সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। একুশের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাস অভ্যুত্থানের মাস। পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি। ২১শে ফেব্রুয়ার ১৪৪ ধারা ভঙ্গ। ভাষা শহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত। ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ।
দেখুনঃ একুশের ইতিহাস : প্রথম পর্ব
কামরুদ্দীন আহমদ। '৪৮ সাল থেকে প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। '৪৮ সালের ১১ই মার্চের আন্দোলনের পর ১৫ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে নাজিমুদ্দীন সরকারের সাত দফা দাবী সম্বলিত যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তিনিই তার নেপথ্য রুপকার। বস্তুত: সে চুক্তিই প্রথম শাসনতান্ত্রিক পন্থায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার স্বীকৃতি এনে দেয়। '৫২ সালের আন্দোলনও সরকার কর্তৃক সে চুক্তিভঙ্গের ফলশ্রুতি। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন ও ১৯৫৫ সালে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৫৭ সালে রাজনীতি ত্যাগ করে কূটনীতিকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
প্রশ্ন: এরপর (চুক্তি স্বাক্ষরের পর) কি ঘটলো?
কামরুদ্দীন: চুক্তি ও মুক্তির কাজ সমাধা করে আমি ১৬ই মার্চ সিরাজগঞ্জ কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের অভিষেক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে ভাষণ দেওয়ার জন্য যাই। ১৭ই মার্চ আমি ঢাকায় ফিরে আসি। ১৮ই মার্চ শুনি চুক্তি কেউ মানছে না। না সরকার পক্ষ, না সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ। উভয় পক্ষই পরস্পরের ওপর দোষারোপ করছে। নাজিমুদ্দীন সাহেব জানালেন শেখ মুজিব সহ তাদের গ্রুপ চুক্তি লঙ্ঘন করে পরিষদ ঘেরাও করেছে। এমন কি তোফাজ্জল আলী MLA এবং ড: মালিক MLA কে মারধর করেছে।
আমি এ ব্যাপারে সংগ্রাম পরিষদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা জানালেন সরকারও চুক্তি মানছে না। তারা মানলে আমরা মানবো। পুলিশী নির্যাতনের বিরুদ্ধে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিশন গঠনের পরিবর্তে সরকার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
তোয়াহা ও তাজউদ্দীন পরিষদ ঘেরাও, MLA তোফাজ্জল আলী ও ড: মালিককে মারধর করার জন্য শেখ মুজিবকে দায়ী করেন। তারা জানালেন রাষ্ট্র ভাষার দাবী আদায়ের চেয়ে পার্লামেন্টারী রাজনীতির উপদলীয় কোন্দলের সুযোগ গ্রহণেই শেখ মুজিব বেশী আগ্রহী।
সত্যিকারে ব্যাপারটা ছিল তাই। রাষ্ট্রভাষার দাবী নিয়ে যারা আন্দোলন করতে চেযেছিল তারাও দাবী আদায়ের জন্য একটা আইনগত চুক্তির ভিত্তি পেয়েছে। নাজিমুদ্দীন সরকারও জিন্নাহ সাহেবের আগমনের প্রাক্কালে চুক্তির মাধ্যমে পরিস্থিত শান্ত করার সুযোগ লাভ করেছেন।
কিন্তু শেখ মুজিব কিছুই পায়নি। তার উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনের সুযোগে নাজিমুদ্দীনকে ক্ষমতাচ্যুত করে উপদলীয় কোন্দলের সুযোগে সোহরাওয়ার্দী গ্রপকে ক্ষমতায় আনার ব্যবস্থা করা। সে ব্যবস্থা তখনও হয়নি বলে পরিষদ ঘেরাও করে চলছে। তোফাজ্জল আলী ও ড: মালিককে মারধর করার ব্যাপারটি ছিল সম্পূর্ণ সাজানো যা নাজিমুদ্দীন আঁচ করতে পারেননি। তাই তিনিও মারধর খাওয়া তোফাজ্জল আলী ও ড: মালিকের পক্ষেই মুজিবকে দায়ী করে বক্তব্য রেখেছেন। তোফাজ্জল আলী ও ড: মালিক উভয়ের সাথে শেখ মুজিবের নেপথ্য দহরম মহরম ছিল। তারা সাজানো মারখেয়ে চেয়েছিলেন নাজিমুদ্দীনের সন্দেহের উর্ধ্বে থাকতে। অপর দিকে নাজিমুদ্দীনের পতন ঘটিয়ে সোহরাওয়ার্দী গ্রপকে ক্ষমতায অধিষ্ঠিত করতে। এই হলো '৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত ঘটনা প্রবাহের এক অধ্যায়॥"
[ কাজী গোলাম মাহবুব। ১৯৪৮ সাল থেকে প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। 'সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের' তিনিই ছিলেন আহবায়ক। এই কর্মপরিষদের নেতৃত্বেই ১৯৫২ সালে সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায় শুরু হয়।]
প্রশ্ন: পরিষদে কারা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে বক্তব্য রাখতেন? তারা কি কোন গ্রুপ হিসেবে পরিচিত ছিলেন?
