছিল (Ali Riaz, 2010)।
আকবরের সময় শায়খ আব্দুল হক ‘মানকুলাত’ ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলে তাকে শাসকগোষ্ঠীর কোপানলে পরতে হয় এবং তাকে দেশান্তরী হতে হয়।তবে সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনের সময় দুই ধারার স্বমন্বয়ে গঠিত কারিকুলামের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায় মোল্লা কুতুব উদ্দিন সিহালয়ী’র ছেলে মোল্লা নিজাম উদ্দিন সিহালয়ী’র হাতে যা দারস-ই-নিজামী নামে পরিচিত। এটি বর্তমান দেওবন্দ বা কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস হিসেবে বিশ্বব্যাপী আজও খ্যাত।
মোল্লা কুতুব উদ্দিন ছিলেন যুক্তি বিজ্ঞানের অন্যতম স্কলার। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোল্লা নিজাম উদ্দিন আওরঙ্গজেবের দান করা সম্পত্তির উপর লখনৌতে গড়ে তুলেন বিখ্যাত ফিরাংগী মহল মাদ্রাসা। এখানে তৈরি হওয়া দারস-ই-নিজামীই উপমহাদেশের দেওবন্দি/কওমী ধারার মাদ্রাসাগুলোতে এখনো অনুসৃত হচ্ছে। এই কারিকুলাম জনপ্রিয় হওয়ার দুটি মূল কারণ বর্ণনা করেছেন লন্ডন ইউনিভার্সিটির রয়্যাল হলওয়ে কলেজের ইতিহাসের প্রফেসর রবিনসন;
এক. এটি তৎকালীন ছাত্রদের পড়াশুনা শেষে মুগল প্রশাসনে চাকুরীর জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা তৈরি করত এবং
দুই. ফিরাংগী মহল পরিবারের সদস্যারা পুরো ভারত ঘুরে ঘুরে মানুষকে শিক্ষা দেয়ার সুযোগ খুঁজত।আর এতে করে তাঁদের প্রচুর ছাত্র তৈরি হয় (Francis Robinson, 2001)।
শিক্ষার এই ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটে মুঘল সাম্রাজ্যের শেষের দিকে। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে মুঘল সাম্রাজ্যে ছোট ছোট স্বাধীন রাজ্য গড়ে উঠতে থাকে এবং মুঘলদের প্রভাব ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকে। এই অস্থির সময়ে আবির্ভাব ঘটে মোজাদ্দিদ শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভি’র (১৭০৩-১৭৬২)। তিনি দেখতে পেলেন কিভাবে বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের পতন ঘটছে। তিনি মুসলমানদের দুরাবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছেন এবং পতনের কারণ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি তাঁর বাবার প্রতিষ্টিত মাদ্রাসা-ই-রহিমিয়া’র দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং এখানে ১২ বছর শিক্ষকতা করেন।এরপর তাঁর ছেলে শাহ আব্দুল আজিজ এর দায়িত্ব নেন।
সে সময়ের পরিস্থিতি শাহ ওয়ালি উল্লাহর উপর যে প্রভাব বিস্তার করে তা প্রতিফলিত হয় তাঁর মাদ্রাসার শিক্ষা কারিকুলামে। তিনি পুরো জোর দেন ‘মানকুলাত’ (ওহী সংশ্লিষ্ট জ্ঞান বা Revealed Knowledge) এর উপর এবং গ্রীক দর্শন, মাকুলাত (যুক্তি বিজ্ঞান বা Rational Science) কে মোকাবেলায় হাদীস এবং তাসাউফের প্রতি জোর দেন, সাথে সাথে শিয়া মতবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ফিরাংগী মহল মাদ্রাসা এবং মাদ্রাসা-ই-রহিমিয়ার কারিকুলামের মধ্যে একটি তুলনা চিত্রের (চিত্রঃ ১) মাধ্যমে তুলে ধরা হল। এই তুলনা থেকে স্পষ্টত যা দেখা যায় এবং অবাক হতে হয় এটা দেখে যে সেসময়কার শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্য কতটা সময়োপযোগী এবং বিস্তর ছিল॥ [ পরের পর্বঃ বৃটিশ উপনিবেশ শাসনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ]
দুই. ফিরাংগী মহল পরিবারের সদস্যারা পুরো ভারত ঘুরে ঘুরে মানুষকে শিক্ষা দেয়ার সুযোগ খুঁজত।আর এতে করে তাঁদের প্রচুর ছাত্র তৈরি হয় (Francis Robinson, 2001)।
![]() |
| চিত্রঃ ১ ফিরাংগী মহল এবং মাদ্রাসা-ই-রহিমিয়ার কারিকুলামের তুলনা (Francis Robinson, 2001) |
সে সময়ের পরিস্থিতি শাহ ওয়ালি উল্লাহর উপর যে প্রভাব বিস্তার করে তা প্রতিফলিত হয় তাঁর মাদ্রাসার শিক্ষা কারিকুলামে। তিনি পুরো জোর দেন ‘মানকুলাত’ (ওহী সংশ্লিষ্ট জ্ঞান বা Revealed Knowledge) এর উপর এবং গ্রীক দর্শন, মাকুলাত (যুক্তি বিজ্ঞান বা Rational Science) কে মোকাবেলায় হাদীস এবং তাসাউফের প্রতি জোর দেন, সাথে সাথে শিয়া মতবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ফিরাংগী মহল মাদ্রাসা এবং মাদ্রাসা-ই-রহিমিয়ার কারিকুলামের মধ্যে একটি তুলনা চিত্রের (চিত্রঃ ১) মাধ্যমে তুলে ধরা হল। এই তুলনা থেকে স্পষ্টত যা দেখা যায় এবং অবাক হতে হয় এটা দেখে যে সেসময়কার শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্য কতটা সময়োপযোগী এবং বিস্তর ছিল॥ [ পরের পর্বঃ বৃটিশ উপনিবেশ শাসনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ]
রেফারেন্সঃ
১. Ali Riaz, Madrassah Education in Pre-colonial and Colonial South Asia, Journal of Asian and African Studies 46(1) 69–86, 2010.
২. Francis Robinson, The ‘Ulama of Farangi Mahall and Islamic Culture in South Asia, Hurst and Company, UK, 2001.
৩. Nazeer P, History of Muslim educational institutions in Kerala during 20th century, PhD thesis submitted to Department of Islamic Studies, University of Kerala, 2011.
৪. আ.ব.ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী, মাদ্রাসা, বাংলা পিডিয়া, সর্বশেষ আপডেট ৪ মার্চ ২০১৫। [উৎসঃ আনোয়ার মোহাম্মদ / মুলধারা বাংলাদেশ। ]

COMMENTS