একুশের ইতিহাস : প্রথম পর্ব

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। একুশের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাস অভ্যুত্থানের মাস। পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি। ২১শে ফেব্রুয়ার ১৪৪ ধারা ভঙ্গ। ভাষা শহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত। ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ।

"ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতকরণ ও তার নায়কেরা" - বদরুদ্দীন উমর

৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাস ছিল এক অবিস্মরণীয় গণজাগরণ, গণআন্দোলন এবং অভ্যুত্থানের মাস। ১৯৫৩ সাল থেকেই ২১শে ফেব্রুয়ারী এই গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পালিত হয়েছে। কিন্তু ১৯৭২ সাল থেকেই এখানে শুরু হয়েছে, অন্য এক প্রক্রিয়া, যার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এই ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাস পরিণত হয়েছে এক ধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবসায়ী এবং মতলববাজ বুদ্ধিজীবীদের বাণিজ্যিক উৎসবে। এ জন্যেই আমরা যারা পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলনের বিস্তারিত তথ্যের সাথে পরিচিত, যারা তথাকথিত ভাষা সৈনিক না হলেও ভাষা আন্দোলনকে নিজেদের অভিজ্ঞতায় প্রত্যক্ষভাবে দেখেছি, তাদের জন্য এই বাণিজ্য উৎসব, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিস্ময়কর না হলেও, যথেষ্ট পীড়াদায়ক।

এই পীড়ন গত কয়েক বছর ধরে বেশী মাত্রায় চলছে এবং নিয়মিতভাবে এর মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজকের দৈনিক সংবাদপত্রের পাতায় ‘এ মাসে ভাষা সৈনিক ও রাজবন্দিদের সম্মেলন' শীর্ষক এক খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হচ্ছে যে, “মহান ভাষা আন্দোলনে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য” সরকার নিয়ন্ত্রিত শিল্পকলা একাডেমীতে “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসনী, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ ২১ জন ব্যক্তিত্বকে জাতির শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদানের জন্য” এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এই সম্মেলনের আহ্বায়কদের মধ্যে দুই একজন আছেন একুশে ফেব্রুয়ারীর আন্দোলনের সময় যাঁদের একটা প্রান্তিক ভূমিকা ছিল। কিন্তু সেই প্রান্তিক ভূমিকা তাঁদের নির্লজ্জ এবং অবাধ আত্মপ্রচারণা এবং প্রধান প্রচার মাধ্যমগুলি কর্তৃক তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থে এই প্রচারকে এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়মিত ব্যাপারে দাঁড় করানোর ফলে, এই সব মিথ্যার অবাধ পরিমাণগত বৃদ্ধি মিথ্যার গুণগত পরিবর্তন সাধন করে তাকে প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে অপরিচিত লোকদের কাছে, বিশেষতঃ নতুন প্রজন্মের কাছে, উপস্থিত করছে এমন এক পরম সত্য হিসেবে, যা সাধারণভাবে মূল্যহীন তাই নয়, অনেক দিক থেকে রীতিমতো বিপজ্জনক।

এ তো গেল বর্তমান ‘ভাষা-সৈনিক' নামে আত্মপ্রচারে লিপ্ত ব্যক্তিদের কথা। এবার আসা যেতে পারে “ভাষা আন্দোলনের অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য” যাদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদানের কথা বলা হয়েছে তাঁদের প্রসঙ্গে। যে তিনজনের নাম এব্যাপারে ঘোষণা করা হয়েছে তাঁদরে মধ্যে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য অবশ্যই স্মরণযোগ্য। কিন্তু অন্য দুইজন অন্য কারণে স্মরণযোগ্য হলেও ভাষা আন্দোলনে “অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য” স্মরণযোগ্য, একথা ঠিক নয়।

প্রথমত: মওলানা ভাসানীর কথা। ঢাকার বার লাইব্রেরীতে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি' গঠনের জন্য ৩১শে জানুয়ারী ১৯৫২ তারিখে যে সভা হয় তাতে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু এই সভাপতিত্বের পর তাঁকে আর আন্দোলনে দেখা যায় নি। ২০শে ফেব্রুয়ারী ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি'র যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয় তাতে সভাপতিত্ব করেন নিখিল বঙ্গ মুসলিম লীগের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক (১৯৪০-৪৭) আবুল হাসিম। এ কারণে, ২৫শে ফেব্রুয়ারী তাঁকে গ্রেফতার করে ১৯৫৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত সিলেট ও ঢাকা জেলে বিনা বিচারে আটক রাখা হয়।

১৩ই মার্চ মওলানা ভাসানীর নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হয় এবং ১০ এপ্রিল তিনি ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আত্মসমর্পন করেন। এই ভুমিকার কারণে ভাষা আন্দোলনে মওলানা ভাসানীর “অবিস্মরণীয় অবদানের” কথা বলার অর্থ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিষয়ে মুর্খতা অথবা নির্ভেজাল রাজনৈতিক মতলববাজী।