গোলাম মাহবুব: খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন, আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, আলী আহমদ খান (বিচারপরি মোর্শেদের পিতা), খান সাহেব ওসমান আলী, মো: আলী, ডা: মালেক (পূর্ব পাকিস্তানের শেষ গভর্ণর) প্রমুখ রাষ্ট্রভাষার পক্ষে বক্তব্য রাখতেন। পরিষদের ভেতরে এরা সোহরাওয়ার্দী সমর্থক বলে পরিচিত ছিলেন। তাই বলে এদের সবাই যে মনপ্রাণ দিয়ে পরিষদের অভ্যন্তরে ভাষা আন্দোলনের স্বপক্ষে বক্তব্য রাখতেন তা নয়। এদের অনেকে ভাষা আন্দোলনকে সামনে রেখে নাজিমুদ্দীন সরকারের বিরুদ্ধে ফ্রন্ট গঠনে তৎপর হন। কেউ কেউ আবার পরবর্তী সময়ে নাজিমুদ্দীনের সাথে নেগোসিয়েশন করে ক্ষমতা লাভের চেষ্টা চালান এবং ভাষা আন্দোলনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন।
ভাষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক রুপ দিয়ে পরিষদের অভ্যন্তরে ৬৪ জন এম.এল.এ নাজিমুদ্দীন মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে ফ্রন্ট গড়ে তোলেন। এই ফ্রন্টের উদ্দেশ্য ছিল ভাষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নাজিমুদ্দীন মন্ত্রীসভার পতন ঘটানো। সোহরাওয়ার্দী সমর্থক বলে পরিচিত এই ফ্রন্ট গড়ে তোলার ব্যাপারে শেখ মুজিবও তৎপর ছিলেন। কারণ শেখ মুজিব ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর ফ্যানাটিক সমর্থক।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, এই ফ্রন্ট রাষ্ট্রভাষাকে ইস্যু হিসেবে নিয়ে মুসলিম লীগ এম.এল.এ-দের তাদের দলে ভিড়াবার চেষ্টা চালায়। এ ছাড়া পরিষদে নাজিমুদ্দীন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ব্যক্তিগত পদ এবং ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যও এক শ্রেণীর এম.এল.এ- র মধ্যে কার্যকর ছিল। আরো নির্মম সত্য এই যে, এই গ্রুপের যারা ভাষা আন্দোলনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আন্দোলনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে পদ লাভ করেছেন পরবর্তীকালে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মত ব্যক্তিত্বও তাদের সাথে হাত মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কাজ করেছেন। সেদিন মহান ভাষা আন্দোলনকে ব্যবহার করে তারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে 'টাউট ইজমের' অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন, সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতাও পরবর্তীকালে তাদের সাথে কমপ্রোমাইজ করেছেন - এটা আজো আমার কাছে দ:খজনক বলে মনে হয়। বলতে দ্বিধা নেই যে, আমাদের রাজনৈতিক জীবনে 'টাউট ইজমের'-এ ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে। জাতিকে অবশ্যই এই 'রাজনৈতিক টাউট ইজমের' কবল হতে মুক্তি লাভ করতে হবে।

প্রশ্ন: আমাদের রাজনীতিতে আজো 'টাউট ইজমের' ধারা অব্যাহত রয়েছে - এর দ্বারা আপনি কি বুঝাতে চেয়েছেন?