এখানে আবার বলা দরকার যে, ভাষা আন্দোলনে মওলানা ভাসানীর অবদান ৩১শে জানুয়ারীর সভায় সভাপতিত্ব করার বেশি কিছু না হলেও, এ দেশের রাজনীতিতে তাঁর অন্য অবদান ও ভূমিকার জন্য তিনি অবশ্যই স্মরণীয়। এ দুই বিষয়কে গুলিয়ে ফেলার মধ্যে কোন ইতিহাস জ্ঞান অথবা সত্যনিষ্ঠা নেই।

শেখ মুজিবর রহমানের ক্ষেত্রে একথা আরও সত্য। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে কার্যতঃ তাঁর কোনও সম্পর্ক ছিল না। ১৯৪৯ সালের ১১ই অক্টোবর ঢাকার আরমানীটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে তৎকালীন খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষাবস্থার প্রতিবাদে এক জনসভা হয়। সেই সভায় ভাসানী ছাড়া শেখ মুজিবর রহমানসহ আরও অনেকে বক্তৃতা করেন।

জনসভায় যথেষ্ট উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং তারপর মিছির বের হলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। পরে পুলিশ মওলানা ভাসানী, তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবর রহমানসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। এইভাবে ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে গ্রেফতার হয়ে শেখ মুজিব ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তি লাভ করে ১৯৫২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী, যে সময়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকারীদেরকে বিপুল সংখ্যায় গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি'র অনেক সদস্য আত্মগোপন করে আছেন। এই পরিস্থিতিতে জেল থেকে শেখ মুজিবর রহমানের মুক্তি লাভ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, তৎকালীন ভাষা আন্দোলনে তাঁরও কোন ভূমিকা ছিল না এবং আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে মুক্তি দেওয়াটা সরকার নিজেদের জন্য অসুবিধাজনক বা বিপজ্জনক কিছুই মনে করেনি।

কিন্তু শেখ মুজিবের কোন ভূমিকা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে না থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ দল এবং তাদের অনুসারী বুদ্ধিজীবীরা তাঁকে সেই আন্দোলনের নেতা, এমনকি মূল নেতা হিসেবে আখ্যায়িত ও প্রচার করে আসছে। এবং তাদের সেই প্রচার এখন এক ভয়ঙ্কর কুৎসিত ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। ওপরে তাঁর “অবিস্মরণীয় অবদানের” জন্য তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদানের কথা যেভাবে বলা হয়েছে তার মধ্যেই এই কুৎসিত মিথ্যার একটা পরিচয় পাওয়া যায়।

এই মিথ্যা যে শুধু অন্যেরাই প্রচার করেছে তাই নয়। ১৯৭২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী এক টেলিভিশন প্রোগ্রামে তিনি নিজেই একথা বলেন। আমি অবাক বিস্ময়ে তাঁর মুখ নিঃসৃত কথা টেলিভিশনে শুনি এবং আমার লেখায় তার প্রতিবাদ করি। কিন্তু মিথ্যার বাহবা ধ্বনি এই প্রতিবাদের দ্বারা স্তব্ধ হওয়ার কোন অবস্থা তখন ছিল না, এখনো নেই।

এ প্রসঙ্গে শেখের বক্তব্য ছিল এই যে, ভাষা আন্দোলন চলাকালীন অবস্থায় তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে। সেইভাবে হাসপাতালে থাকার সময় সেখানকার পায়খানার জানালা থেকে কাগজের চিরকুট ছুঁড়ে ছুঁড়ে তিনি ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান এবং সে আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন। তাই যদি হয় তাহলে ১৯৫২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী তৎকালীন নূরুল আমিন সরকার তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দেয় কীভাবে? যিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পায়খানার গবাক্ষ থেকে ভাষা আন্দোলন পরিচালনা করছিলেন তাঁকে কীভাবে সেই সংকটজনক সময়ে সরকার মুক্তি প্রদান করলো? এ রাজনৈতিক মারফতী বা আধ্যাত্মবাদের মহিমা বোঝা আমাদের মতো ক্ষুদ্র বুদ্ধিসম্পন্ন লোকদের কর্ম নয়।

Related image

দ্বিতীয়তঃ সে সময় শেখ মুজিব নেতৃস্থানীয় আওয়ামী লীগারদের মধ্যে একজন হলেও আওয়ামী লীগের মধ্যে তখন ভাসানী, শামসুল হক, নারায়ণগঞ্জের ওসমান আলীসহ অন্য নেতারাও ছিলেন এবং শেখের এমন অবস্থা ছিল না যাতে তিনি তৎকালে ওই রকম এক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। বস্ততঃপক্ষে সে সময়ে আওয়ামী লীগের নিজেরই তেমন কোনও রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তি ছিল না। সে কারণে আওয়ামী লীগের কোন মুখ্য তো নয়ই, এমনকি কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও যে সে আন্দোলনে ছিল এমন বলা চলে না, যদিও তাদের মুসলিম ছাত্র লীগের বিভিন্ন স্তরের কিছু কর্মী ও নেতা তাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে সব থেকে সক্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল নারায়ণগঞ্জের খান সাহেব ওসমান আলীর। এ কারণে তাঁর ও তাঁর সমগ্র পরিবারের ওপর যে নির্যাতন হয়েছিল সেটা অন্য কারও উপর হয়নি।

পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি ২০শে ফেব্রুয়ারী সন্ধা রাত্রের ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি'র বৈঠকে তাদের প্রকাশ্য প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ২১শে তারিখে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরোধীতা করে। তাদের দিক থেকে সে সময় এই বিরোধীতার যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল। ১৯৪৮-৫০ সালে রণদিবে লাইনের হঠকারিতা এবং তার পরিণতিতে পার্টি ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বিপুল ক্ষতির কথা মনে রেখে স্বভাবত কোনও পূর্ব প্রস্ততি ছাড়া ওই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহনের বিষয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের কৃতিত্ব ছিল এই যে, ২১শে ফেব্রুয়ারী ছাত্রেরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পর যে পরিস্থিতির উদ্ভব হল সে পরিস্থিতির ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে তারা সঙ্গে সঙ্গেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। আন্দোলনের সমর্থনে তখন কমিউনিস্ট পার্টী গোপনে সব থেকে অধিকসংখ্যক লিফলেট ছেপে প্রকাশ করে। এ ব্যাপারে পার্টির সঙ্গে সম্পর্কিত ছাত্রকর্মী হিসেবে হাসান হাফিজুর রহমান যথেষ্ট কাজ করেন। সেই লিফলেটগুলি বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত [ আমার দ্বারা সম্পাদিত ‘ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিল'-এর দ্বিতীয় খণ্ডে ছাপা হয়েছে।]

কমিউনিষ্ট পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে ‘যুবলীগ'ই সে সময় সাংগঠনিকভাবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যদিও একথা বলা যাবে না যে, তৎকালীন আন্দোলন কোনও একটি সংগঠন অথবা কোনও একজন নেতার পরিচালনাধীন বা নেতৃত্বাধীন ছিল। কিছু সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও তখনকার ভাষা আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ততার দিকটি ছিল খুবই উল্লেখযোগ্য, তাৎপর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী। একথা বলার অর্থ, সেই আন্দোলনে সব কিছু ছাড়িয়ে জনগণের ভূমিকা শহর থেকে গ্রামঞ্চল পর্যন্ত সর্বত্রই ছিল সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে পূর্ব বাঙলার জনগণই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত নায়ক। [ এ কারণেই আমি নিজে তিন খণ্ডে প্রকাশিত ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি' তাঁদের উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করেছি ]

‘পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ' সাংগঠনিকভাবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কারণেই সেই সংগঠনের নেতা ও কর্মীদের সক্রিয়তা ছিল সব থেকে বেশী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন যুবলীগের দুই সহ-সভাপতি মহম্মদ তোয়াহা ও নারায়ণগঞ্জের শামসুজ্জোহা, সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ, দুই যুগ্ম সম্পাদক ইমাদুল্লাহ ও মহম্মদ সুলতান প্রভৃতি। পাবনার আবদুল মতিনের ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। এঁদের মধ্যে আবার যদি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে একজনের নাম করতে হয় তাহলে তিনি হলেন, অলি আহাদ। বর্তমানে তাঁর নাম এখন সব থেকে গুরুত্বূর্ণ ‘ভাষা সৈনিক' হিসেবে কেউ করে না। কিন্তু একজনের বর্তমান অবস্থা দেখে তার অতীত ভূমিকার বিচার কোনও যোগ্য ঐতিহাসিক এবং ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তি করবেন না।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আমাকে যে চিঠি দেন সেই চিঠির লিখিত বক্তব্য থেকে আমি একটা অংশ উদ্বৃত করছি। চিঠিটি তিনি আমাকে লিখেছিলেন অলি আহাদ তাঁর এক রাজনৈতিক আত্মজীবনীমূলক বইয়ে তাঁর সম্পর্কে একটি ব্যাপারে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করার পর প্রকৃত ঘটনার বর্ণনা প্রসঙ্গে। তিনি তাতে লেখেন, “জেল থেকে বেরিয়ে অলি আহাদ আমাকে বলেন যে, গোলাম মাহবুবের কথায় তাঁর আমার সম্পর্কে সন্দেহ হয়েছিল এবং এই মিথ্যে সন্দেহের জন্য তিনি আমার কাছে মাফও চান। এখন শুনছি, তাঁর স্মৃতিকথায় আমার সম্পর্কে একটা বক্রোক্তি আছে। অলি আহাদদের পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মপস্থা সম্পর্কে আমার তীব্র বিরাগ থাকলেও ভাষা আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বের জন্য আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি। প্রকাশ্যে তাঁর নাম বহু সভায় বলেছি - যখন তাঁর কথা ভুলে সবাই শেখ মুজিবের নাম বলছিলেন।”

আনিসুজ্জামান শেখ মুজিবের প্রতি “শত্রুভাবাপন্ন” নন। শেখ মুজিব বরং তাঁর একজন শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু আনিসুজ্জামানের এই বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়, অলি আহাদ ও শেখ মুজিবের মধ্যে প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রাহ্য ভূমিকা কার ছিল। কাজেই শেখ মুজিবর রহমান পরবর্তী সময়ে এদেশের রাজনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলেই তিনি মাতৃজঠর থেকেই “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” “পূর্ব বাঙলা স্বাধীন করো” বলে কোন হুঙ্কার ছাড়েননি। কিন্তু এই হুঙ্কারই এখন তাঁর দলের লোকজন এবং তাঁদের সমর্থক এবং অনুগৃহীত বুদ্ধিজীবীর দল ছাড়ছেন। এই কাণ্ডকারখানার তুফানে এ ক্ষেত্রে যা কিছু সত্য সবই খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গল্পে পাশ্ববর্তী দুই গ্রামের মাষ্টারদের বিদ্যার লড়াইয়ের কথা। মিথ্যা ঢাক-ঢোল, কাড়ানাকাড়া কীভাবে মিথ্যাকে সাধারণ অশিক্ষিত অথবা তথ্য সম্পর্কে অনবহিত লোকদের সামনে সত্য রূপে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, সেটাই হল, সেই গল্পের মর্মার্থ। প্রভাত মুখোপাধ্যায় দুই গ্রামের অশিক্ষিত লোকদের বৌদ্ধিক ও বিদ্যাগত দূরাবস্থার যে কাহিনী সেখানে বর্ণনা করেছেন তার থেকেও করুণ দুরাবস্থা আজ সারা বিশ্বের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সব থেকে গৌরবোজ্জল ভূখণ্ড এই বাঙলার জনগণের॥" [ লেখাটি লেখক সম্পাদিত মাসিক “সংস্কৃতি” সপ্তম বর্ষ সংখ্যা, মার্চ, ১৯৯৮ প্রকাশিত ]

- বদরুদ্দীন উমর / নির্বাচিত প্রবন্ধ ॥ [ অন্যপ্রকাশ - ফেব্রুয়ারী, ২০০০ । পৃ: ১৯৮ - ২০২ ]

২. "... শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়েও এ রকম হয়েছিল। তিনি ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকা কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল একথা বলেছিলেন। আমি তাকে বললাম যে, তার তো সে রকম কোন ভূমিকা ছিল না। থাকলে তিনি অন্তত: রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম কমিটির সদস্য থাকতেন, যা তিনি ছিলেন না। তিনি বললেন, সে সময় তিনি তার প্রতিনিধি হিসেবে তাজউদ্দীন ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে দিয়েছিলেন। আমি বললাম সেটা কিভাবে সম্ভব। তারা তো তখন ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম কমিটির সদস্য ছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে এবং তাজউদ্দীন সাহেব সদস্য ছিলেন তাদের এক সংগঠনের পক্ষ থেকে। তাছাড়া তিনি (মুজিব) তো ঢাকায় রাজনীতি করেননি। করেছেন কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে। ঢাকায় ঐ সময়ে তো তার কোন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল না। আমি আরও বললাম যে, জিন্নাহ সাহেবের সাথে ছাত্র লীগের নেতাদের যে সাক্ষাৎকার ছিল তাতেও তো তিনি ছিলেন না। এর জবাবেও তিনি একই কথা বলেছিলেন। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। কারণ জিন্নাহ সাহেব তখন পাকিস্তানের এক নম্বর নেতা, কায়দে আজম ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। তার সাথে সাক্ষাতের জন্য নিজে না গিয়ে অন্যকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য দেওয়া তো অসম্ভব ব্যাপার। তাছাড়া তিনি ১৯৬৯ সালে যেভাবে তাজউদ্দীন বা সৈয়দ নজরুল ইসলামকে কোন জায়গায় তার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য পাঠাতে পারেন ১৯৪৮ সালে তো সেটা সম্ভব ছিল না। আমার কথা শুনে মুজিবর এ নিয়ে আর কথা বাড়াননি। এ বিষয়ে পরে আমি তাজউদ্দীন ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে বলেছিলাম। তাতে তাদের দুজনেরই বিশেষ করে তাজউদ্দীনের প্রতিক্রিয়া খুব বিরূপ ছিল॥"

- বদরুদ্দীন উমর / আমার জীবন (তৃতীয় খন্ড) ॥ [ জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ - জুন, ২০০৯ । পৃ: ১২৩ ]

৩. "... শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারী কারামুক্তি পেলেন। কিন্তু ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ঢাকায় এলেন না নেতৃত্ব দিতে। বিদ্রোহের অনলেও ঝাপ দিলেন না। এমন কি খুনি শাসক নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ৫ই মার্চ দেশব্যাপী যে হরতালের ডাক দেওয়া হয় শেখ মুজিব তাতে অংশগ্রহণ করে মারমুখো জনতাকে নেতৃত্ব দিতে ঢাকায় আসেন নাই। তারপরও মুখপোড়া আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় দালাল চামচারা বলে ১৯৫২ সালে শেখ মুজিবর নাকি ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। ধিক তাদেরকে॥"

- অলি আহাদ / জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ থেকে '৭৫ [ বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি - অক্টোবর, ২০১২ (পঞ্চম সংস্করণ) । পৃ: ১৪৭ ]

৪. "... যে ভাষা আন্দোলনের প্রতি আওয়ামী লীগের স্বাভাবিক দূর্বলতা প্রদর্শিত হয়েছিল বলে অনেকের মনে হয়, সেই ভাষা শহিদদের 'স্মৃতিস্তম্ভ' নির্মাণ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ পরিচালিত সরকার যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শণ করতে পারেনি (পাকিস্তান রাষ্ট্রব্যবস্থার প্র্তি আওয়ামী লীগের পূর্ন আনুগত্য প্রদর্শনে ঘাটতির আশঙ্কায়)। 