গোলাম মাহবুব: রাজনীতিতে 'টাউট ইজমের' ধারা অব্যাহত রয়েছে এই জন্য বলছি যে, যারা আদর্শ ও নীতিচ্যুত হতে পারছে, তারাই আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে সমাদৃত হচ্ছে। কয়েকটি উদাহরণ পেশ করলেই তা বুঝতে পারবেন। যে মোহাম্মদ আলী (বগুড়া) পদের লোভে নীতিচ্যুত হয়ে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের গ্রুপ ত্যাগ করলেন, তার ক্যাবিনেটেই সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মত নেতা পরবর্তীকালে ল' মিনিস্টার হিসেবে যোগদান করেন। যে (খান বাহাদুর) আবদুল ওহাব খান পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন এবং পরে ভাষা আন্দোলনেরও বিরোধিতা করেছেন, তিনিই ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগের টিকেট থেকে বঞ্চিত হয়ে যুক্তফ্রন্টে ভিড়লে সোহরাওয়ার্দী-হক সাহেবের আশীর্বাদে যুক্তফ্রন্টের মনোয়ন পান। তিনি ছিলেন হক সাহেবের ভাগ্নী জামাতা। হয়তো এই যোগ্যতার বলেই তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন। ঠিক এমনি ধরণের ব্যাপার ঘটে ১৯৭০ সালে। শেখ মুজিব তার ভগ্নিপতি সেরনিয়াবাতকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেন। অথচ সেরনিয়াবাত কোনদিন আওয়ামী লীগ করতেন না।
রাজনীতিতে, যখন ডেডিকেশন এবং সিনসিয়ারিটির মূল্য দেয়া হয় না, তখনই এতে টাউট ইজমের অনুপ্রবেশ ঘটে, আর টাউট ইজম থেকে সৃষ্টি হয় ন্যাশনাল ক্রাইসিস।
প্রশ্ন: তোয়াহা সাহেবের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে জানতে পারলাম, ভাষা আন্দোলনে গোলাম আযম সাহেবও প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। গোলাম আযম সাহেব তখন কি ছিলেন? তার কথা কিন্তু আর কেউ বলেন নি।
গোলাম মাহবুব: হ্যাঁ, গোলাম আযম, মৌলবী ফরিদ আহমদ এরা অনেকে প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে অবদান রেখেছেন। কিন্তু কে কার কথা বলে বলুন। অন্যের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার মতো হৃদয়বৃত্তি আমাদের আছে কি? আমরা তো সবাই আত্মপ্রচারে ব্যস্ত। অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি এবং গোলাম আযম ছিলেন জিএস। অত্যন্ত চরিত্রবান এবং আদর্শ প্রকৃতির ছাত্র ছিলেন তিনি।
প্রশ্ন: আপনি এর পূর্বে বরকতকে দেখেছেন কি? ছাত্রদের কোন মিটিং-এ তাকে লক্ষ্য করেছেন কি?
গোলাম মাহবুব: আমি এর পূর্বে আর কখনও ছাত্রসভায় বরকতকে দেখেছি বলে মনে হয় না। বরকত আমার নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল।
প্রশ্ন: বরকত পুলিশের ইনফর্মার ছিল বলে অধ্যাপক রাজ্জাক সাহেব যে তথ্য পরিবেশন করেছেন সে সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?
গোলাম মাহবুব: অধ্যাপক রাজ্জাক সাহেব পুলিশ অফিসারের নিকট শুনেছেন। সুতরাং পুলিশের রক্ষিত রেকর্ডপত্র থেকেই এ তথ্যের সঠিক প্রমাণ আহরণ করা যেতে পারে। তবে বরকত যা-ই হউক না কেন, আমরা তাকে শহীদ মনে করি। কারণ ঘটনার অনিবার্য্য পরিণতি তাকে শহীদের মর্যাদা দিয়েছে।
প্রশ্ন: তখন ছাত্রদের মধ্যে পুলিশের ইনফর্মার থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন কি?
গোলাম মাহবুব: হ্যাঁ, থাকতে পারে। কারণ, পরিষদের এমএলএ-গণ যখন ভাষা আন্দোলনকে পুঁজি করে নেপথ্যে পদ লাভের চেষ্টা চালাতে পারেন, তখন ছাত্রদের মধ্যেও সরকারী এজেন্ট বা পুলিশের ইনফর্মার থাকা বিচিত্র কিছু নয়। সকল মহান আন্দোলনের পেছনেই স্বার্থান্বেষী শক্তির স্যাবোটাইজ মূলক কারসাজি থাকতে পারে॥"
[ মোহাম্মদ সুলতান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে একজন সংগ্রামী ছাত্রনেতা হিসেবে তৎপর ছিলেন। যে ক'জন ছাত্রনেতার অনমনীয় দৃঢ়তায় '৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারীর ছাত্রসমাজের পক্ষ হতে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত হয়, তিনি তাদের অন্যতম।]
প্রশ্ন: ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা হয়েছে বলে আপনার জানা আছে কি?
সুলতান: হ্যাঁ, ১৯৭৪ সনে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারেই তেমন একটি চেষ্টা হয়েছে। টিভির সাক্ষাৎকারে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আলাপ করছিলেন শেখ মুজিব এবং কে.জি. মোস্তফা। এক পর্যায়ে শেখ মুজিব কে.জি. মোস্তফাকে জিজ্ঞেস করেন, 'তোমার মনে নেই মোস্তফা, '৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারীতে আমি ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার নির্দেশ দিয়েছিলাম?' এমনি ধরণের অনেক কথা।
কে.জি. মোস্তফা মাথা নেড়ে, কখনো কথা বলে শেখ মুজিবের বক্তব্যের সমর্থন দিচ্ছিলেন। অথচ শেখ মুজিব তখন জেলে। আপনি নিজেই দেখুন, '৫৩ সালে প্রকাশিত একুশে ফেব্রুয়ারী নামক বইতে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত কে.জি. মোস্তফার একটি প্রবন্ধ বেরিয়েছিল। এটা কে.জি. মোস্তফার নিজের লেখা প্রবন্ধ। এতে আছে 'শেখ মুজিব তখন জেলে। ১৯৪৯ সালের মার্চ থেকেই তিনি জেল খাটছিলেন।' এ প্রবন্ধে '৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সাথে শেখ মুজিব সম্পর্কের কোন কথার উল্লেখ নেই। আর পরবর্তীকালে তিনি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবকে '৫২-র ভাষা আন্দোলনের ১৪৪ ধার ভাঙ্গার নেতা বানিয়ে ফেলেন। যার ফলে তিনি লেবাননের রাষ্ট্রদূত পদটি লাভ করেন। প্রকৃতপক্ষে '৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সাথে শেখ মুজিবের কোন সম্পর্ক নেই॥"
[ আবদুল মতিন (ভাষা মতিন)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক ছিলেন। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের ২০শে ফেব্রুয়ারীর নবাবপুরের মিটিং-এ যে চারজন ২১শে ফেব্রুয়ারীতে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে ভোট দেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ১৯৫২ সালে মার্চের প্রথম দিকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য তিনি কারাবরণ করেন।]
প্রশ্ন: শেখ মুজিবই প্রথম কার্জন হলে জিন্নাহ সাহেবের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিলেন বলে বলা হয়ে থাকে। ঢাকা ডাইজেস্টের সাক্ষাৎকারে কেউ বলেছেন যে, নঈমুদ্দীন প্রথম 'নো' 'নো' বলে প্রতিবাদ করেন, এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?
মতিন: আপনি ইতিহাসের উপকরণ নিতে এসেছেন। ইতিহাসের অধ্যায়ে কোন বিকৃত বা কাল্পনিক তথ্যই টিকে থাকতে পারে না। শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট নন। সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ কনভোকেশনে তার উপস্থিত থাকার প্রশ্নই উঠে না। শেখ মুজিব কার্জন হলে জিন্নাহ সাহেবের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিলেন - এসব বক্তব্য মনগড়া কাহিনী মাত্র। নঈমুদ্দিন কনভোকেশন সভায় উপস্থিত ছিলেন। সম্ভবত: আমার প্রতিবাদের সাথে সেও কণ্ঠ মিলাতে পারে কিন্তু ঘটনা যা ঘটেছিল তাই আপনাকে বলেছি। তাতে সত্যের সামান্যতম অপলাপ নেই॥"
[ গাজীউল হক। ১৯৪৮ সাল থেকে প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলনের পুরোভাগে যারা দু:সাহসিক ভূমিকা পালন করেন, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় যে ঐতিহাসিক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়, জনাব গাজীউল হকই সে সভায় সভাপতিত্ব করেন।]
প্রশ্ন: 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি' কেন গঠিত হয়?