১৯৫৪ খ্রীস্টাব্দের নির্বাচনের পূর্বে যুক্তফ্রন্ট ঘোষিত ইস্তেহারে যে ২১ দফা দাবি পেশ করা হয়েছিল তাতে ১৭ নং দাবি হিসাবে ভাষা শহিদদের স্মৃতির জন্য 'শহিদ মিনার' নির্মাণের কথা ঘোষণা করা হয়। আওয়ামী লীগ এই ইস্তেহার বাস্তবায়নের অন্যতম দায়বদ্ধ দল ছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন যুক্তফ্রন্টের আমলে কিংবা পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের আমলে এই শহিদ মিনার নির্মিত হয়নি। আওয়ামী লীগের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের আমলে শহিদ মিনারের নকশা রচিত হয়েছিল সত্য, কিন্তু তার পরেও দু'বছর কাল এই সরকার ক্ষমতায় থেকেও শহিদ মিনার নির্মাণে চরম ঔদাসীন্যের পরিচয় দিয়েছিল। 

এখানে উল্লেখ্য যে, সামরিক শাসক আয়ুব খানের আমলে পূর্ব-পাকিস্তানের তদানীন্তন গভর্ণর লে: জে: আযম খান বর্তমান শহিদ মিনারটি নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। ১৯৬৩ খ্রীস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারী শহিদ বরকতের মা এই মিনারটির উদ্বোধন করেন। আওয়ামী লীগ ভাষা আন্দোলনের ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে ভোটের রাজনীতিতে উৎসাহী যতটা ছিল ততটা বিষয়টির প্রতি আন্তরিক ছিল না বলেই মনে হয়॥"

- মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম / আওয়ামী লীগ : পাকিস্তান সমর্থক থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগঠকে রুপান্তর (বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় অভিসন্দর্ভ) ॥ [ উদার আকাশ, কোলকাতা - ফেব্রুয়ারি ২০১৩ । পৃ: ৬৫ ]

৫. "... As regards his (Quaid-E-Azam's) Dacca speech, it was not an announcement but just expression of one's opinion. He might have been mislead by the then administration and the leaders of the Muslim League of East Bengal. Indeed, I was subsequently told by a reliable friend that Quaid on his return from Dacca actually rebuked the persons concerned for their misrepresentation to him that the majority of Bengalees not only wanted Urdu but themselves spoke and read Urdu at home. In the case of at least some of them, this might have been their genuine misreading the situation in view of the fact that there were innumerable Madrasas not only in cities and towns but also in mafassil of East Bengal where Urdu was not only taught and learnt, in practice, Urdu itself was their medium of instruction. This report of Quaid's subsequent reproof is further supported by the fact that after his Dacca speech Quaid never again spoke a word about state Language." - Quaid-E-Azam the Democrat / Observer - December 25, 1964.

- Abul Mansur Ahmad / End of A Betrayal and Restoration of Lahore Resolution ॥ [ Khoshroz Kitab Mahal - January, 1975 । P. 237-238 ]

৬. সাক্ষাৎকার

[ মোহাম্মদ তোয়াহা। সাম্যবাদী (মার্ক্সসিস্ট- লেনিনিস্ট) দলের চেয়ারম্যান। ভাষা আন্দোলনের জন্য তিনি কারাবরণ করেন। কথিত 'আন্ডার গ্রাউন্ড রাজনীতির কারণে' তিনি সুদীর্ঘ ১৫ বছর ফেরারী জীবন যাপন করেন। জেল এবং ফেরারী অবস্থা মিলিয়ে ২২/২৩ বছর তিনি নির্বাসিত জীবন কাটান ]

প্রশ্ন: রাষ্ট্রভাষার দাবী ঢাকার তৎকালীন স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে কি ধরণের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল?

তোয়াহা: জনসাধারণকে এমন একটা ধারণা দেয়া হচ্ছিল যে, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবী তুলে ছাত্ররা পাকিস্তান ও ইসলামিক আদর্শের খেলাপ কাজ করছে। বিশেষ করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন মহল হতে ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে নানাভাবে ঢাকার স্থানীয় জনসাধারণকে উত্তেজিত করা হচ্ছিল। ফলে সিদ্দিক বাজার, নাজিরা বাজার প্রভৃতি সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় জনগণ একদিন মারমুখো হয়ে এসে তমদ্দুন মজলিস অফিসে হামলা চালায় এবং সবকিছু তছনছ করে দেয়। এ ঘটনার পর পরই আমি অন্যান্য তমদ্দুন মজলিস কর্মীদের সাথে অফিসের কাগজ-পত্র সরিয়ে আনি।

প্রশ্ন: তমদ্দুন মজলিস অফিস আক্রান্ত হওয়া ছাড়া এসময় আর কোথাও এমনি ধরণের ঘটনা ঘটেছিল কি?