গাজীউল হক: ১৯৪৮ সালের শেষের দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জনাব লিয়াকত আলী খান ঢাকা সফরে আসেন। তার আগমন উপলক্ষে ঢাকার ছাত্র সমাজে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কারণ ঢাকা আসার কিছুদিন আগে করাচীতে গণ-পরিষদের বৈঠকে জনাব লিয়াকত আলী খান, উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে বলে মত প্রকাশ করেছিলেন। তাই এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে জনাব লিয়াকত আলী খানকে কালো পতাকা দেখানোর মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। অবশেষে ড: মাহমুদ হোসেনের (তদানীন্তন ফজলুল হক হলের প্রভোষ্ট) পরামর্শক্রমে স্থির হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের 'জিমনেসিয়াম গ্রাউন্ডে' লিয়াকত আলী খানের যে ছাত্রসভা হবে, তাতে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের জিএস জনাব গোলাম আযম (অধ্যাপক গোলাম আযম) ছাত্রদের পক্ষ থেকে একটা মানপত্র পাঠ করবেন। সে মানপত্রে উর্দুর সাথে বাংলাকেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার জোরালো দাবী সন্নিবেশিত থাকবে।
সিদ্ধান্ত অনুসারে জনাব গোলাম আযম সে জনসভায় ছাত্রদের পক্ষ থেকে মানপত্র পাঠ করেন। গোলাম আযম সাহেব যখন মানপত্রে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবী পাঠ করছিলেন, তখন ছাত্ররা তুমুল করতালির মাধ্যমে এ দাবীর প্রতি তাদের সমর্থন জ্ঞাপন করে। এতে বাহ্যত: লিয়াকত আলী খান ক্ষুব্ধ হন।
প্রশ্ন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি আহুত ১১ই মার্চের বিশ্ববিদ্যালয় হরতাল কি সফল হয়েছিল? ছাত্রদের মধ্যে সে সময় ধর্মঘটের প্রশ্নে কোন ভিন্নমত ছিল কি?
গাজীউল হক: '৫০ এবং '৫১ সালের ১১ই মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্থকভাবে হরতাল পালিত হয়। এসব হরতালে সাধারণ ছাত্রদের স্বত:স্ফূর্ত সমর্থন ছিল। ধর্মঘট সম্পর্কে ভিন্নমতের কথা বলছেন, না, ছাত্রদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন মতভেদ ছিল না। তবে দু'একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা যে ঘটেনি তা নয়।
আমার মনে পড়ছে, '৫১ সালের ১১ই মার্চ সংগ্রাম কমিটি আহুত হরতালে সব ছাত্রই সাড়া দেয়। শুধুমাত্র একজন ছাত্র ভিন্নমত প্রকাশ করে। সে ছিল তদানীন্তন আর্টস ফ্যাকাল্টির ডীন ড: সাদানীর ভাতিজা। হরতাল উপেক্ষা করে সে ক্লাস করছিল। তাকে ছাত্ররা ক্লাস থেকে মধুর রেস্তোরায় ডেকে আনে। সেখানে মতিন সাহেব সহ আমরা সবাই তাকে ছাত্র ঐক্য প্রশ্নে বুঝাবার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সে কিছুতেই আমাদের আহবানে সাড়া দিচ্ছিল না। ঠিক এ সময় (কবি) হাসান হাফিজুর রহমান উত্তেজিত হয়ে চট করে তার পা থেকে স্যান্ডেল খুলে দু'ঘা লাগিয়ে দেন। তারপর নুর নবী (বর্তমানে সুপ্রীম কোর্টের এডভোকেট) সজোরে ধাক্কা দিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে বুকে চড়ে বসে। ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা বিস্মিত হয়ে পড়ি। মতিন সাহেব সহ আমরা সবাই মিলে তাকে ছাড়িয়ে নিই । অবশ্য এ ধরণের ঘটনা আর কখনো ঘটেনি।
প্রশ্ন: ১৯৭৩ সালে জনাব আবদুস সামাদ আজাদ (সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী) এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, ১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় জনাব শেখ মুজিবুর রহমান নাকি ঢাকা মেডিকেল কলেজের হাসপাতালের জানালা দিয়ে সামাদ সাহেবকে ১৪৪ ধারা ভাংগার নির্দেশ দিয়েছিলেন? পরবর্তীকালে কে.জি. মোস্তফাও অনুরুপ সাক্ষাৎকারে সামাদ সাহেবের কথা সমর্থন করেছিলেন। এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?
গাজীউল হক: (বিস্ময়ের সাথে) এটা কি করে সম্ভব? ২০শে ফেব্রুয়ারী বিকেল ৩ টায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। শেখ মুজিব এর পূর্বেই ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরিত হন। সামাদ সাহেব কি করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জানালা দিয়ে শেখ মুজিবের মৌখিক নির্দেশ পেলেন? এটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। এ সম্পূর্ণ অবাস্তব কথা॥"
[ আবুল হোসেন মিয়া। '৪৬-'৪৯ সালে ঢাকায় এবং '৫২ সালে রংপুরে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ১৯৪৯ থেকে '৫৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী মুসলিম লীগের রংপুর জেলার সেক্রেটারী ছিলেন।]
প্রশ্ন: ঢাকায় কি উদ্দেশ্যে এলেন?
আবুল হোসেন: ঢাকার ৯৭, নবাবপুর দলীয় অফিসে আসি দলীয় সিদ্ধান্ত জানার জন্য। ইতিপূর্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের সব নেতাই গ্রেপ্তার হন। তখন অধ্যাপক কামরুজ্জামানকে অফিস-ইন-চার্জের দায়িত্ব দেযা হয়। কিন্তু পরে অধ্যাপক কামরুজ্জামানের সাথে আই.বি-র যোগাযোগ রয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়। তাই আওয়ামী মুসলিম লীগের একজন অফিসিয়েটিং সেক্রেটারীর প্রয়োজন অনুভূত হয়। এ সম্পর্কে সম্ভবত: ২৭/২৮শে মার্চের দিকে দলের ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন: তখন কি আওয়ামী মুসলিম লীগের কোন নেতাই বাইরে ছিলেন না?
আবুল হোসেন: কিছু নেতৃবৃন্দ বাইরে ছিলেন। যেমন - মরহুম সালাম খান, আতাউর রহমান খান, শামসুদ্দীন আহমদ (কোলকাতা সোহরাওয়ার্দী ক্যাবিনেটের মন্ত্রী ছিলেন) এবং আলী আহমদ (কুমিল্লা হতে নির্বাচিত এমএলএ) প্রমুখ। ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং-এ আমাকে অফিসিয়েটিং সেক্রেটারীর দায়িত্ব নেয়ার কথা বলা হয়। আমি একটু ভেবে শেখ মুজিবের নাম করি। কিন্তু শেখ মুজিবকে অফিসিয়েটিং সেক্রেটারীর দায়িত্ব দিতে কেউ রাজী হল না।
প্রশ্ন: শেখ মুজিব কি তখন জেলের বাইরে? তিনি তো দলের জয়েন্ট সেক্রেটারী ছিলেন। তাকে অফিসিয়েটিং সেক্রেটারীর দায়িত্ব দিতে কি আপত্তি ছিল? আর আপনিই বা কেন ওয়ার্কিং কমিটির প্রস্তাব নিজে গ্রহণ না করে শেখ মুজিবের নাম প্রস্তাব করলেন? শেখ মুজিবের সাথে আপনার সম্পর্ক কিরুপ ছিল?
আবুল হোসেন: এক সঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছেন। হ্যাঁ, শেখ মুজিব তখন সবেমাত্র জেল থেকে বেরিয়েছেন। সম্ভবত: তিনি মার্চের ১৫/২০ তারিখের দিকে মুক্তি পান।
প্রশ্ন: আপনার কথার মধ্যে আরেকটি প্রশ্ন করতে হচ্ছে - তিনি গ্রেপ্তার হন কবে?
আবুল হোসেন: তিনি বায়ান্নর আন্দোলনের অনেক আগে গ্রেপ্তার হন।বায়ান্নর আন্দোলনের সাথে তার গ্রেপ্তারের কোন সম্পর্ক নেই। যখন বায়ান্নর আন্দোলনের জন্য আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, কাউকে বা হন্যে হয়ে খোঁজা হচ্ছে - তখন শেখ মুজিব জেল থেকে ছাড়া পান।
এবার অন্যান্য প্রশ্নের জবাব দেয়া যাক - যেহেতু শেখ মুজিব জয়েন্ট সেক্রেটারী ছিলেন সুতরাং তারই অফিসিয়েটিং সেক্রেটারী হওয়ার কথা। কিন্তু কুষ্টিয়ার শামসুদ্দিন সাহেব বললেন, 'ও জেল থেকে বেরিয়েছে। অসুস্থ অবস্থায় ওর দ্বারা দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়।'
সালাম খান বললেন, 'ও যে হামবাগ, ওর দ্বারা চলবে না। ও শুধু ভায়োলেন্স করবে।'
আতাউর রহমান সাহেব আমাকে বললেন, 'তুমিই চার্জ নাও।' আলী আহমদ সাহেবও অনুরুপ মনোভাব ব্যক্ত করলেন।
প্রশ্ন: আপনি এত সমালোচনা শুনে শেখ মুজিবের নাম প্রস্তাব করলেন কেন? তার সাথে আপনার কোন বিশেষ সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতা ছিল কি?