তোয়াহা: এ সময় রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে ইশতেহার বিলি করতে গিয়ে ছাত্ররা একদিন চকবাজারে জনতা কর্তৃক ঘেরাও হয়। তখন পরিস্থিতি খুবই প্রতিকূল ছিল। ছাত্ররা উত্তেজিত জনতার সামনে অসহায় অবস্থার সম্মুখীন হয়। এ সময় গোলাম আযম সাহস করে এগিয়ে যান। তিনি চিৎকার করে জনতার উদ্দেশ্যে বলেন 'আরে ভাই আমরা কি বলতে চাই তা একবার শুনবেন তো।' এই বলেই তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলে পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের কি উপকার হবে তার ওপর ছোটখাট বক্তৃতা দিয়ে উপস্থিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। পরিস্থিতি শান্ত হলো। সেদিন আর কোন দূর্ঘটনা ঘটেনি।

প্রশ্ন: আপনি কোন গোলাম আযমের কথা বলছেন?

তোয়াহা: অধ্যাপক গোলাম আযম। এখন তিনি জামায়াতে ইসলামী করেন।

প্রশ্ন: তাহলে ভাষা আন্দোলনে আপনারা একসাথে কাজ করেছেন?

তোয়াহা: হ্যাঁ, ভাষা আন্দোলনে আমরা অনেকেই স্বত:স্ফূর্ত ভাবে এক সাথে কাজ করেছি।

প্রশ্ন: তিনি কি তমদ্দুন মজলিসের সাথে জড়িত ছিলেন?

তোয়াহা: না, তিনি তমদ্দুন মজলিসের সাথে জড়িত ছিলেন না। দলগতভাবে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ছাত্ররা তখন ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। গোলাম আযম সাহেব তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের জিএস ছিলেন। ছাত্র হিসাবে তিনি ছিলেন মেধাবী। স্বভাবগতভাবে তিনি ছিলেন অমায়িক এবং ভদ্র। ভালো সার্কেলের ছাত্ররা যেমন পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে, তেমনি আমরা সহজাতভাবে একত্রিত হয়ে ভাষা আন্দোলনের কাজ করেছি। আমাদের এ সার্কেলে আরো অনেক সহযোগী ছিলেন। এর পেছনে আর অন্য কোন কারণ ছিল না।

প্রশ্ন: অরবিন্দ ঘোষ যে প্যানেলে ভিপি ছিলেন সেই প্যানেলেই কি গোলাম আযম সাহেব জিএস ছিলেন?

তোয়াহা: সেই সংসদেই তিনি জিএস ছিলেন। তখন দলীয় কোন প্যানেল ছিল না। কেন্দ্রীয় সংসদের পদগুলো চারটি হলে বন্টন হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচন তখন ছিল আমোদজনক খেলার মতো, যা আজ আর নেই।

প্রশ্ন: ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবদান কতটুকু ছিল?

তোয়াহা: ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের তেমন কোন অবদান ছিল না। এ সম্পর্কে অনেক ডাহা মিথ্যাচার প্রচলিত আছে, যা ভাষা আন্দোলনের মহান ইতিহাসকে বিকৃত করছে। আর তখন শেখ মুজিবের অবদান থাকার কথাও নয়। কারণ ঢাকার ছাত্র সমাজে তার পরিচিতি ছিল নিতান্তই নগণ্য। কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে যেসব ছাত্ররা stray ঘোরাফেরা করতো শেখ মুজিব ছিলেন সে ছাত্র গ্রুপেরই একজন।

আপনাকে দুটো ঘটনা বলছি। বুঝতে পারবেন ক্ষুদ্র পরিসরে যে সুযোগ পেয়েছিলেন, তাকেও শেখ মুজিব কিভাবে উপদলীয় কোটারী রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন।

একদিন আমি এবং তাজউদ্দীন আইন পরিষদের সদস্য মো: তোফাজ্জল আলীর বাসায় যাই। তিনি আমাদের দেখেই দূর থেকে চিৎকার করে বলে উঠলেন - 'আরে এসো, এসো, তোমাদের খবর আছে।' আমরা বুঝতে পারলাম না। এ 'খবর আছে' কথার অর্থ কি? আমরা গিযেছিলাম প্রাদেশিক পরিষদ থেকে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট যে সুপারিশ পাঠানোর কথা ছিল, সে বিষয়ে জানার জন্য। সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি যেন হেলা করেই বললেন, 'আরে, ওসব হয়ে যাবে। এখন কথা শুনো, Perhaps you are getting two ministers and one Ambassador. মুজিব তোমাদের কিছু বলেনি?' আমরা অবাক হযে গেলাম।

তোফাজ্জল আলী সাহেবের সাথে আরো কিছুক্ষণ আলাপ হলো। আলাপের পর আমাদের বুঝতে আর বাকী রলো না যে, শেখ মুজিব ভাষা আন্দোলনের প্রাণশক্তিকে MLA-দের পদ এবং ক্ষমতা লাভের সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করছেন।

প্রশ্ন: কিভাবে শেখ মুজিব ভাষা আন্দোলনের প্রাণশক্তিকে উপদলীয় রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন?