আবুল হোসেন: বিশেষ সম্পর্ক আর ঘনিষ্ঠতা যাই কিছু বলুন, কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় থেকে মুজিবের সাথে পরিচয়। সে অনেক পুরনো কাহিনী। কুষ্টিয়াতে তখন নাজিমুদ্দীন সমর্থক ছাত্র সংগঠন শাহ আজিজ (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী) গ্রুপের নিকট অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগের নির্বাচনে সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ ছাত্র সংগঠন পরাজিত হয়। সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ ছাত্রনেতা ছিলেন নুরুদ্দীন (গ্রীন এন্ড হোয়াইট কোম্পানীর মালিক)।
কোলকাতায়ও এই গ্রুপের ছাত্রদের মধ্যে শত্রুতা চলতে থাকে। কোলকাতায় শাহ আজিজ গ্রুপের ছাত্ররা নুরুদ্দীন গ্রুপের ওপর প্রায়ই হামলা চালাতো। শাহ আজিজ গ্রুপে হামলাবাজ ছাত্র বেশি ছিল বলে নুরুদ্দীন গ্রুপ পেরে উঠত না। এদের দলে শুধু কিউ জি আজমিরী ছিল একটু সাহসী। তাই দূর্বল সোহরাওয়ার্দী সমর্থক নুরুদ্দীন ছাত্র গ্রুপকে শক্তিশালী করার জন্য আবুল হাশিম সাহেবের পরামর্শক্রমে গোপালগঞ্জ হতে শেখ মুজিবকে এনে কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি করে দেয়া হয়। এতে সোহরাওয়ার্দী সমর্থক নুরুদ্দীন গ্রুপ বেশ শক্তিশালী হয়।
তখন থেকে শেখ মুজিবের সাথে আমার পরিচয়। আমি ভেবেছিলাম বিভিন্ন কারণে মুজিব জেল খেটে তখন একটু নাম করেছে। তখন সরকারের জেল-জুলুম যার ওপর পতিত হতো জনগণ তার ওপর সহানুভূতিশীল হয়ে পড়তেন। আমরাই দলীয়ভাবে শেখ মুজিবকে অন্যায়ভাবে জেলে আটকে রাখার জন্য প্রতিবাদ সভা করেছি, ফলে ছাত্রনেতা হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। তুলনামুলকভাবে আমরা আরো অপরিচিত ছিলাম। দলকে সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে নেয়ার জন্য এ ধরণের পরিচিতির প্রয়োজন। এসব কথা ভেবেই আমি শেখ মুজিবের নাম প্রস্তাব করি এবং আমাকে ভাববার সময় দেওয়ার জন্য ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক কয়েকদিনের জন্য মূলতবী রাখার অনুরোধ করি। আমার অনুরোধ রক্ষিত হয়।
এদিকে আমি গোপালগঞ্জে মুজিবের কাছে তাড়াতাড়ি ঢাকায় আসার জন্য চিঠি লিখে দিই । পরবর্তী ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে অফিসিয়েটিং সেক্রেটারী হিসেবে শেখ মুজিবের নাম আমিই প্রস্তাব করি। আমার প্রস্তাবের পর সামনাসামনি আর কেউ বিরোধিতা না করায় শেখ মুজিবই আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসিয়েটিং সেক্রেটারী নির্বাচিত হন॥"
[ আতাউর রহমান খান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে অতি পরিচিত ব্যক্তিত্ব। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। "সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের" তিনি অন্যতম সদস্য ছিলেন। '৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারীর ঘটনার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের অনেকের গ্রেফতার ও আত্মগোপনের পর, পরবর্তী পর্যায়ে পুনর্গঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের তিনি আহবায়ক নির্বাচিত হন।]
প্রশ্ন: ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?
আতাউর রহমান: শুধু ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসই নয়, আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যেভাবে বিকৃতির চেষ্টা চলছে তাতে শঙ্কিত হওয়ার কারণ রয়েছে। জাতীয় ইতিহাস এবং ঘটনাক্রম বিকৃতির যে প্রবণতা দেখা দিয়েছে, তা জাতির জন্য কোনক্রমেই শুভ নয়। সত্য ঘটনা এবং ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে ঐ প্রবণতার প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। অতি দু:খজনক হলেও সত্যি যে, রেডিও-টিভির মত জাতীয় প্রচার মাধ্যমগুলি পর্যন্ত আমাদের দেশের জাতীয় ইতিহাস এবং ঘটনাক্রম বিকৃতির কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
প্রশ্ন: জাতীয় ইতিহাস বিকৃতির এমনি ধরণের দু'একটি দৃষ্টান্ত পেশ করবেন কি?
আতাউর রহমান: এ ধরণের দৃষ্টান্তের তো শেষ নেই। ডাইজেস্টেই এ ধরণের দু'একটি দৃষ্টান্ত মুদ্রিত হয়েছে। এ ধরণের প্রচেষ্টা দেখলে খবই দু:খ হয়।
পাকিস্তান থেকে শেখ মুজিবের আগমনের কথা মনে পড়ছে। লন্ডন দিল্লী হয়ে শেখ মুজিব বাংলাদেশে ফিরছেন। এদিকে টিভি ও বেতারে ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ (ডাক, তার ও টেলিফোন মন্ত্রী) শেখ মুজিবের আগমন বার্তা ও গুণগান প্রচার করতে গিয়ে এমন সব তথ্য বিকৃত করে যাচ্ছিলেন যার সাথে সত্যের কোন সম্পর্ক ছিল না। তিনি একপর্যায়ে কিভাবে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারীতে ভাষার দাবীর সংগ্রামে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হচ্ছিল তার বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিলেন অথচ তিনি তখন কারাগারে।
এ ছাড়া কে. জি. মোস্তফার সাথে এক টিভি সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিব বলেছিলেন, কি ভাবে ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন দেশ বিভাগের পরিকল্পনা পেশ হওয়ার পর কোলকাতা সিরাজউদ্দৌলা হলে জিন্নাহ সাহেবের ভাষণের চ্যালেঞ্জ করে পাকিস্তান টিকবে না বলে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। অথচ উপমহাদেশের তৎকালীন রাজনীতিতে জিন্নাহ সাহেবের ভাষনের চ্যালেঞ্জ করা কল্পনাতীত ব্যাপার ছিল। আর শেখ মুজিব ছিলেন তখন নেহায়েত ছেলে মানুষ।
ভাষা আন্দোলনের শহীদ বরকতকে নিয়ে ইদানিং বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালেও হুমকি ও পাল্টা হুমকির মাধ্যমে এমন সব কথা প্রকাশিত হয়েছে যে স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক অপ্রিয় ঘটনা আলোর মুখ দেখেছে। স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশগ্রহনকারী একদল আর একদলকে কোণঠাসা করার জন্য যেসব তথ্য প্রকাশ করছেন তাতে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের অনেক অধ্যায় নতুন করে সাজাতে হবে।
স্বাধীনতার পর একদিন তাজউদ্দীন এলেন আমার বাসায়। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে আলাপ করতে গিয়ে ওসমানী সাহেব সম্বন্ধে যে সব অভিযোগ তুললেন আমি রীতিমতো তাজ্জব বনে গেলাম। তিনি জানালেন, যুদ্ধের ফ্রন্টের ধারেকাছেও তিনি (ওসমানী) যাননি। সারাদিন বাংলোতেই কাটাতেন। মাঝে মাঝে খড়ম পায়ে দিয়ে করিডোরে বেড়িয়ে আয়েশ করেই সময় কাটিয়ে দিতেন।' আমি বললাম, 'তাই যদি হয় তবে তাকে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি বানিয়ে রাখা হয়েছিল কেন?' তাজউদ্দীন বললেন, 'তখন কিছু করার ছিল না। নামমাত্র প্রধান সেনাপতিকে বদল করারও কোন অর্থ ছিল না।' তাজউদ্দীন বলে চললেন, 'আত্মসমর্পনের দায়িত্বভার গ্রহণের জন্য তাকে খোঁজা হচ্ছে ঢাকা পাঠানোর উদ্দেশ্যে। কাউকে না জানিয়ে তিনি তখন গৌহাটি চলে গেছেন।' এসব কথা শুনতে শুনতে আমার মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। কি আশ্চর্য যে, স্বাধীনতার ঘোষনা এবং তার সঠিক সময় নিয়েও জাতির সাথে প্রতারণা চলছে॥"
তথ্যসূত্র: ভাষা আন্দোলন : সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন / মোস্তফা কামাল ॥ [বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি - ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৭ । পৃ: ৫৭-৬৮ / ৮৯-৯০ / ১৪১-১৪৩ / ১৪৬-১৫৬ / ১৬৮-১৭৪ / ২০৭ / ২১৪ / ২৫৯] [ কৃতজ্ঞতা : কাইকাউস ]
COMMENTS