তোয়াহা: তখন আইন পরিষদের ভিতরে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সমর্থক MLA-দের একটা গ্রুপ ছিল। এদের মধ্যে ছিলেন মোফাজ্জল আলী (কুমিল্লা), মফিজ উদ্দীন (কুমিল্লা), আনোয়ারা বেগম, খান সাহেব ওসমান আলী (নারায়ণগঞ্জ), মোহাম্মদ আলী (বগুড়া) প্রমুখ।

শেখ মুজিব ওদের কাছে আনাগোণা করতেন এবং প্রচার করে বেড়াতেন যে, ইউনিভার্সিটিতে যেসব আন্দোলন হচ্ছে তা তিনি এবং তার সমর্থকেরাই পরিচালনা করছেন। সুতরাং তাদের মধ্য থেকে (সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ থেকে) যদি মন্ত্রীত্বে না নেয়া হয় তবে যে কোন মূল্যে আন্দোলন দ্বারা নাজিমুদ্দীন সরকারকে উৎখাত করা হবে। এইভাবে শেখ মুজিব-সোহরাওয়ার্দী বনাম নাজিমুদ্দীন-নুরুল আমিনের রাজনৈতিক দ্বন্ধে মহান ভাষা আন্দোলনের উত্তাল জোয়ারকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেন। ভাষা আন্দোলনকে উপদলীয় সংকীর্ণ স্বার্থে রাজনৈতিকভাবে চিত্রিত করার মাঝেই মুজিবের প্রকৃত ভূমিকা খুঁজে পাওয়া যাবে।

প্রশ্ন: শেখ মুজিবের ভূমিকা সম্পর্কে আরো কি একটা ঘটনা বাদ পড়ে গেছে যা আপনি কিছুক্ষণ পূর্বে বলতে শুরু করেছিলেন?

তোয়াহা: হ্যাঁ, বলছি। ১৯৪৮ সালের ১৬ই মার্চ। পূর্বেই নির্ধারিত ছিল এইদিন সাধারণ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হবে। বিরতির সময় আমরা বেশ কয়েকজন সভাস্থলের দিকে এগিয়ে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি শেখ মুজিবুর রহমান কালো শেরওয়ানী এবং জিন্নাহ টুপি পরিহিত অবস্থায় চেয়ারে সভাপতির আসনে বসে আছেন। আমি অবাক হয়ে যাই। কারণ ঐ সভায় আমার সভাপতিত্ব করার কথা ছিল। শেখ মুজিবের সভাপতির আসন অধিকার করে থাকার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণই থাকতে পারে না। আর তৎকালীন পরিস্থিতিতে সে মর্যাদাও তার ছিল না। কিন্তু সৌজন্যের খাতিরে আমি এবং আমার সহসাথীরা কিছু বললাম না। 

এ সময়ের মধ্যে কাউকে কোন সুযোগ না দিয়ে শেখ মুজিব উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজনাকর বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন যা নিছক শ্লোগানসর্বস্ব বক্তৃতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তারপর হঠাৎ করে বক্তৃতা থামিয়ে 'চলো চলো এসেম্বলী চলো' - বলে শ্লোগান দিযে ছাত্রসভার সকলকে মিছিল সহকারে পরিষদ ভবনে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের আহবান জানায়। যদিও সেদিন মিছিল বা বিক্ষোভের কোন কর্মসূচী ছিল না, তবুও আকস্মিকভাবে পরিস্থিতি এমন হলো যে, মিছিল বন্ধ করারও তখন কোন উপায় ছিল না। পরিশেষে মিছিল হলো এবং পুলিশের লাঠিচার্জের মুখে সেদিনের অসংগঠিত মিছিল স্বাভাবিক পরিণতিতে ছত্রভঙ্গ হলো। 

সেদিন এই ঘটনার মাধ্যমে আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠলো যে মুজিব ভাষা আন্দোলনের দূর্বার গতিকে হীন স্বার্থে কাজে লাগাতে তৎপর রয়েছেন। তোফাজ্জল আলী সাহেবের বাসার ঘটনার সাথে সেদিনের অনির্ধারিত মিছিলের একটা যোগসূত্রও খুঁজে পাওয়া গেল।

প্রশ্ন: তাজউদ্দীন সাহেবের সাথে আপনার সম্পর্ক হয় কিভাবে? তোফাজ্জল আলী সাহেবের বাসায় যাওয়া আসার সময় থেকেই কি?

তোয়াহা: না, না, সেতো '৪৮ সালের কথা। সে এক সুদীর্ঘ কাহিনী। ১৯৪৩ সালে আবুল হাশিম সাহেব যখন পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন, তখন আমি, তাজউদ্দীন, শামসুল হক (আওয়ামী লীগের এক কালের সেক্রেটারী) ও তার ভাই নুরুল হক (তিনি ঢাকা জেলার মুসলিম লীগের সেক্রেটারী হয়েছিলেন। এখন পাকিস্তান ফরেন এফেয়ার্সের ডিজি) আমরা সবাই তখন মুসলিম লীগের হোল-টাইম কর্মী। তখন ১৫০, মোগলটুলীতে পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম লীগের একটি শাখা অফিস খোলা হয়। সে সময় থেকেই তাজউদ্দীনের সাথে আমার সম্পর্ক গড়ে উঠে। এছাড়া তাজউদ্দীন পূর্বাপর কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। যদিও তাজউদ্দীন বাহ্যত: আওয়ামী লীগ করতেন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের সাথেই জড়িত ছিলেন। পার্টির সিদ্ধান্তেই তাকে আওয়ামী লীগে রাখা হয়।

একবার সম্ভবত: '৬২ সালের দিকে তিনি জেল থেকে বের হয়ে আমাদের বললেন 'আর ছদ্মনামে (অর্থাৎ আওয়ামী লীগে) কাজ করতে আমার ভালো লাগছে না। আমি নিজ পার্টিতেই কাজ করবো।' তখন কেউ কেউ মনে করলো, 'থাক না আমাদের একজন আওয়ামী লীগে আছে, সেখানেই কাজ করুক না।'

পরে অবশ্য পার্টিতে এ নিয়ে আলোচনাও হযেছিল কিন্তু তাজউদ্দীনকে প্রত্যক্ষভাবে পার্টিতে নেয়া হয়নি। আমার মতে সেটা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। তবে তাজউদ্দিন আওয়ামী লীগে থেকেও আমাদের জন্য কাজ করেছেন। আওয়ামী লীগের সব তথ্য আমাদের সরবরাহ করেছেন। ইন্ডিয়াতে গিয়ে অসম-চুক্তি করার পরই তার মাঝে একটা বিক্ষিপ্ত ভাব এসে যায়। এরপর তিনি কিছুটা যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তবে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর যখন আমরা তাকে তাঁবেদার সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনে করতাম, তখনও তিনি আমাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। (বারান্দার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে) প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে একবার এ বারান্দায় বসে আমার সাথে আলাপ করে গেছেন। ভুল-শুদ্ধ যখন যা করেছেন সবই এসে আমাদের কাছে অকপটে বলেছেন।

প্রশ্ন: বরকত সম্পর্কে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক যে মন্তব্য করেছেন সে সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?

তোয়াহা: বরকতকে আমরা পূর্বাপর ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদ হিসেবেই জানি। তবে অধ্যাপক রাজ্জাক সাহেব পুলিশ অফিসারের নিকট হতে যে কথা শুনেছেন বলে উল্লেখ করেছেন, সে ধরণের কথা পূর্বে আমরাও শুনেছি।

প্রশ্ন: আপনি বরকত সম্পর্কে কথাটা কার কাছে শুনেছেন?

তোয়াহা: আমি মোজাফফর আহমদের কাছ থেকে (ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মোজাফফর) কথাটা শুনি। মোজাফফর তখন ওপরের কর্তৃপক্ষ মহলে আনাগোনা করতেন। সেখান থেকে শুনে এসে তিনিই প্রথম আমাকে কথাটা বলেন। কিন্তু আমরা তখন এতো টেনশানে ছিলাম যে, এ নিয়ে ভাববার ফুরসত ছিল না।" [ দেখুনঃ একুশের ইতিহাস : দ্বীতিয় পর্ব ]

তথ্যসূত্র: ভাষা আন্দোলন : সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন / মোস্তফা কামাল ॥ [বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি - ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৭ । পৃ: ৫৭-৬৮ / ৮৯-৯০ / ১৪১-১৪৩ / ১৪৬-১৫৬ / ১৬৮-১৭৪ /  ২০৭ / ২১৪ / ২৫৯] [ কৃতজ্ঞতা : কাইকাউস ]

[ ১৯৯৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী কোলকাতার ‘দেশ' পত্রিকায় এই নিবন্ধটি প্রকাশ হওয়ার পর শেখ হাসিনা সরকার পত্রিকার ঐ সংখ্যাটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।]

COMMENTS

BLOGGER
Name

আন্তর্জাতিক,2,ইতিহাস,4,ইসলাম ধর্ম,1,ইসলামের ইতিহাস,4,কোরআন ও বিজ্ঞান,2,নবী ও রাসুল,1,নাস্তিক্যবাদ,2,পাকিস্তান অধ্যায়,3,প্রতিবেশী ভূ-রাজনীতি,1,বাংলা সাহিত্য,1,বাংলাদেশ অধ্যায়,2,বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব,1,ভাষা আন্দোলন,6,ভাষা ও সংস্কৃতি,1,মতামত,3,মুক্তিযুদ্ধ,5,মুসলিম বিজ্ঞানী,1,মুসলিম শাসনকাল,5,রাজনীতি,9,রাজনীতিবিদ,8,রাষ্ট্র ও প্রসাশন,2,লেখক ও সাহিত্যিক,1,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,2,শিক্ষা ব্যবস্থা,4,সাম্প্রদায়িকতা,1,সাহাবীদের জীবনী,2,সাহিত্য ও সংস্কৃতি,3,
ltr
item
iTech: একুশের ইতিহাস : প্রথম পর্ব
একুশের ইতিহাস : প্রথম পর্ব
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। একুশের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাস অভ্যুত্থানের মাস। পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি। ২১শে ফেব্রুয়ার ১৪৪ ধারা ভঙ্গ। ভাষা শহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত। ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ।
https://www.dainikdonet.com/wp-content/uploads/2017/12/600x4001487374402_6b0c4b829c92ac43e1158c32f7fa0907-24.jpg
iTech
https://qtechmedia.blogspot.com/2017/04/ekusher-itihas-1.html
https://qtechmedia.blogspot.com/
https://qtechmedia.blogspot.com/
https://qtechmedia.blogspot.com/2017/04/ekusher-itihas-1.html
true
5233664077611017960
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy Table of Content